রবিবার, ১৭ মার্চ, ২০২৪

অমিত কাশ‍্যপ-এর কবিতা

বসন্ত এল না 

পলাশের ছায়ায় ঢেকে আছে সাজেরবাড়ি স্টেশন 
কোকিলের ডাক মনে করে নেওয়া যাক
ধরে নেওয়া যাক দক্ষিণায়নের রোদ আর
নিরিবিলি গ্রাম‍্যপথ, দূরে দেখা যাক চমৎকার 

আমরা এখন পাশাপাশি বসে মনের মধ্যে কথা বলি
সাজেরবাড়ি চলে যেতে হলদিবাড়ি গল্পে ঢুকে পড়ল
সেবার খুব হামলা হল হাতির, পটকা ফাটল
বাজনা বাজল, রাত পাহারা হল খুব

বসন্ত এল না, ঘুমের পাশ থেকে স্বপ্ন যেমন সরে 
নদী আসে, শীর্ণকায়া, ঝমঝম সেতুর নীচে শুয়ে 
আকাশ দেখে, বাতাসে জড়িয়ে যায় চোখ
তেমন প্রাচীন সিঁড়ি ভাঙা ঘাট, বসন্ত এল না 


 

সন্তর্পণ ভৌমিক-এর কবিতা

পরবাস, অতিথি, কাণ্ডজ্ঞান 

অতিদূরদেশে, কিংবা অতিপরবাসে
কারা থাকে? কে হাঁকে? কে হাঁটে
রাত্তিরে ধারালো এক ছুরির উপর

কোজাগরি আলো নিভে গেছে
নিঃশব্দ শিশির ভাঙে,
কৌশলে কে হেঁটে যায়
প্রাণ ও প্রাণী নাকি, কিংবা
কেউ কেউ জনন বিহীন

তাহাদের আর্তস্বর অতিরিক্ত মিহি হয়ে
ফিরে আসে আমাদের দুয়ার অবধি
আমরা শুনছি কি? কি দুঃখ এসে যায়?
প্রাণীদের গ্লানি সব যদি মিশে চৈত্র হাওয়ায়।

 

বরুণ চক্রবর্তী-র কবিতা

পিতা-পুত্র

পৃথিবীর যাবতীয় অন্যায় যুদ্ধ
থামাতে পারে মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি
আমার বাবা-র বাবা বলেছিলেন বাবা-কে---

তারপর দিন ফুরিয়েছে রাত গড়িয়েছে
এক কালের ঠাকুরদাদা
স্মৃতি রেখে জগৎ ছাড়া

অন্য আমি একটু একটু ক'রে পেয়েছি উপদেশ
পৃথিবী জুড়ে একদিন হবেই ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
আমার বাবা বলেছিলেন আমাকে ---

এই-ই এমন আমার বাবা , তাঁকে দেখেছি ন্যায়-নীতি আদর্শে
তাঁর বাবা-র পথ অনুসারী নিষ্ঠ মানুষ একজন
আজ তিনি , তাঁরা নেই ঠিকই
সশরীরে আমাদের ধারে কাছে সুখে-দুঃখে
রয়েছেন স্মৃতি জুড়ে আমাদের হৃদয়ের
অন্তরের কোথাও---

বুঝি, বেশ বুঝি আমার স্মৃতি-র পৃথিবী এঁদের ঘিরে
আশ্চর্য ভারবাহী আলোয় স্মৃতি উৎসুক
চিরকালের চিন্তার ঘনছায়া আমায় ঘিরে

অনন্ত অতীতের স্মৃতি-ভাষ্য ঢেউ, অনর্গল ঢেউ
বহে চলে আনন্দ যাত্রায়---

মনে মনে ভাবি, আমিও তো বাবা আমার সন্তান-কে বোঝাই পাখি-পড়ার মতো
বুঝিয়ে অন্তঃকরণ শুদ্ধ করি আন্তরিক ভাবনায়
উত্তরকাল আজকের এই দামামা-র যুগে
বলা-কওয়া-কে বুঝবে আর কত প্রজন্ম ?

কোথাও বাবা-র একটা জোরের জায়গা ছিল
বাবা বলতেন উল্টো কথা
'নিজের কথা বলবে না , লোকে বলবে,
বলবে অন্যেরা---

শুধু মানুষের কথা রেখো
মানুষের পাশে থেকো
জেগে জাগাও'---

এখন যুগ পাল্টে গেছে, একচেটিয়া এখন
এ সময়ের শ্লোগান
নিজের ঢাক ---

 

দুর্গাদাস মিদ্যা-র কবিতা

এলো যে শীতের বেলা

ভোরের বেলায় শুনি কে যেন বাজায় বাঁশি ভৈরবী রাগে
দেখি পূবের আকাশ সেজে ওঠে আগুন আভাসে
সকাল হেঁটে যায় শিশিরে কুয়াশায়।
ধীর পাখায় পাখি উড়ে যায় উষ্ণতার খোঁজে
খেজুর রসের হাঁড়ি পেড়ে আনে শিমুল
জিরেন কাটের মিষ্টি রসে তৃপ্ত হৃদয় গেয়ে ওঠে গান -- এলো যে শীতের বেলা।
তারপর ঝলমলে রোদে পিঠ পেতে
উষ্ণতার স্বাদ নিই আমি একাই নিঃসঙ্গ কাকের মতো।

 

গৌতম রায়-এর কবিতা

আত্ম চলন 

নিজের ভেতর চলনের মধ্যে ছড়িয়ে দিই বিশ্বজোড়া ডানা, 
মরুপাখিটির মতো জলের সন্ধানে পাড়ি দিই সহস্র সহস্র কিমি 
ডানার কুয়োয় নিয়ে আসি আরাধ্য জল 
উত্তরসূরী জল পানে তৃপ্ত হলে আমার বিদায় 
এর বেশি কিছু নয় ।

ত্যাগের ইতিহাস শুধু দধীচি মুনির একার নয় 
এ বিশ্বে বারে বারে কত সহস্র দধীচির জন্ম হয় 
আত্ম চলনের ভেতর বিশ্বদর্শন,
এই চলনের ক্যালিগ্রাফিতে শুধু ত্যাগের শিরোনাম।



এসেছে জোনাক তপস্যার দিন

কৃত্রিম উচ্চ আলো, কীটনাশকের মসৃণ ধার অসহনীয় জোনাকির কাছে। 
দ্রুত নগরায়নের ফলশ্রুতি আগের মতো 
ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি দৃশ্যমান হয় না আর, 
আধুনিক আলোর প্লাবনে ডুবতে ডুবতে 
বিলুপ্তির পথে এই প্রজাতি চলে যাবে একদিন।

এসেছে জোনাক তপস্যার দিন 
ফিরে এসো পবিত্র অন্ধকার 
জেগে উঠুক আমাদের অন্তরের জোনাকি, 
কৃত্রিম সভ্যতার জৌলুস থেকে দূরে 
লতাগুল্ম বৃক্ষের শাখা প্রশাখার আঁতুড়ে 
জেগে উঠুক ফসফরাসের আলো।

 

বন্ধন পাল-এর কবিতা

আত্মস্থ ভালবাসা

...চিনতাম,
        ভুলতে চেয়েছি— তাই স্বীকার করিনি এতদিন,
        তা বলে কি ভুলের খনিতে
        স্তরীভূত কয়লাকে আগুন বাঁচিয়ে থাকা শীতল কঠিন
        নিরীহ জ্বালানি করে রেখে দেব চিরসমাধিতে?

... রাখতাম,
        না-পেরে আগুনরঙা তোমার চোখের চাহনিকে
        অগ্রাহ্য করতে,আর সেই
        বিপদ সংকেত দেখে মুখ ফিরিয়ে মাটির দিকে
        দৃষ্টিক্ষেপ মহাপাপ; ভালো সব বলে দেওয়াতেই।

...বলতাম,
        তবে-যে সূর্যের অগ্নি দূর থেকে ঝরিয়ে উত্তাপ
        কাছের শশী-শরীর ছুঁয়ে
        নরম স্নেহ মাখানো স্নিগ্ধস্নানে সমাধিকে ধুয়ে
        দেয় দেখে,কয়লায় ঘন হয়ে থাকি চুপচাপ।

অনন্ত প্রেমের জন্যে কে আর বেঁচে থেকেছে আশায় আশায়
কোথাও পরিতৃপ্তিতে পুড়ে গেছে কয়লার রং—
ছাইরঙা অভিজ্ঞতা অনাদ্যন্ত ঈশ্বর স্বয়ং
অধরা অতল,তবু অন্তস্থ সন্ধান আত্মস্থ ভালবাসায়।

 

পার্থ সারথি চক্রবর্তী-র কবিতা

ছবি

আয়নায় দেখা মুখচ্ছবি
চিনতে অসুবিধা হয়-
         এই তীব্র আলোতেও।

পাখিগুলো খাঁচায় নড়াচড়া করে
উড়ে পালাতে চায় আকাশে।
বৃষ্টিধারায় স্নাত হয়েও-
বুকের ময়লা যায় না। 

পাখিগুলো ইশারা করে-
মরুভূমির বার্তা বয়ে আনে। 
ঝাপসা হতে হতে ----
উধাও হয়ে যায় মুখচ্ছবি।

পাখি ডানা মেলে দিগন্তের দিকে।

 

শ্যামলকান্তি মজুমদার-এর কবিতা

আফ্রদিতি

তোমার দিকে তাকিয়ে আছি
মনে মাখামাখি আহ্লাদ হচ্ছে

দেখছি পূর্ণিমা রাতে হৈ হৈ জ্যোৎস্নায়
সারারাত
অফুরন্ত দৃষ্টি -বিনিময় আমাদের

ডেকে উঠলাম এইমাত্র
আফ্রদিতি ---
রোমকূপে রোমকূপে, শিরায় শিরায়
জন্মান্তর পেরিয়ে, দেবী এসেছে।

 

আশরাফুল মণ্ডল-এর কবিতা

ডাক

ঘুমের ভিতর তরতাজা এক জাগরণ ডাকছে
কড়ে আঙ্গুলের ডগাতে উঁকি দিচ্ছে
অজস্র শপথ

দুমুঠো ভাতের জন্যে
এক চিলতে চালাঘরের জন্যে
পরনের একটুকরো কাপড়ের জন্যে
হাহাকার আর বুক চাপড়ানি নিয়ে
বান ডেকেছে মৃতপ্রায় নদী

ঘুমের ভিতর এসে দাঁড়িয়েছে
অনেক মানুষ
নিজেদের শিরদাঁড়া সোজা রেখে
চিরকালের বন্ধ্যা ঘুম হটিয়ে
তারা এবার গাইবে
জেগে থাকার গীত

 

আবদুস সালাম-এর কবিতা

লড়াই

এখন মৃত্যুকে উপভোগ করবো এসো
অসহ্য সময়
আত্মারা ক্রমশ পাথর হয়ে উঠছে দিন দিন
পেছোনোর আর জায়গা নেই
অনিচ্ছুক ফুটপাত এঁকে দিচ্ছি মনস্তাত্ত্বিক ক‍্যানভাসে
পাঠিয়ে দিচ্ছি আত্মহত্যার ধূসর এস এম এস
হাতে চুড়ি পড়ে বসে থাকার সময় এখন নয়
অস্ত্র হাতে এসো  বিষম লড়াইয়ে নেমে পড়ি
মৃত্যু এখন পাহারা দিচ্ছে সমতল দ্বীপ 

 

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

পুনর্জন্মের ছেঁড়া মানচিত্র

পুনর্জন্মের জল-হাওয়ায় ভাসে ছেঁড়া মানচিত্র।

বাদামী অক্সিজেন ছুঁতে গেলে থোকা থোকা পাপ,

অভিশপ্ত আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না!


অবাধ্য পুনর্জন্ম

ক্যারামের গুটির মতো

আমাকে ফেরৎ পাঠায় এ জন্মের খোপরে।

চারদিকে চেয়ে দেখি

ইউরেনিয়ামের মতো কিলবিল করে লোভ!


সাইরেণে সাইরেণে বাদামী ধূসর মানুষেরা পাশে হটে গেলে

রাস্তা খুলে যায় নেতার, লোলুপ নায়কের –

লোভী মানুষেরা সভ্যতাকে ছোটায় বাদামী শকটে

চারধারে শুধু ধূসর ধূসর হাওয়া!


পুনর্জন্মর কাছে ফিরে যায় থোকা থোকা বাদামী নিঃশ্বাস।

আশাহত গাড়িতে অ্যাসিড-বৃষ্টি, ক্ষয়ে যাওয়া ওয়াইপার

মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায় জীবনের জন্ম, পুনর্জন্ম!

অভিশপ্ত আমি আজকাল নিঃশ্বাস নিতে পারি না!

 

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতা

যুদ্ধ  

সবলের ছেলে বললো, যুদ্ধ কী মা?
যুদ্ধ মানে রক্ত, যুদ্ধ মানে আগুন,মৃত্যু।
যুদ্ধ কেন মা? -- ছেলেটি আবার বলে
মা বলেন,কী জানি? তবে শুনেছি যুদ্ধ হতেই হয়
নইলে ওরা নাকি সব কেড়ে নেবে।
যুদ্ধে কী হয় মা?
তা জানি না,শুনেছি তা ছাড়া বাঁচা যাবে না
শক্তি যার আছে সেই শত্রুরা সব নিয়ে যাবে।

দুর্বলের ছেলে বললো, যুদ্ধ কেন মা?
মা বলেন কী জানি? 
আমাদের যে কিছুই নেই, শুধু অভাব,শুধু
অসুখ আর কান্না তবু...
যুদ্ধ কী মা?
সবকিছু ভেঙে দেওয়া,কেড়ে নেওয়া বা পুড়িয়ে দেওয়া আর অত্যাচার।
যুদ্ধ তবে কেন হবে ?
তা জানি না তো !
তবু যুদ্ধ নাকি হতেই হয়, নইলে মরে যেতে হয়।

দুটি শিশুই জানতে চায়,আমাদের কী লাভ?
দুটি মা উত্তর দেন,লাভ হয় না কিছুই,কিন্তু
শুনেছি লড়াই চাই-ই চাই
নইলে বাঁচা যায় না।
শিশুর সরল চোখে বিহ্বলতা, সেখানে লেখা,
আমরা যুদ্ধ চাই না,খেলতে চাই,খেতে যাই
আর গান গাইতে চাই।

 

গোবিন্দ মোদক-এর কবিতা

শেষ স্বপ্ন দৃশ্য

আশা নিরাশার দ্বন্দ্ব শেষ হয়ে গেলে 

চাওয়ার আর কিছু থাকে না 

থাকে না পাওয়ারও কিছু। 

এখন আমারও সেই সুবর্ণ-দশা। 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে 

প্রতিনিয়ত দেখতে পাই মৃত্যুমুখ 

জলছবির মতো ছেলেবেলা 

আর মধ্যরাত্রির দিনগুলি। 

কোথাও খুব করুণ সুরে 

একটা বেহালা বাজে 

বাজতেই থাকে ক্রমাগত 

আর আমি একটু একটু করে 

তলিয়ে যেতে থাকি নৈঃশব্দের ভিতর; 

জীবনের শেষ স্বপ্নদৃশ্যে দেখতে পাই –

একটা কাঠঠোকরা পাখি 

ক্রমাগত ঠুকে ঠুকে 

ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে 

আমার বুকের পাঁজর।