শুক্রবার, ১ অক্টোবর, ২০২১

কামরুন নাহার (সফেদ বিহঙ্গ)-এর কবিতা


অসামান্যা মেয়ে 

দেয়ালের আয়নায় লাল কালো টিপ ঝুলে আছে আজ বহুদিন। 

কাজলের কালি বোধহয় শুকালো।

আজ বহুদিন ঘরের বের হইনা

আজ বহুদিন আকাশ দেখি না।

 

আমি অসামান্যা, রূপসী, বেশ গুনী। লোকের কাছে আজীবন তাই জেনে এসেছি। 

 

আজ মনের সিন্দুক খুলে বসেছি 

আর বসতেই তার আয়নায় পড়লো নিজের চোখ।

 

হ্যা আমিই সেই মেয়ে যেকিনা ছিলো ভারি চঞ্চল, ছুটে বেড়িয়েছে পাড়াময়।

 

যার ছোটার গতির কাছে হার মেনে যেতো সবাই।

বয়সের সাথে সাথে জানা হলো

না আর ছুটতে নেই

এখন শান্ত হতে হবে।

 

রূপের বড়াই কিংবা সৌন্দর্যের প্রতি মোহ কোন কালেই যে খুব ছিলো এমন নয়।

 

কিন্তু নিজ সম্পর্কে না জানা মেয়েটিও একটি সময় জেনে যায়। 

রূপ বড়ো কাজের জিনিসই বটে। গুন কিছুবা কম হলেও হয়তো চলে যায়।

আর বুদ্ধি তা না থাকাই হয়তোবা মঙ্গল।

 

সমাজ ব্যবস্থা এখনো এতোটা উদার হতে পারেনি। 

যে একজন স্বাধীন, বুদ্ধিদীপ্ত নারীকে তার নিজ গুণে গ্রহণ করবে, তার নিজো মর্যাদায়। 

 

তাই এখানে এখনো প্রায়ই প্রয়োজন পড়ে যায় ভনিতার। কিছুটা লৌকিকতার।

 

হ্যা আমিই সেই অতি সাধারণের অসাধারণ অসামান্যা মেয়ে

যে স্বীকার করে নিচ্ছি।

হ্যা আমি সুবিধাভোগী।

এবং সুবিধা আমার অধিকার।

কেননা তা আমি নিজ গুণে অর্জন করে থাকি।

তা তুমি বা তোমরা কেউ আমাকে দাও না।

হয়তো আমারই মোহে অন্ধ হয়ে কিংবা কথার কৌশলে মুগ্ধ হয়ে, নতুবা রূপের মহিমায় নাজেহাল হয়ে আমাকে তা অর্পণ কর।

 

কেননা একজন বুদ্ধিদীপ্ত, স্বাধীন নারীকে গ্রহণ করার মানসিকতা এখনোও তোমাদের  গড়ে ওঠেনি।

 

হ্যা আমিই বলছি, আমি কবির কোন প্রচ্ছদের নায়িকা নই।

আমি একবিংশ শতাব্দীর সেই অসামান্যা মেয়ে

যেকিনা পদ্মফুল নয় শাপলা হয়ে জলে ভাসবে খুব সুন্দর সামান্যা হয়ে, নিজ গুণে।

প্রকৃতির এক অসাধারণ শিল্প হয়ে প্রতিভাত হবে সর্বাগ্রে। 

 

তা তুমি বা তোমরা গ্রহণ করো বা নাই বা করো।

কেননা অসামান্যারা একটা সময় জেনেই যায় তারা অসামান্যা, অসাধারণ।

উদয়ন চক্রবর্তী-র কবিতা

 

অমোঘ শৃঙ্খল 


নিঃশব্দে সিঁড়ি ভাঙে

লঘুসপ্তর্ষি মন্ডল

তারারাও এক্কাদোক্কা খেলে

নিজেদের সাথে।

মানুষ নিজস্ব একটুকরো আকাশে 

যত তারা দেখে জীবিত যাত্রাপথে 

ওদের চোখে একমুখি মানুষ সেখানে একমুঠো সোনার ছাই হাতে নিয়ে 

হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে দূরত্ব মাপছে

যে যার মতো  নিজস্ব না পাওয়া নিয়ে।

তারারা ধরে আছে হাত অমোঘ শৃঙ্খলে

ছেড়ে গেলে কেউ রাখে না খোঁজ কারও।

মানুষের পাওয়া হলে খোঁজে আরও কিছু 

হাত ছেড়ে হাত ধরে প্রয়োজনে আবার

মানুষই একমাত্র ভালোবাসায় খুঁজেছে 

আর একজন মানুষ কেন সে কথা না বুঝে।

অমিত চক্রবর্তী-র কবিতা


অপরিকল্পিত ধাক্কা

কাচের জানালা। একটি অপরিকল্পিত ধাক্কা।  

স্তম্ভিত হলুদ পাখি। স্বপ্ন আমি আগেও দেখেছি –

আচমকা রূঢ় ধাক্কা, সবজান্তাদের,

সে তো এক অস্থির কৌতুক। পাখিটি কি সবজান্তা ছিল?

হয়তো সাধাসিধে, অতিসরলধাক্কায় চেতনা না হলেও

আশ্চর্যবোধ জাগেস্বপ্ন নু, মায়া নু

মতিভ্রমের আশঙ্কা কমে যায় আশ্চর্য জটিল পথে,

প্রচন্ড আলোড়নে।

অথবা সে কি এক কৌতূহলী নাবিক, ইউলিসিস,

চুম্বক পাহাড় ঘেঁটে সাইরেন বোনেদের গান –

তুমি সে গান কখনো শুনেছো অতন্দ্রিলা,

 নাকি মিস করে গেছ                                                                                

ঘর গড়ার, ঘর ভাঙার সেই খড়কুটো,

পাকা ছাদের ডাক,

সমতল ভূমিতে তাই ছুটেছ নিরন্তর

সরলপথে,

সাকুল্যে

বিশ্বজিৎ কর-এর কবিতা

 

ভাবনার ক্যানভাসে 


ভুখা মিছিলের আর্ত চিৎকারের মতো শ্লোগান

না-লেখা কবিতার ছন্দ

হিসাবের কষ্টিপাথরে জমাখরচের আঁকিবুকি

না-বলা কথার কম্পন

ওদের প্রতিশ্রুতি বর্ষণের বাঁধভাঙ্গা স্রোত,

না-দেখা মানসিকতার বমন

পাইয়ে দেওয়া পুরস্কারের ফরমূলা

না-শোনা কবিতার কান্না

ভুখা মিছিলে আমার ভাত-ফোটানো মা

আজও শ্লোগান দেয় -

বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার....... 

 

কে আছো! টিভি- সুইচ্ অফ করে দাও

সুবিধাবাদের বেসুরো গান বাজছে

বর্ণজিৎ বর্মন-এর কবিতা


উপস্থিত 

এভাবে যাবার জন্য আসিনি তো -একা একা

এই জল জঙ্গল লতা-গুল্ফ  ভালোবেসে 

কতো বিচিত্র চন্দন বন ,পলাশের ডালে ডালে বসন্ত কোকিল কি সুমধুর সুর 

বাতাসে বাতাসে।

বিকেলের রোদ সবুজ ধান খেতে মরমি আলাপ জমায় 

 

ডুবন্ত সূর্য, ফিঙে সন্ধ্যায়  , জোনাকি জ্বলে ওঠে 

লেবুগাছে টুনটুনির বাসা অপূর্ব নির্মাণ চোখে ধাঁধাঁ লাগে 

উঠানে ছড়ানো ধানে

শালিকের কাঁচা হলুদ পা ভেসে ওঠে দিবাস্বপ্নে 

 

এভাবে  যাবার জন্য আসিনি তো একা একা 

এখানেই সব রঙ মেখে থেকে যাবো

এই তোর্সা , জলঢাকা,খেলার মাঠ ,তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতিতে

রাজীব চৌধুরী-র কবিতা


প্রান্তিক

কবিতা লিখতে লিখতে ফুরিয়ে যাওয়ার সময় আসে

ফেলে আসা কাদামাটি,পথ ঘাটের কথা মনে পড়ে

রেলগাড়ির মতো চলেছে পিঁপড়ে,ক্ষত জুড়ানো আঠা

বৃদ্ধের ত্বক ছুঁয়েআবালের পানা ডোবানো দুপুর

 

নৌকোর গলুই ছুঁয়ে সূর্য ডুবে আসে,রাত্রির গন্ধ নিয়ে বাতাসে

উদ্বাস্তু চাঁদ পথহারালক্ষ্যহীন,ধুকে ধুকে তুমি কোন দেশে যাবে

এমন কি আছে কোনো দেশদু'দন্ড শান্তি জুড়োবে

মাটির সাথে জুড়ে জুড়ে থাকে মাটিপথের সাথে জুড়ে জুড়ে থাকে পথ

 

ছানি পড়া চোখেনদী টেনে নিয়ে চলে শোকতাপ বিজড়িত মহাকালের গাথা

ফাটলে ফাটলে  রক্তক্ষরণ হয়ঝিমিয়ে পড়েজোছনা ভেজা রথ