মঙ্গলবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

পার্থ সারথি চক্রবর্তী-র কবিতা

দোলাচল

বসন্তের ঝরাপাতা
-  পুরনো স্মৃতি -
খোলস ছাড়ে- নব সাজের আশায়।

পলাশের শাখায়
- রক্তবর্ণের বন্যা -
হৃদয়ের আনন্দ - দিন বদলের অপেক্ষায়।

শিমুলের দীর্ঘছায়ায়
- ফ্ল্যাশব্যাকে শৈশব -
অনাবিল মোহ - না ফেরার ঠিকানায়।

প্রজাপতির ঝাঁক 
- উড়ন্ত যৌবন -
দমকা হাওয়া- ফাল্গুনের অভিমানী বেলায়।

 

মধুছন্দা মিত্র ঘোষ-এর কবিতা

ভীত হয়ে থাকি

'When someone you love becomes a memory,
the memory becomes a treasure'

ভীত হয়ে থাকি,
পেরিয়ে যায় এক একটি  রাত ও দিন
অর্জিত বিষাদ

বিচ্ছেদ হলেই কী
সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়?
মন ভারাক্রান্ত থাকে
      যাবতীয় স্মৃতিচারণ 
 
পরবর্তী মুহূর্ত থমকে থাকে 
আকন্ঠ জমে থাকে নির্জনতা
     অনাগত ভবিতব‍্য

মুঠোয় ভরা শূন্যতা শুধু
মুছে যায় যা কিছু সু-সংবাদ

অস্পষ্ট দোলাচলে
আবহমান প্রতিটি প্রতিশ্রুতি 
রোমন্থন অথবা  
      জলভরা চোখ

 

দেবজিৎ দে-র কবিতা

নির্মাণ

পর্দার আড়ালে শরীর বাড়ির মতো 
দেওয়ালের ইঁট, কাঠে হাজার ক্ষত 
যা কিছু নির্মাণ, সে তো নিজস্ব নয় 
অপরের ঋণ, শ্রমের জমাট ভয়! 
ভিতরের গ্রহ, তারা, প্রখর তেজ
জন্মায় খিদে, খসে পড়ে লেজ।
ধূলোয় ফুটে ওঠে আঙুলের ছাপ
প্রলেপে লেগে যায় নোনা অভিশাপ।

 

প্রশান্ত মাইতি-র কবিতা

উঠোনে বসে মা  

পায়ে পায়ে সময় পেরিয়ে আসি বাড়ি
পথ শেষ হয়, উঠোনে বসে মা ---
অপেক্ষার চাদর জড়িয়ে তাকিয়ে পথে

মায়াবী চোখে নামে চিন্তার ক্লেদ
অপেক্ষার অবসানের সীমানায় ফুটে ওঠে আনন্দ

পায়ে পায়ে সময় পেরিয়ে যায়
মায়ের সময় শেষ হয় সন্তানের ফেরায়।


তোমাকে ছুঁলে

তোমাকে ছুঁলেই নেমে আসে কবিতা
কল্পনার উঠোনে ভিড় করে একেএকে

আমার ছাদ বাগানের বন্ধুরা মেতে
ওঠে সবুজ দুবাহু তুলে বাতাস আনন্দে
ক্লান্ত সূর্য দেখে হাসে মরমী ভালোবাসা

তোমাকে ছুঁলেই কেমন অন্ধকারে আলো জ্বলে
রাতের ছুটে চলা ট্রেন দাঁড়ায় হঠাৎ
হকারের চিৎকার মৃদু হয়ে ভাসে 

সাবধানে ছুঁয়েছি তোমায় তাই অঘটনের ভয়ে ।।

 

আশিসরঞ্জন নাথ-এর কবিতা

সাপ লুডোর মই

সাপ লুডোর চাল বেচালে 
কেউ উপরে ওঠে তো কেউ তরতরিয়ে নিচে নেমে যায়। 

সাপ লুডোর মইগুলো ভীষণ চমৎকার
শুধু উপরে ওঠার হাতছানি দেয়৷ 
সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরে ওঠার কায়দা কানুন অনেক,
কেউ জীবনভর চেষ্টা করেও পারে না
কেউ অল্প আয়াসে ওঠে যায় একেবারে চূড়ায়
যেন হিলারির হিমালয় জয় ! 

সাপলুডোর সাপ ভীষণ চতুর
ঘুটির চালে একবার মুখে পড়ে গেলে
সোজা লেজে নামিয়ে দেয়। 
কাউকে ওর মুখে পেলেই সোজা হজম করে নেয়। 
কম ভাগ্যবানই আছেন যারা মই বেয়ে
উপরে চড়ে বসতে পারেন। 

 

অমিতাভ দাস-এর কবিতা

নির্গ্রন্থ শ্রাবক

অনেক রাতের ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে একদিন শীত চলে গেল। আমাদের যৌবন যেভাবে চলে যায়। দুরন্ত কৈশোর। বসন্তের হলুদ। ফাল্গুনের সন্ধ্যার ভিতর বেজে উঠছে বিসমিল্লার সানাই। কেন, তা কে জানে! অনেক চুম্বন শেষে একদিন লেখা হল লালা আর লবনের লাজুক সংগীত। লেখা হল আঙুলের নখ, রক্তিম খিদের আদিম ভাস্কর্য।  চলতে চলতে হঠাৎ  একদিন থেমে গিয়েছিল তোমার সেই নিক্কনের ধ্বনি...  জীবন তখন তথাগত। শুদ্ধ সর্বংস্বহা। আচার সর্বস্ব জীবনে দেখি দূরে আমলকি বন, তৃষ্ণার আলো---নির্গ্রন্থ শ্রাবক


বেদনাপুর

আজকাল কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না আমার। মনে হয় পালিয়ে যাই কোথাও। ভাবনার গভীরে পলি জমে। কোথায় যাবো আমি? কার কাছে? কবিতা লিখি না, অনেক দিন। অনেক তো লিখেছি। কী হয় কবিতা লিখে? কী হবে?  বেদনার মতো রাত্রি নামে, ধীরে, সব বড় বিস্বাদ লাগে। আগে আমার পালিত বিড়াল ছিল, এখন নেই। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলতাম। এখন মানুষকে আমার ভয় লাগে। মানুষের এই অরণ্যে কে যেন লিখে রেখেছে কুসুমের গান। অথচ কুসুম কোথাও নেই। বেদনা আছে। বিরহ আছে আকাশলীন। বেদনাপুরে  চলে যেতে হবে একদিন...একা এবং অর্বাচীন... 

 

কুশল মৈত্র-এর কবিতা

সময়

রূপকথার মতো আমাদের শহর

হেসে কথা বলে আনমনে —

আকাশ সুর তোলে পাখিরা করে খেলা

হাসিভরা শিশুর দল

ফুলের মতো দোলে।

 

আমাদের শহর আজ কংক্রিটে মোড়া

ধোঁয়ায় আমরা মুখোশ পানে

স্বপ্ন টাঙানো স্মৃতি অ্যালবামে

বাড়ন্ত গাছেদের চোখে জল

 

বিপথগামী দূরত্ব

সাইরেন বেজে ওঠে —

 

আমরা শান্তভাবে পোষ্য জীব হয়ে

বেঁচে রয়েছি এখনো, একাকী।



কথা বলে না

গন্তব্য বলে কিছু থাকে না

পায়ে পায়ে রাস্তা বড় হতে থাকে

ঘড়ির সময় সন্ন্যাসী গুহায় আবদ্ধ।

 

কানে কানে মানুষের কথা বলি

চোখে মানুষ তেমন নজরে আসে না।

মূর্তি তৈরী হয়, বাজারে বিক্রি হয়

মানুষ বিক্রি কি, হয় এখন?

 

হাঁটতে হাঁটতে ফাঁকা রাস্তায়

অন্ধকার দেখি — সেখানে ছায়ারা

ঘিরে ধরে আমায়

আমি স্ক্রীনশট দিয়ে রাখি

আগামীকে বোঝাবো বলে —

আমার ছবি তাতে ধরা পড়ে না।

 

খবর ঠিকই বিক্রি হয়ে গেছে

ভাইরাল হবে নতুন সূর্য উঠলে

ফ্রন্ট পেজ ধরে আমি তখনও

হেঁটেই যাব —

 

গন্তব্য পৌঁছেছি কিনা আমার;

আমি শরীরটা তা ভুলেও যেন

কেউ বলবে না!

 

 

সৃশর্মিষ্ঠা-র কবিতা

মৃত মৎস্য মেয়ে 

তোমার গহনে জলের ধর্ম
জল সইতে যাওয়া বিবাহ সকাল 
সকালের ব্রহ্মাণ্ডে ধবল উৎসব 
ভীত নিশিডাক
আগলহীন উল্লসিত ঘাট
ঘাটের ধারেই তোমার অগাণিতিক শরীরের 
কুফল যেটুক। নৈঃশব্দের সুফল যৌনাঙ্গ। 
মাফিয়া মাছি বসে...ওড়ে

তোমার অরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াহীন ক্রিয়া
পৃথিবীর ইশারা বোঝে না। 
তোমার কঠিন টুকরোটি
জলের তৃতীয় নয়নের মতো, বেঁচে থাকে 
একাকী কিষাণের মৌন আবাদ...

 

শান্তনু গঙ্গারিডি-র কবিতা

ব্যক্তিগত কলাম

আমার ব্যক্তিগত কলাম
তোমার দলমার বৃংহতি
আমার পুরনো অ্যালবাম
তোমার অবৈধ বিলবোর্ড
আমার মহার্ঘ ছন্দপতন
তোমার নন্স-স্টিক পদোন্নতি
আমার ট্রাফিক আইল্যান্ড
তোমার জনস্রোত জলস্রোত
আমার হৃদয়বিদারক ইগনিশন-কী
তোমার ফটো-ফিনিশ লেবার-লাইন
আমার শত শত আশ্রমিক
তোমার হাতে হাত শূন্য থালা
আমার স্লো-মোশন কোজাগরী চাঁদ
তোমার কোলাজে রাঙা পার্কিং-লট
আমার ক্লোজ়-সার্কিট নলবন
তোমার ইন্তালিও ট্রেডমিল
আমার অন্যমনস্ক ক্যালোরি বার্নিং
তোমার পেগাসাসের খুর ও ডানা
আমি পাগ-মার্ক খুঁজে খুঁজে হয়রান

 

সুমিত্রা পাল-এর কবিতা

বিজয় নিশান

হেরে যাই

বারে বারে হেরে যাই,

অনুসরণ করি তাও-তত্ত্ব

যা ঘটছে তা ঘটে যেতে দিই।

 

দগ্ধ দীর্ঘবেলায় এখন মেঘমল্লারের তান...

ভরতপুরের ঝিল জুড়ে

 সাইবেরিয়ার সারসের রঙিন বাহার,

ভানগড়ের পরিত্যক্ত দুর্গ প্রাসাদে আর নেই

 দীর্ঘশ্বাসের ভার।

বর্ষাফলক উঁচিয়ে নীল ঘোড়ার সওয়ার,

শেষ বিকেলের আলোয় লিখে রাখে

 স্বভিমানের নতুন অধ্যায়!

 

ইতিহাস থেকে সমসাময়িক কাল

আমাকে করে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।

ধরে রেখেছি তাই, বিজয় নিশান।  

 

রিতম রিত-এর কবিতা


হরমোন ল্যাব

যে দরজা সয়ংক্রিয়
তাকে তুমি ইচ্ছাকৃত টেনে রেখো না।

ও বাফার-বালক

ছেড়ে দাও, যেতে দাও অন্তিম সীমায়
যেটুকু তোমার সীমা, নিঃস্ব যাপন

নিজেকে ভাঙতে পারও— ভাঙ্গো
আর প্রণয়-প্রবণতা ছেড়ে
যাও,
রেখে এসো প্রাণরস
কাচের দরজা টেনে, ও ঘরে, হরমোন ল্যাবে
                       
যে ঘরে পিপেট নিয়ে
বসে আছে, আমাদের মেহনতি এলাইজা গার্ল।

শিবালোক দাস-এর কবিতা


মিলিয়ে যায় সমস্ত দৃশ্য

লবণের স্বাদে বুঝি আজ কম পুড়েছে মাটি।
তবুও দুহাতে কেমন মিলিয়ে যায় সমস্ত দৃশ্য।

ও ভূমধ্যসাগর! তোমার দানে বিরত থাকতে
চায় না কুষ্ঠ, তাই তাকে আমি চুম্বন করি।
শান্ত সমীকরণে অঙ্ক কষলে সে দাগে কোনোদিন
কেউ হেঁটে যায় না, তাই ভুল হয়, আর‌ প্রতিদিন
আধখোলা চোখে কি সুন্দর স্পষ্ট হয়ে ওঠে
প্রতিটি পলক। আঃ তরঙ্গ দুলে দুলে ওঠে।

আমি তো নিজেই কোনো বীজ ফাটাইনি বুকে,
তাই রক্ত ঝরে পড়ে কম, তবু কেন চেপে ধরে
প্রতিটি শূন্যে ? কেন তোমার চোখের সামনে
ভেসে ওঠে একটি দেহ, যার প্রতিটি শ্বাসে
জমে উঠছে বালির পথ? বলো?

প্রতিটি দৃশ্যের জন্য দুটি রেখা আজ‌ মুছে
দেয় আড়ালে থাকা পিঁপড়ের বিষ।

অলক জানা-র কবিতা

বর্ণপরিচয়

কবেই ফেলে এসেছি বর্ণপরিচয় শেখার ক্লাস
সারাদিন সতর্কতার মধ্যেও কিছু ভুল বেশ পীড়িত করে, আরো কত বড়ো হলে ভুল বিদায় নেয়? যতক্ষণ ভাবছি, সেই মুহূর্তে নির্ভুল শব্দটি এক পলক দেখে নেয়, চোখে জল?
চলনে ভুল? দৃষ্টি ও জীবনের জন্য সুখকর এইসব মিথ কেবল বর্ণপরিচয় জানে।


স্পর্শ

দেখা হবে এই প্রত্যাশায়
অপেক্ষার বয়স এখন বছর শেষের চৈত্রসেল
সময়ের এই দীর্ঘ পরিবার ঠেলে
প্রিয় সাক্ষাতের জন্য প্রহরপাঠ
ভুলভাল ছেলেমানুষি? মোটেও না
অনুভূতিহীন স্পর্শকে প্রণয় ভেবে যারা
প্রতারিত, কেবল তারাই অপেক্ষার ছোবলে অভ্যস্ত মাধুকরী।