সমরেন্দ্র বিশ্বাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমরেন্দ্র বিশ্বাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা


 সুপর্ণা

এখনো শীতকাল আসে নি সুপর্ণা

চারদিকে কুয়াশারা ঘিরেছে সময়?

সুপর্ণা, একদিন পাতারা ঝরবে জানি

তবুও অসময়ে তোমার শরীর থেকে

সবুজ পাতারা ঝরুকযেন এমনটা না হয়!

বিবর্ণ পৃথিবীতে পাতা ঝরার গল্প শুনতে চাই না আজ,

এমনটা চায় না পৃথিবীর ঘুরন্ত সময়।

তবুও কুয়াশা নিয়ে শীতকাল আসে, শীতকাল যায়

পাতা ঝরেমানবজন্মের ঘড়ি দ্রুত পাক খায়!

আজ এই কুয়াশার প্রান্তরে আরো একবার ডানা খোলো,

সুপর্ণা, বিদায়ের আগে চরম আশ্লেষে আরো একবার বলো

আমাদের শীতকাল এখনই আসছে না;

জন্মের শীতকালসে তো ঢের ঢের দেরী!


রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

ভাসমান সিঁড়ি, হারাণো নেবুলা দিন

একটা সিঁড়ি আকাশের পথে!
তোমার হাত ধরে আমি, আমার হাত ধরে তুমি –
পথটা আকাশমুখী!
সিঁড়ির নিচে সমুদ্রের অথৈ ভয়, তীব্র হাঙরেরা –
সেদিন সিঁড়িটা কি আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছিল স্বর্গে?
স্বর্গটর্গের ঠিকানা জানি না, সেসব দিনে শুধু এটুকুই জানতাম
বাতাসে ঝোলানো কাঠের সিঁড়িগুলোয় পা রেখে রেখে
হাত ধরাধরি যেদিকে হাঁটছি, সেটাই নেবুলা নক্ষত্রের সিঁড়ি।
তুমি বলেছিলে – ‘নন্দনে শেষ পর্যন্ত যদি না পৌঁছাই, আফসোস নেই
এটুকুই জানবো এখন তোমার হাত আমার হাতে,
একটু পরেই আমরা ছুঁয়ে দেবো বিভ্রান্ত চাঁদ!’
                           
অনেক অনেক বছর পরে
একদিন যখন আমাদের বয়েস বেড়ে গেছে,
একজন অন্যজনকে কয়েক যুগ দেখি নি,
এমন একটা মেঘলা দিনে দূরবর্তী শহরের দুটো ব্যালকনিতে
আমরা দুজনেই দেখছি একটা দৃশ্য ---
হাওয়ায় হাওয়ায় সামনেই দুলছে
আকাশচুম্বী একটা কাঠের সিঁড়ি, কি আশ্চর্য,
সেই সিঁড়িপথটাই যৌবনে আমাদেরকে নিয়ে যেতো
কোনো এক অচেনা নেবুলায়,
অনন্ত নীহারিকা কিংবা নক্ষত্রমন্ডলীর কোনো এক গোলাপী আকর্ষণে!
 
আগামীতে তোমার সাথে আমার আর কক্ষনো দেখা হবে না!
তবু আমাদের সামনে এখনও পরিত্রাণহীন
একটা কম্পমান সিঁড়ি, ধাপ ধাপ – ভাসমান কাঠের,
একটা কম্পমান সিঁড়ি, ধাপ ধাপ – ভাসমান অন্ধকারের,
আর
আবেগময় হাতের মুঠোয় জড়ানো নীল নীল স্পর্শের উত্তাপ
আজও ডুকরে কেঁদে ওঠে বিকেলের আলোয় –
কেন আমরা একজন অন্যের নাম ধরে ডেকেছিলাম?
কেনই বা আকাশের ভাসমান সিঁড়িপথে,
হাতে হাত, নেবুলা নক্ষত্রের দিকে দুজনে হেঁটেছিলাম?
কেন? কেন? 

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৪

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

কলম্বাসের জাহাজ

‘জাহাজ ভাসিয়ে নিয়ে চলো –
সামনেই স্থলভূমি, মানুষের আকাঙ্খিত মাটি।’

পৃথিবীর চোখে ভাসে দিকহীন সমুদ্রের নীল
অবিরাম ফেটে যায় সময়ের ফেনা
অনাহার শিঙা ফোঁকে জাহাজের ডেকে
প্রিয়তম সহযাত্রী হতাশায় বিরোধ সানায়

‘তবু নয় থেমে থাকা, নয় পিছু ফেরা –
জাহাজ ভাসিয়ে নিয়ে চলো –
সামনেই স্থলভূমি, মানুষের প্রিয়তম মাটি।’

ইতিহাস জানে কি, কে এই কলম্বাস?
হে মানুষ, দৃঢ় ভাবে স্থির ধরে থাকো,
দিশাহীন অন্ধকারে কলম্বাস হয়ে যাক্‌ তোমার বিশ্বাস!

রবিবার, ১৭ মার্চ, ২০২৪

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

পুনর্জন্মের ছেঁড়া মানচিত্র

পুনর্জন্মের জল-হাওয়ায় ভাসে ছেঁড়া মানচিত্র।

বাদামী অক্সিজেন ছুঁতে গেলে থোকা থোকা পাপ,

অভিশপ্ত আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না!


অবাধ্য পুনর্জন্ম

ক্যারামের গুটির মতো

আমাকে ফেরৎ পাঠায় এ জন্মের খোপরে।

চারদিকে চেয়ে দেখি

ইউরেনিয়ামের মতো কিলবিল করে লোভ!


সাইরেণে সাইরেণে বাদামী ধূসর মানুষেরা পাশে হটে গেলে

রাস্তা খুলে যায় নেতার, লোলুপ নায়কের –

লোভী মানুষেরা সভ্যতাকে ছোটায় বাদামী শকটে

চারধারে শুধু ধূসর ধূসর হাওয়া!


পুনর্জন্মর কাছে ফিরে যায় থোকা থোকা বাদামী নিঃশ্বাস।

আশাহত গাড়িতে অ্যাসিড-বৃষ্টিক্ষয়ে যাওয়া ওয়াইপার

মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায় জীবনের জন্মপুনর্জন্ম!

অভিশপ্ত আমি আজকাল নিঃশ্বাস নিতে পারি না!

 

সোমবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

পরিবাহী পাখি

অলক চুলের হাওয়া

বড়ো পরিবাহী

বিদ্যুতের মতো গাল ছুঁতে চায়।

ছুঁতে যাই চুল ......

বাদামী ট্যারেন্টুলা অচানক তেড়ে আসে!

এতোই তোমার বিরাগ গজল, কেন ছুঁতে ভয়?


ইমনের রাগে রাগে জানালার কোনে

তোমার হারমোনিয়াম কেন লাল শিমূলেরে ডাকে?

ও আমার পরিযায়ী পাখি

ভুলে কেন যাও

বিদ্যুত পীড়িত দিনে

ফাল্গুনের অপেক্ষায় আমি এক দীর্ণ পথচারী।

 

শুক্রবার, ২ জুন, ২০২৩

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

দিনান্তের প্রতিমা

হে অপরাহ্নের সম্রাট,

তোমার দুচোখ আজ গোলাপে বিদ্ধ ও রক্তাক্ত

স্মৃতিতে যাবতীয় মেঘচ্ছাপ ধূসরতা

নাগরিক মিছিলের তুমিই কি সেই দীর্ঘকায় প্রেমিক

যার সামনে ভেঙে পড়েছিল পার্ক স্ট্রিটের শ্বেতশুভ্র তাজমহল?

হে আজান বিমূর্ত সময়স্মৃতিসৌধের নিস্তব্ধতা ভেদ করো,

অতীতের যে সব কথামালা আসতে চাইছেআসতে দাও।


আজকাল শাহজাহানের পাঞ্জাবী পরে আচমকাই তুমি বের হও

হারানো সাম্রাজ্ঞীকে খুঁজতে,

সংগ্রহ করো নীল আকাশে ভেসে থাকা মেঘ মেঘ কথামালা,

দিগন্তের নির্জনতায় হাঁটতে হাঁটতে লিপিবদ্ধ করো

অপরাহ্নের ঈশানকোণে ডুবে যাওয়া বিদ্যুতের ঝল্কানি

দূর সমুদ্রের হাওয়ায় কাঁপে অদৃশ্য দুচোখের ছায়া কিংবা মায়া,

কম্পিত সন্ধ্যার সিলুয়েটে একের পর এক বিধ্বস্ত হয়

ক্ষীয়মাণ সাম্রাজ্যের মায়াবী জলযান


দিন নেই রাত্রি নেই

তোমার সামনে শুধু নিহত প্রেমিকার ধূসর প্রতিমা!

 

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর ঝুরোগল্প

হীরাকুঁদউৎপল সেন ও আমাদের অগ্রজেরা

জহর টাওয়ারের উপরেউঁচু থেকে দেখছিলামথই থই করছে বিস্ময়কর জলাধার ড্যামটার এ প্রান্ত থেকে চলে যাওয়া সুদীর্ঘ রাস্তাটা অদৃশ্য হয়ে গেছে ওপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেইহীরাকুঁদ ড্যামটা সত্যিই বিস্ময়করস্বাধীনতার পরবর্তী ভারতবর্ষের একটা বিশাল নির্মাণএই নির্মাণে সামিল হয়েছিলো আমাদের অগ্রজ ও পূর্ব-পুরুষেরা

হঠাৎ যেন দেখলামবাঁধের উপর সরু রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে আসছেন উৎপল সেন ও আরো কয়েকজন পূর্ব-পুরুষপাশে হাঁটছিলেন বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ বিশ্বেসরাইয়া হীরাকুঁদ বাঁধটির নির্মাতা এনারাইশুধু ড্যাম নয়ওনারা এ দেশেটাকে একটু একটু করে নির্মান করছিলেন

পরে খেয়াল হলোওনারা তো কতদিন আগেই পরলোকগত হয়েছেন আসলে আমি ভুল দেখেছিলাম আরো কাছে আসতেই স্পষ্ট হলো ড্যামের উপর দিয়ে যারা হেঁটে আসছিলতারা ওনারা নন ওরা কতগুলো কর্মহীন পরিযায়ী শ্রমিক হয়তো রুজির সন্ধানে বেরিয়েছে রোজ ওদের খাবার জোটে নাওরা আমাদের এই দেশেরই মানুষ!

কিছুক্ষণ পরে জহর মিনারের উচ্চতা থেকে নেমে এলাম বসে আছি ড্যামের পাশে একটা পাথরের চাঁই এর উপর চওড়া নদীখাতে ছিটকে পড়া জলের শব্দ বিস্ময়ে দেখছিলাম হীরাকুদ ড্যাম!

বিকেল ফুরিয়ে আসছিলো কিছুক্ষণেই জায়গাটা জনশূন্য ড্যামের কিনারে খাড়া বিশাল দেয়াল তাতে চৌকো চৌকো খোপ দেখলামসন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে দেয়ালের সেই চৌকো চৌকো খোপগুলো থেকে বেরিয়ে এসেছে এক একটা মাথা এই বারে ভুল হয় নিঠিক চিনেছি মাথাগুলো আমাদের অগ্রজ প্রজন্ম উৎপল সেন আছেনপ্রযুক্তিবিদ এম বিশ্বেসরাইয়াও সেই মাথাগুলো হাত নেড়ে আমাকে বললোঅনেক ভালোবাসা আর পরিশ্রমে আমরা এই স্বাধীন দেশটাকে নির্মাণ করতে চেয়েছি কারণ তোমরা ভালো থাকবে আমাদের দেশটাও ভালো থাকবে

তক্ষুনি একটা বেখাপ্পা অন্ধকার আমার মাথায় চাটি মেরে প্রশ্ন করলো – বলো দেখিএ দেশে তোমরা কি সত্যি সত্যিই ভালো আছো?


 

সোমবার, ১ আগস্ট, ২০২২

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

 

দাবানলের হরফেরা 


জোছনার ব্যাগ ভরে যাচ্ছে

বহু বছর আগেকার ধোঁয়ায়!

ক্লান্ত রাতগুলো ভাঙছে দগ্ধ স্মৃতির লকার,

কেঁপে কেঁপে উঠছে নিঃসঙ্গ নক্ষত্রেরা

বুকের ভেতর টি টি ডাহুক পাখি,

দূরের নির্জনে কোথাও বাজছে সমাপ্তি সঙ্গীত

এই আয়ুস্মান রাতে আজ আকাশটা কেনই বা পাঠালো

দাবানলের হরফ -

ভুলে যাওয়া মহাশ্বেতা আলো?

কতদিন আগেই তো আমি

আগুনে জ্বালিয়ে ফেলেছি দাহ্য বর্ণমালা

বিসর্জন দিয়েছি আঁকাবাঁকা হরফগুলোকে

ধুয়ে ফেলেছি শিশিরের জলে লেখা প্রেম

উড়িয়ে দিয়েছি জিপসি মেয়েটার ব্যবিলন হাওয়া!

রাত্তিরের খোলা শরীরে এখন অবারিত বিভাজিকার কুহু,

জলস্রোতে স্মৃতিমাখা শীতকাল

শাড়ীতে জড়ানো ন্যাপথলিনের গন্ধ,

দাউ দাউ দাবানল 

হরফগুলো থেকে দগ্ধ ধোঁয়ারা এখনো উড়ছে!

বুধবার, ১ জুন, ২০২২

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

অনুদিত জাহাজ


তোমাকে অনুবাদ করবার জন্যে

মাপছিলাম সেন্টিমিটার,

তুমি জিজ্ঞেস করলে, নীল জলের মানে?

উত্তরটা জানতাম না


সমুদ্রযাত্রার কয়েক দিন পরে

নির্জন লাল খামে তুমি উপহার দিলে

অনুবাদ করা জাহাজ!


জাহাজের ওড়নার মতো তখন থেকেই আমি

উড়ছিতোমার সাথে উড়ছি!

রবিবার, ১ মে, ২০২২

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা

গোলপোষ্ট

 

সামনেই গোলপোষ্ট। ফুটবল যাচ্ছে, পিছিয়ে আসছে, জালে জড়াচ্ছে ---

হাসপাতালের করিডোর একটা দিগন্ত প্রসারী ফুটবলের মাঠ!

তাদের গোলপোষ্টে ঝুলে আছে অনেকগুলো জালে আটকানো দরোজা

চক্ষু বা শরীর মেরামতের জন্যে যারা আজকাল ময়দানে আসছে

হাসপাতালের দরোজা দিয়ে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে জালে

ফুটবলের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে আসা মানুষজনকে

গিলে গিলে খাচ্ছে এই ময়দানে বড়ো বড়ো প্লেয়ার,

হাড় জিরজিরে কিছু কিছু মানুষ মিলিয়ে যাচ্ছে গোলপোষ্টের আড়ালে!

অন্ধ করিডোর আর দরোজাগুলো পেরিয়ে

কেউ কেউ কোনক্রমে জাল কেটে  ফিরে আসছে নিজের গ্যালারীতে;

দর্শকদের আসনে বসতে গিয়ে সে দেখছে

তার জায়গা দখল নিয়েছে তারই মতো কয়েকজন চশমা-ভাঙ্গা লোক,

গায়ে তাদের ফর্মালিন কিংবা জালের আঁশটে গন্ধ।

সামনেই গোলপোষ্ট। মানুষেরা এগোচ্ছে, পিছিয়ে আসছে, জড়িয়ে যাচ্ছে জালে!