রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬
সম্পাদকের নিবেদন
সম্পাদকের নিবেদন
রজার পেনরোজ (জন্ম ৮ আগস্ট, ১৯৩১) পদার্থবিদ্যায়, জ্যামিতি ও গণিত শাস্ত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। আইনস্টাইন, হকিং প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য বৈজ্ঞানিকদের পাশে তাঁর স্থান। রিলেটিভিটিকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে, মৃত নক্ষত্র থেকে যে ব্ল্যাকহোল সৃষ্টি হতে পারে এটা তিনি রিলেটিভিটি থিওরি থেকে প্রমাণ করেন। তিনি টুইস্টর (Twistor) থিওরির আবিষ্কর্তা। এটা হচ্ছে স্পেস-টাইম-এর গঠনভঙ্গিকে পর্যবেক্ষণ করার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এর ফলে আমরা মহাকর্ষের প্রকৃতিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সক্ষম হই। তিনি এক ধরনের জ্যামিতিক ফর্মের আবিষ্কর্তা যাকে ‘পেনরোজ টাইলস’ বলা হয়। তিনি ব্রেন সম্বন্ধেও রিসার্চ করেছেন এবং মনে করেন যে চেতনার উদ্ভব হচ্ছে ‘কোয়ান্টাম-মেকানিক্যাল’ প্রক্রিয়া থেকে।
থিওরিটিক্যাল পদার্থবিদ্যা ক্রমশই কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠছে। স্ট্রিং থিওরির কথাই ধরা যাক। এই থিওরি ১১টি ডাইমেনশনের কথা বলে অথবা আমাদের মহাবিশ্বকে মনে করা হয় একটা বিশালাকার ঝিল্লি বা ‘মেমব্রেন’ (Membrane)-এর ওপর অবস্থান করছে। এ সব ভাবনাচিন্তাকে পরাবাস্তব (Surreal) ভাবনাচিন্তা বলে মনে হয়। পেনরোজ বলছেন যে কোয়ান্টাম মেকানিকস-এ এমনই অনেক দুর্বোধ্যতাকে বিশ্বাস করতে হয়। এটাও ঠিক যে কোয়ান্টাম মেকানিকস অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। সুতরাং এর অনেক জিনিসকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। নিউটনের পরে একবার, আর একবার আইনস্টাইনের পরে, পৃথিবী সম্বন্ধে মানুষের ভাবনার পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি নিশ্চিত যে জীববিদ্যায় বহুল ব্যবহার করা যায় কোয়ান্টাম মেকানিকস। রজার পেনরোজের একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম হচ্ছে : Fashion, faith and fantasy in the New Physics of the Universe। এই শব্দগুলির প্রত্যেকটি এখনকার প্রধান থিওরিটিক্যাল পদার্থবিদ্যার ধারণার প্রতীকস্বরূপ। ‘ফ্যাশন’ হচ্ছে স্ট্রিং থিওরি, ‘ফ্যানটাসি’ হচ্ছে বিভিন্ন মহাবিশ্বজনিত পরিকল্পনা। তাঁর আরেকটি বইয়ের নাম’ The Emperor's New Mind’। এই বইয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলির প্রতিক্রিয়ায় চেতনার উন্মেষ ঘটে বলে তিনি দাবি করেছিলেন।
তাঁর অভিমত পদার্থবিদরা কোয়ান্টাম তত্ত্বের মূল ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারলে, থিওরিটি তখন আরও সুন্দর ও হৃদয়ঙ্গম হয়ে উঠবে। এবং কোয়ান্টাম মেকানিকসের জনপ্রিয়তা বেড়েছে বলাইবাহুল্য। বিজ্ঞান সম্বন্ধে যে বইগুলি তিনি লিখেছেন সেগুলি ‘বেষ্ট সেলার’-এর মর্যাদা পেয়েছে।
এই স্বল্প পরিসরে বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী ২০২০ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত স্যার রজার পেনরোজ-কে আমরা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলাম।
‘রঙিন ক্যানভাস বইমেলা সংখ্যা’ প্রকাশিত হল। সকল লেখক ও পাঠককে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। ভালো থাকুন সকলে।
রোশনি ইসলাম
সোনালি বেগম
ঋতম্ মুখোপাধ্যায়-এর ধারাবাহিক গদ্য : "কবিতার বাতায়ন"
জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্য
আত্মজীবনীর কবি মণীন্দ্র গুপ্ত : ‘সায়াহ্নের রৌদ্র থেকে’
যে-কোনো সৃজনী শিল্পকেই যদি বলি লেখকের আত্মজীবনীর অংশ, খুব কি ভুল বলা হবে? বোধকরি নয়। কারণ শিল্প-সাহিত্য আসলে ব্যক্তি-সত্তার দর্পণ। আরিস্টটল শিল্পকে যে-অর্থে অনুকরণ বলেছিলেন, তাকে ব্যাখ্যা করলেই বোঝা যায় শিল্পে বাস্তবের অনুকরণ আসলে স্রষ্টার কল্পনার সঙ্গে মিশে গিয়ে নতুন রূপ নেয়। অন্য সাহিত্য-শিল্প মাধ্যমের মধ্যে গীতিকবিতার ক্ষেত্রে এই আত্মজীবনীর প্রত্যক্ষ অভিঘাত সবথেকে বেশি। অকপট অনর্গল আত্মকথন নিয়েই লিরিকের বিস্তার। আর আত্মজীবনীর ভিতরে যখন মিশে যায় লিরিকের গুণ, তখন তার পাঠক-মাত্রা ভিন্ন হতে বাধ্য, যে-কথা সর্বাংশে সত্য প্রমাণ করে মণীন্দ্র গুপ্তের ‘অক্ষয় মালবেরি’(অখণ্ড সং, ২০০৯)। জীবনের প্রথম বাইশ বছরের কাহিনি প্রায় অকপটে বলেছেন তিনি। বরিশাল, আসাম ও কলকাতায় বিস্তৃত তাঁর আত্মকথার সঙ্গে আমরা কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘নীরবিন্দু’র দূরান্বয় খুঁজে পাওয়া যায়। তবে মণীন্দ্র গুপ্ত (১৯২৬-২০১৮) ধারাবাহিক বর্ণনার বদলে ছোট ছোট উপশিরোনামে তাঁর চারপাশের দেখা স্থান-কাল-পাত্র-কে দেখিয়েছেন। সেই দেখার চোখ থেকে জন্ম নিয়েছে কবিতার মতো কথা। শৈশবের সারল্য আর পরিণত মনের মিশেলে লেখা এই আত্মকথনের মধ্যে এক আত্মমগ্ন কবিকে খুঁজে পাওয়া যায়, যিনি প্রায় নিঃশব্দে পা বাড়ালেন শতবর্ষের পথে।
প্রৌঢ় মুখের ছায়া
শৈশবে মাতৃহারা মণীন্দ্র গুপ্তের বেড়ে ওঠা ঠাকুরদা-ঠাকুমার স্নেহে, প্রশ্রয়ে। গ্রামের সবুজ আর নিষ্পাপ সৌন্দর্য তাঁকে দিয়েছিল এক নিজস্ব অনুভবের জগৎ। তাই ‘অক্ষয় মালবেরি’ শুরু হয় এইভাবে :
শত শরদ মানুষের আয়ু। কিন্তু দুঃখী-সুখী-ভ্রষ্টাচারী ততদিন বাঁচে না। মরণের আগে বোকাচোখে তাকিয়ে দেখে : সমস্তই অসম্পূর্ণ, তার রাকাশশী অসংলগ্ন বালি হয়ে উড়ে যায়। তবু এইটুকু জীবনের মধ্যে কত কি যে ঘটেছিল – কত মুগ্ধতা, সন্তাপ, উল্লাস, দ্রবণ! ভোলা যায় না। তবু তার উপর শান্তি নামে – সময়ের শান্তি, ক্ষয়ের শান্তি। অক্ষয় মালবেরি গাছকে ঘিরে তীব্র ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ টের পাই, কখন সঙ্গীদের হাত ফসকে গেছে। প্রৌঢ় মুখের উপর ছায়া পড়ে। নিজেকে আর মানুষ বলে মনে হয় না, প্রাণী বলে মনে হয়। নিঃশ্বাস নিই তাই বেঁচে থাকি। ভিতরে একা, সুখী না, দুঃখীও না। দশদিকে অসীম শূন্য এবং চিররহস্য।
আত্মজীবনীটিকে লেখক তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্ব তাঁর জন্মস্থান বরিশালে, দ্বিতীয় পর্ব আসামে স্কুলজীবন এবং তারপর বরিশালে ফেরা এবং তৃতীয় পর্বে আবার সেখান থেকে কলকাতায় প্রযুক্তিবিদ্যায় শিক্ষালাভ ও অখণ্ড ভারতের নানা স্থলে (পশ্চিম পাঞ্জাব, লাহোর) মিলিটারির জীবনযাপন। তাঁর প্রৌঢ় ঋতুর ফসল এই আত্মকথনে অনুভূতির যে-প্রকাশ লক্ষ করি, তাকে প্রকারান্তরে গদ্যকবিতা বললে ভুল হবে না। এই আত্মকাহিনিতে লেখক-এর সঙ্গে পাঠককেও সঙ্গী করে নিয়েছেন। গ্রামজীবনের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার এক চমৎকার চিত্র এঁকেছেন তাঁর কল্পনায়। কবির রোম্যান্টিক মনের প্রাগ্ভাষ রূপে একটি চিত্র উল্লেখ করা যায় :
আমরা ঝড়ের মধ্যে হুলুস্থুল করছি। হুলুস্থুলটাই আমি বেশি করতাম। দেখছি আম ছিটকে পড়ছে, কিন্তু আমার আগেই গিয়ে কেউ সেটাকে কবজা করে নিল। খালি হাতে ফিরছি দেখে কেউ তার নিজের সম্পত্তি থেকে দু-চারটে দিয়ে দিত। তবু আমি প্রত্যেক বার প্রতিযোগিতায় যেতাম – আমের চেয়েও, ঝড়ের কেন্দ্রে, জমাট কালো মেঘের কেন্দ্রে নিজেকে পাখির পাখার মতো উড়োতে বড্ড ইচ্ছে করত। (আমাদের ভাঁড়ার)
সময় একটি মায়া
কবিদের আত্মজীবনী পড়ার মজা হলো কোথাও যেন আত্মজীবনীকার আমাদের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের শিকড় ধরে নাড়া দিয়ে যান। এর আগে রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শামসুর রাহমানের আত্মকথা পড়ার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, আমাদের প্রত্যেকের বড় হয়ে ওঠার ভিতরে কোথাও যেন একটা সার্বজনীন মিল আছে। আর এই মিলটা সারল্য ও বিস্ময়ের। আত্মজৈবনিক উপন্যাস-রূপে পরিচিত ‘শ্রীকান্ত’ কিংবা ‘পথের পাঁচালি’-র আখ্যান অংশে উপন্যাসের গুণ মিশে যাওয়ায় যে অন্য এক ধরনের পাঠ-মাত্রা তৈরি হয়, তা বিশুদ্ধ আত্মকথার ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। আত্মকথায় কবি সত্য বলবেন, একথাই কাম্য। আর সেই বলার বা দেখার ধরন পরিণত বয়ঃসীমায় এসেও যতখানি নির্মল থাকে, সেখানেই তাঁর সিদ্ধি। গ্রামের বিভিন্ন উৎসব, দাদু-ঠাকুমা-কাকা-ছোট মা প্রমুখের সান্নিধ্য, বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি, ফুল-পাখি, গাছ ইত্যাদি কেন্দ্র করে অপার বিস্ময় এবং তারপর গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার মধ্যে যে কাহিনি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে তার মধ্যে কোথাও যেন কোন ভান নেই।
দ্বিতীয় পর্বেও সেই সারল্য আর মুগ্ধতা অব্যাহত, যদিও সেখানে ক্রমশ পরিণত মনের কিশোর-কে দেখা যায়। বাবার কাছে থাকার থেকেও তাঁর শান্তি হয় না, বরং মামার বাড়িতে নানা সমস্যা, কখনো বা দিদিমা ও মাসি-মামাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে কাটাতে হয়। আমাদের খুব আনমনে যেন রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পের ফটিককে মনে পড়ে যেতে থাকে। এই পর্বে মামারবাড়ির মানুষজনের পাশাপাশি তাঁর দেখার সীমানা বেড়েছে। ইস্কুল-বন্ধু-শিক্ষকদের পাশাপাশি নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের বর্ণনা। পাশাপাশি যৌনচেতনার আভাস তৈরি হয়েছে মনে। মণিপুরি আর ইংরেজদের কথায় সেই অস্ফুট যৌনচেতনার আভাস পাওয়া যায়। বেশ কিছু খ্যাতিমান মানুষকে সামনে থেকে দেখা, বিভিন্ন উৎসব কিংবা নানা পেশার মানুষ এইসবের মধ্য দিয়ে হঠাৎ করে ভবিষ্যতের কথাও এসে গেছে যখন চিত্রকলা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন নন্দলাল বসুকে করে বসেছিলেন। সমকালীন রাজনীতি, সাহিত্যপত্রিকা, লেখালেখির মধ্যেই কখন যেন বয়ঃসন্ধির বেদনা এসে উপস্থিত হয়। একটি পুরাণছোঁয়া যৌনভাবাত্মক এক স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁর অনুভূতি অদ্ভুত-রকম :
স্বাভাবিক একটি মেয়ে না এসে ঐ বয়সে কেন আমার প্রথম স্বপ্নে লিঙ্গ-পরিবর্তিত মেয়ে ইলা এল। আমার যৌন পছন্দে কোথাও কি কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল? মেয়েরা সে যুগে কিশোরদের কাছে নিষিদ্ধ বস্তু। এই ট্যাবু কি আমার মানসিকতায় কোনো কাজ করেছিল? হতে পারে সবই। কিন্তু এখনও আমার মনে হয়, মেয়েরা যদি থ্যাবড়াথোবড়া স্তন জঘন ও নিতম্বের বদলে বালক-কিশোরের হালকা পলকা উড়ন্ত শরীর পায় তবে বোধহয় তাদের সৌন্দর্য আরও অপ্রতিরোধী হয়ে ওঠে। অবশ্য এক এক জনের এক এক সৌন্দর্যপ্রতিমা।
তৃতীয় পর্বে আবার ফিরে যাওয়া স্বস্থানে। এবং তারপর আবার কলকাতা, চাকরি, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং মিলিটারিতে যোগ দেওয়া। এ-পর্বের শুরুতে তাঁর কবি-দার্শনিক মন আবার ভেবেছে সময় নিয়ে :
সময়, আমাদের নশ্বরদের জন্য তৈরি একটি মায়া - দেখতে না দেখতে, স্বাদ নিতে না নিতে ফুরিয়ে যায়। এই তো সেদিন কচি আম বউলের মতো শরীর ডাঁশা হল, মিষ্টি হল, উতল হল, আর এরই মধ্যে দেখছি ঝরে পড়ার সময় এসে গেছে। আর শুধু কি শরীর, তার সঙ্গে নসিব আছে না! সুভাগার ভাগ্য যেন লাল হলদে সবুজ কাগজের হাত-চরকি – একটু হাওয়া পেলেই ফুরফুর করে ঘোরে। আর অভাগার ভাগ্য কর্ণের রথচক্র – কালো, ভারী, ক্রমাগত মাটিতে সেঁধোয়, আপ্রাণ টেনেও তুলতে পারি না।
এক পরভৃৎ বেদনায়
কঠিন জীবন, নিরাবেগ মন আর নিরাসক্ত যোদ্ধার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তাঁর কবি স্বভাবে টাল পড়েনি। প্রতিদিনের অনুশীলন, সেনাদের জীবনের হাসি-ঠাট্টা-যৌনতা আর নিঃসঙ্গতার বেদনার যে ইতিকথা এখানে পাই, তাতে ঐ জীবনের প্রতি কৌতূহল এবং সহানুভূতি দুই-ই জেগে ওঠে। তবে এটাও লক্ষণীয় মদ-মহিলা-হিংসা এইসবের মধ্যে নিত্য বিহার করেও লেখক কিন্তু তাঁর নিজস্ব মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হন নি। সেনাজীবনের কঠোর শ্রম এবং লাজ-লজ্জা ভুলিয়ে দেওয়ার ‘চরম আবহাওয়া’ এইসব নিয়ে এক স্বতন্ত্র মানুষ হয়ে তিনি ফিরে এসেছিলেন নাগরিক জীবনে। বাইশ বছরের জীবন যেন এক অসম্পূর্ণ মহাকাব্যের সূচনাংশ মাত্র। লিরিকের মতো সম্পূর্ণ নির্ভার, আত্মগত নয়। যদিও মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা আদতে লিরিক, অবশ্যই একটু অন্যরকম তার মেজাজ ও উপস্থাপনা। বনজপ্রকৃতি আর মানবস্বভাব – এ দুয়ের মিশেলে তাঁর কবিতায় বনের সবুজ স্মৃতি আর নীরব উদাসীনতার আবহ তৈরি হয়, এমন একটি কবিতা ‘শব্দ’ :
বনজ গন্ধের তুল্য কিছু শব্দ ক্রমে তার কবিতায় আসে
কেননা সে পাখিদের মতো শীতদুপুরে গহন বনবাসে
ঝরাপাতাদের মধ্যে ঘুরেছিল, বাল্যকালের পোকাদের কামুফ্লাজে
শুয়েছিল কড়াইশুঁটির ক্ষেতে বুক পেতে – আলস্যে – সবুজে।
তা কিছু শব্দে বেশ রঙ ছিল এবং আঘাত
কেননা সে দ্যৌদেবতার সঙ্গে দেয়াসিনীদের উড়ন্ত সাক্ষাৎ
দেখেছিল আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যশূন্যে। দেখেছিল : মেঘের করেণু
নেমেছে গোধূলিজলে, প্রিয় নারীটির মুখে ঝরে যায় অলীকের রেণু !
তার কিছু শব্দ ক্রমে শব্দহীনতার দিকে যায়
কেননা এখন তার দিন কাটে ভ্রমরের মতো
বিশাল পদ্মের মধ্যে মুগ্ধ মধুপান ক্রমাগত –
ক্রমে মাতোয়ারা – বুঁদ – ক্রমে অতলের ধ্বনি শুনতে পায়।
সমালোচকের ভাষায় এহেন ‘লিপ্ত ও উদাসীন চিত্রকর কবি’-র গদ্য ও কবিতায় ধরা পড়েছে তাঁর যাপন করা জীবন ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার আভাস। আত্মজীবনীর মতোই তাঁর কবিতাতেও আঁকা হয়ে যায় সুদূরের স্মৃতি, মুগ্ধতা, বিস্ময় আর মগ্নচৈতন্যের অবভাস। এক পরভৃৎ-বেদনা, যা তাঁকে শৈশবে তাড়া করে ফিরেছিল, কবিতায় তারই স্মৃতিতে বলে ওঠেন : ‘মাঝে মাঝে সায়াহ্নের রৌদ্র থেকে ভায়োলেট আভা ঝরে পড়ে; / পরভৃৎ বেদনায় টের পাই : আমি এখানকার কেউ নই’ (কেউ নই)। বালকের অনুভব, স্বপ্ন, যৌনতা আর রূপকথাচারিতার আভাস ধরা পড়েছে কখনো ‘স্বপ্ন’, ‘রূপকথা’, ‘তিনজন গুরু’, ‘মাটির দেবতামূর্তি' ‘গহন পরাগ’, ‘লোভ’ ইত্যাদি কবিতায়। তাঁর আত্মকথা প্রসঙ্গে লেখকের মন্তব্য :
‘অক্ষয় মালবেরি’র কাহিনি আমার বাইশ বছরে এসে শেষ হয়েছে। বাইশ বছরেও নিজেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলছি – এটা আদুরেপনা নয়। হয়তো অতীতের একটা সময়ে কিছু কিছু মানুষের ছেলেবেলাটা একটু বেশি সম্প্রসারিত ছিল।
উদাসী ছায়ার অংশভাগ
এক সমালোচনায় অনুপম মুখোপাধ্যায় ‘অক্ষয় মালবেরি’-কে ‘এক অলৌকিক উপন্যাস’ বলে বর্ণনা করেছেন, তবে তাঁর মতে এই স্বল্পপঠিত মাস্টারপিসের কাছে ‘নোবেল পুরস্কারও তুচ্ছ’! এহেন আবেগের বাড়াবাড়ি আমি দেখাতে অভ্যস্ত নই। বরং এই এই গ্রন্থের নামকরণে শ্রী মুখোপাধ্যায় নার্সারি রাইম ‘হেয়ার উই গো রাউন্ড মালবেরি বুশ’ বইয়ের ক্যালিগ্রাফি থেকে খুঁজে এনে যে-কথা বলেন তা বেশ যুক্তিসংগত মনে হয় :
বলা বাহুল্য, এলিয়ট গাছটিকে বদলে দিয়েছিলেন – কাঁটাওয়ালা নাশপাতি আধুনিক জীবনকে তুতগাছের ঝোপের চেয়ে সার্থকভাবে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু মণীন্দ্র বেছে নিয়েছেন মালবেরিকেই। আধুনিকতার ক্ষয়ের বিপ্রতীপে তাকে তিনি বলেছেন অক্ষয়। সে আসলে লোকজীবনের কথা বলে, গ্রামজীবনের হাওয়া টেনে লাগায় আমাদের গায়ে। কোনো শতাব্দীতে, কোনো দশকে, কোনো বিশ্বপ্লাবনেই বদলে না যাওয়া বাঙালির সে মাউথপিস হয়ে থাকে গ্রন্থটির শিরোনামে।
(কবি সম্মেলন, ফেব্রুয়ারি : ২০১৩)
গ্রন্থমধ্যে মণীন্দ্রের আঁকা প্রতিটি ছবি এবং সবুজ-কালোর বৈপরীত্যে আঁকা প্রচ্ছদ সারল্যমণ্ডিত অথচ মৌলিক। একথা ঠিক, সমগ্র বইটি এক টানে পড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। উত্তরকালে লেখা পূর্ব-বাংলার স্মৃতিকেন্দ্রিক একাধিক পুরস্কার-ধন্য আত্মজীবনী ‘বিষাদবৃক্ষ’ ‘দয়াময়ী কথা’ ইত্যাদি পড়ার আগে এই বইটি প্রকাশিত হয়েও কেন তেমন প্রচারিত, আলোচিত নয়, এই প্রশ্ন মনে জাগে। কবি মণীন্দ্র গুপ্তের যে কয়েকটি নির্বাচিত কবিতা আমি পড়েছি (পরমা-র ‘তিনজন কবি’ এবং ‘নিরক্ষর আকবর’), তার পাশে রেখে এই আত্মজীবনী পড়ে কবিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পেরেছি। তাই ‘অক্ষয় মালবেরি’ আমার কাছে অসঙ্গ খেলায় মগ্ন এক কবির ‘উদাসী ছায়ার অংশভাগ’; বাংলা আত্মকথার এক অমূল্য অর্জন – যা ফিরে ফিরে পড়তে ইচ্ছে করে আমাদের।।









