রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

এস মনিরউদ্দিন-এর কবিতা

 

প্রথম স্পর্শ 


সিঁড়ি দিয়ে বেশ উঠছিলাম,  কোথাও থমকাতে হয়নি, পায়ের পেশিতে টানও ধরেনি, আমার দৃষ্টির সামনে কোনও খোলা বাতায়ণ নেই, তবু

আমি কিছু দেখার জন্য দৃষ্টি প্রসারিত করি, যেমন করে মেঘের ফাঁক

দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসে সূর্য ,  ঠিক তেমনই উদ্ভাসিত হলে তুমি।

আমার কাঁধের উপর কেউ শীতল হাত রাখল — মৃত্যুর।




মার্বেল  


কোথাও যাব বলে বেরিয়েছি সেই ঝুঁঝকো বেলায়। কোথায় যাব?

তা তো জানি না!  তবে যাব যে তার প্রমাণ আমার কাঁধে এই ঝোলা ব্যাগ,

ব্যাগের মধ্যে একমুঠো কাচের মার্বেল,  মার্বেলের  গায়ে অসফল ভ্রমণের

ইতিহাস। যখন হাঁটতে পারি না,  পায়ে ব্যথা, শক্তিহীন ; তখনই গড়িয়ে দিই

মার্বেল,  আর দাঁড়িয়ে পড়ি তার উপর। আমাকে হুড়মুড়িয়ে টেনে নিয়ে যায়

মার্বেলগুলি  আমার কবরখানার দিকে। 

স্বপন শর্মা-র কবিতা


 শব্দের ভিড়ে

শব্দদের ভিড়ে দেখি জন্মায় বিস্ময়

 আহ্নিক গতির মধ্যে অবাধ্য পিপাসা

 দু’টি মিলে ভেঙে দেয় খাঁচা ও বিষয়

 প্রাপ্ত শব্দে গড়া ঋক জন্ম দেয় আশা। 

 

  শব্দের প্রশ্রয়ে আলো ও আকাশ চেনা  

  পাখির উড়াল আর মৌন মেঘ দেখা

  শব্দের ঘ্রাণেই মেলে জীবনের ফেনা 

  অচেনার তীরে পাই নিজ পথরেখা।

 

 শব্দের ঘ্রাণেই খোলা তৃতীয় নয়ন

 ধ্বনির কপাট আর পূর্ণের করুণা

 কাঁপে মধ্যদুপুরের মন–উপবন

 চিহ্ন রেখে চলা তাই দূরের মোহনা।  

 

 শব্দের ঘ্রাণের ভিড়ে অশ্রুত ইমন

 বেপথুকে ডাকে শুধু আরেক জীবন।

শামীম নওরোজ-এর কবিতা


মাছের সংসার 

কেউ আসতে গিয়ে ফিরে গেলে অখুশি হবো না
সাগরের ঢেউ উঠে আসছে উপকূলে
জলের গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে মাছের সংসার 
যে কেউ চলে যেতে পারে 
যে কেউ ফিরে আসতে পারে 
অকারণে ভিজে যাচ্ছে মাছের ভ্রূণ
কেউ ফিরে গিয়ে ফিরে আসলে অখুশি হবো না 

পীযূষ ভট্টাচার্য-র কবিতা


মনখারাপি

অভিজাত মনখারাপে ডুবে আছে
সকালের রোদ...
এবেলায় তা-ই দিয়ে স্নান সারি 
রোজকার মতো।

গায়েহলুদ ক্যালেন্ডুলা তখনও একাকী...
বেসামাল বাতাসের আঁচে বেঁচে বেঁচে ওঠে।

সপ্তপদী আলো বোবা টেলিস্কোপে 
কখনও ধরা দেয়।
অপেক্ষার গোলাঘরে তিলাঘুঘু খুঁটে খায়
খুঁদ-কুঁড়ো-ধান।

এক জীবন বন্ধক রেখে গেছি 
আসলের খোঁজে,
একবুক সুদ দেব ব'লে।
তুমি কি জানো, মনখারাপি পরমায়ু কত?

সাদেক-এর কবিতা


মহাপতন

কোনদিন ভাবেনি উৎপাটন

তবু পড়ে আছে স্বমূলে

মাটির উপর

দাঁড়াবে দুপায়ে দিয়ে ভর

সেই মূল শেকড়ও গেছে নিয়ে

বিকেলের বৈশাখী ঝড়

মুখথুবড়িয়ে পড়ে আছে

মহা মহাবট।

কত না ডালপালা আকাশে মেলে

মাটির গভীরে চরিয়ে শিকড়

এক ছত্র রাজত্ব ছিল এলাকায়

বুক আগলে ঝড়

উড়িয়ে বাতাস

করতালি দিত হাজার পাতায়।

 

সেই গাছ ও  কিনা শেষে

কেটে কুটে জ্বালানি হল!  

রোশেনারা খান-এর কবিতা


অঙ্গীকার

             

লিখেছ তুমি, আমি ভাল নেই,

আমিই কি ভাল আছি?

ভাল রাখার অঙ্গিকারে

এসেছিলে কাছাকাছি।

সব ভুলে গিয়ে আজকে যখন

চলেই গিয়েছ দূরে

কি আর হবে?আমিও না হয়

আমিতেই যাব ফিরে।

দুঃখ কষ্ট যে যার নিজের

অন্যে কেন তা বুঝবে?

ভুল করে যদি কাছেও আসে

পালানোর পথ খুঁজবে।

গাদা গাদা পুঁথি হয়নি পড়া

জেনেছ আমি মূর্খ,

জীবনের পাঠে নিয়েছি শিক্ষা

নেই তাই কোনো দুঃখ।  

তুমি ফিরে গেছো তোমার জগতে

যেখানে তোমাকে মানায়,

আমিও আছি যেখানে থাকার

কোনো অভিযোগ নাই। 

পঙ্কজ ঘোষ-এর কবিতা


আলোকিত ভোর

যেহেতু কুটিল হয়ে আছি
তাই, প্রেমকে ঘরবন্দি করে
নিজেকে উঠোনে ছড়িয়ে রাখি,
পাখিদের বসাই শরীরে,
পাতারা চোখের উপরে ঝরে যাক 
বিজন দুপুরের কুমারী আলোর মতো।

তোমার কথার থেকে
দূরে বসে থাকি
যেন ভিজে বিকেলে সঙ্গী হারিয়ে ফেলা
বিবিক্ত পুরুষ কোনো পাখি
নিজের ঘুমের দিকে দুঃস্বপ্ন ছুঁড়ে দেওয়া
আমি এক বীভৎস রাত হয়ে আছি,
পবিত্র স্পর্শকে সযত্নে সরিয়ে রাখি,
ভাঙা চোখে ঝিঁঝির শব্দ লাগাই

লাল হও, লাল হও আমার সুস্বপ্নে ছাওয়া 
ময়ূরভরা আলোকিত বন
এ গভীর তমসায় হৃদ্-রক্ত উজাড় করে
ভোর লিখি ধুলোমাটি ভরা।

গোলাম রসুল-এর কবিতা


আকাশ নগরায়ণ

গলিত মৃত্যু আর জীবন প্রবাহ 

এবং আকাশ নগরায়ণ

ঢালে পেরেক দিয়ে আটকানো  নদী

তুমি কেবল মেঘলা আয়নায় দেখতে পাচ্ছো তাদের যারা হারিয়ে যাচ্ছে

আর আমি মানুষের থেকে পুরোনো

ধাঁধা আমার ধর্ম 

ওই ভাসমান মেঘ আমার স্বদেশ


ডলফিনের সিল্ক  

জেটির কান্না

রাতের তারাগুলো আমাকে এক গুহার পথ দেখায়

আমি বাজি ধরি গুহার  সাথে আর ফাঁপা শব্দগুলো বেরিয়ে আসে 


কাঠের আঙুল

বাতাসের ঘুম জড়িয়ে ধরে রেখেছে জীবন


চলো 

দূরে উঠে দাঁড়াই

মানুষের রঙে আর অঙ্গভঙ্গীতে রেখে দিই প্রার্থনা

আব্দুল্লাহ্ জামিল-এর কবিতা

 


নতুন সাধনা


কথা বেশি বললেই তো মহাবিপদ

মেঘহীন নীলাকাশে বিদ্যুত চমক

পণ করেছি আবার ভুল বন্ধ হোক

প্রতিবার আসে তাই এমনই বোধ।

"কথা কম বলা ভালো" একটি প্রবাদ

কখনো কখনো বাড়ে অকারণে শোক

বেশি কথা তবু বলে চলে বহু লোক

অবশেষ তাই গুণে সবাই প্রমাদ।


যাকে ভালোবাসো তাকে ধমকানো যায়

পঁয়ত্রিশ বছরেও চরিত্র অচেনা

বারে বারে ভুল করে, নাহি শুধরায়।

একটু ব্যাত্যয় হলে সহসা বাসনা

শুরু হয় বাক্যবান অঝর ধারায়

প্রত্যয় আবার, এক নতুন সাধনা।

জয়ন্ত দত্ত-র কবিতা


স্বগতোক্তির হ্রস্ব উচ্চারণ

১.

মানুষ

প্রেমে পড়লে কবিতা লেখে।

ছ্যাঁকা খেলেও  কবিতা লেখে।

শিল্প এমনই বুঝি!


২.

অবহেলা

চরম শত্রুর মনও ভাঙতে পারে।

যদিও অনাদর এক মস্ত স্বাধীনতা।


৩.

অবিশ্বাস

বিভিন্নরকম বিশ্বাসের জন্ম দেয়।


৪.

প্রেম

স্বর্গ থেকে আসে- বলেছিলেন কেউ

কেননা এ এক অমৃত যন্ত্রণা।

সমরেন্দ্র বিশ্বাস-এর কবিতা


 সুপর্ণা

এখনো শীতকাল আসে নি সুপর্ণা —

চারদিকে কুয়াশারা ঘিরেছে সময়?

সুপর্ণা, একদিন পাতারা ঝরবে জানি

তবুও এ অসময়ে তোমার শরীর থেকে

সবুজ পাতারা ঝরুক – যেন এমনটা না হয়!

বিবর্ণ পৃথিবীতে পাতা ঝরার গল্প শুনতে চাই না আজ,

এমনটা চায় না পৃথিবীর ঘুরন্ত সময়।

তবুও কুয়াশা নিয়ে শীতকাল আসে, শীতকাল যায়

পাতা ঝরে – মানবজন্মের ঘড়ি দ্রুত পাক খায়!

আজ এই কুয়াশার প্রান্তরে আরো একবার ডানা খোলো,

সুপর্ণা, বিদায়ের আগে চরম আশ্লেষে আরো একবার বলো —

আমাদের শীতকাল এখনই আসছে না;

এ জন্মের শীতকাল — সে তো ঢের ঢের দেরী!


তাপস ওঝা-র কবিতা


আমার আসল নাম

আসল নাম কেমন ভাবে চেপে রাখি!

অভিজ্ঞ মানুষ নগরে বাজারে যে
             নামী লোকদের খোঁজে 
তারা লুকিয়ে থাকে আমার লোভের ভেতরে
শত শত লোক ভাসান দেখতে গিয়ে
যাদের বিদায় দিতে চায়
তারাও রয়ে গেছে আমার দুঃখের ভেতরে
কলমে যেমন নাম এমনি চলে আসে
                সেটা আমারই নকল নাম

তুল্য-মূল্য বিবেচনা করে দেখেছি
আমার আসল নাম কেবলমাত্র নির্বোধের   
সঙ্গে খাপে খাপ মিলে যায়।