সোমবার, ১ মার্চ, ২০২১

অশোক কর-এর কবিতা



 সান্ধ্য-অনুরাগ

ঝাউপাতার মন-উচাটন

সুর বেহাগের সান্ধ্য-অনুরাগ

সেতারের তারে ভিজেছে শান্ত বাতাস!

ঘুমঘোরে ঝাউপাতা শোনে সুর-অনুরণন

 

যারা জানে, তারা জানে;

প্রবালদ্বীপের ঢেউ কখন আছড়ে পড়ে বুকে

কেউ তারস্বরে চেঁচায়, ভাঙ্গে জীবনের সুর

মায়ামুগ্ধ ফুলের প্রজাপতি ওড়ায়!

 

ঝাউপাতা জানে, সব জানে;

পরিত্যক্ত জাহাজ চন্দ্রাহত ভেসে যায় দুরে

নুপূর ছন্দ তোলে, সেতারে বিষাদ সান্ধ্য-বেহাগ

বৃথাই খোঁজা ভেজাঘাসে শিউলীর সুবাস!

 

ঝাউপাতা তবু মুগ্ধ-অনুরাগে

মায়াচোখে নক্ষত্রের আকাশ খোঁজে

অবারিত পৃথিবী আদ্র ভালবাসায় গলে গলে

রাতভর ঝরে অমলিন স্বপ্নসুখে!

গোলাম কিবরিয়া পিনু-র কবিতা

 

হৃদয়গ্রন্থি

নদীকে বলেছি–––নদী বড় হও

      নদী বলে–––আমি জল ছাড়া বড় হই না

                    যত জল তত বড়

মানুষ কি একা বড় হয়?

 

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে–––নদী আরও বলে

জলছাড়া আমি অবলুপ্ত হই

                   বাতিলও হই

                         বিনাশও হই

                             কুলরক্ষা হয় না

কালগ্রাসে পড়ে কালসমুদ্রে হারিয়ে যায় কত নদী!

 

তালপুকুর  খালবিলও জল দিয়েছে–––

                            আমি প্রফুল্ল হয়েছি,

ঝরনার জল পেয়ে ঝরঝরে

আকাশভাঙা বৃষ্টির জলে চনমনে

প্লাবনের জলে তাজা

              ভূগর্ভস্থ জলে টলটলে

জলই উচ্চতা বাড়ায়–––জলই গভীরতা বাড়ায়!

 

একটা পোড়োবাড়ি থেকে জলগ্রন্থি খুলে

যেন প্রসারিত হয়েছিলাম–––

              তারপর মরুপথে

                        গিরিপথে

                          বনের ভেতর দিয়ে

জলের সাহচর্যে কুণ্ঠাহীনভাবে আমি প্রবহমান

জলের কপটতা নেই--জলের কুম্ভীরাশ্রু নেই!

 

আমি শুধু এইটুকু জানি–––

জলের উদারতায় উদারপ্রকৃতি হয়ে উঠি

                      ঊর্মিমুখর হয়ে উঠি

                          কল্লোলিত হয়ে উঠি

হৃদয়গ্রন্থি খুলে ধরেছি আমিও!

ইউসুফ মোল্লা-র কবিতা



 তুমি তো ইতিহাস

(উৎসর্গ: কবি শঙ্খ ঘোষ)

 

তুমি বনস্পতি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলে

আর তোমার ছায়ায় আমরা আশ্রয় পেলাম। 

তুমি শুধু বাবরের জন্য প্রার্থনা করলে না--

প্রত্যেক পিতার পক্ষে সন্তানের জন্য

তোমার প্রার্থনা!!! 

তোমার বয়স তো একটা সংখ্যা মাত্র

তুমি চিরঞ্জীব। 

 

আজ দেখি প্রত্যেক লেখক তাদের বিজ্ঞাপন দেয়

তোমার বিজ্ঞাপন লাগে না। 

কারণ তুমি জানো বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায়। 

সব বিজ্ঞাপনের তীব্রতা কেড়ে নেয়

সময়; আর এক নতুন বিজ্ঞাপন

কিন্তু তোমার বিজ্ঞাপন হয় না। 

তুমি তো ইতিহাস হয়ে গেলে।

দেবাশিস সাহা-র কবিতা


 শব্দবাউল,তোমাকে

(উৎসর্গঃ নাসের হোসেন)

নতুন এক ভারতবর্ষের খোঁজে
ভাগীরথীর পাড় বরাবর
হেঁটে চলেছে এক আত্মভোলা মুর্শিদ

হপ্তাশেষে ভাগীরথী থেকে নেমে আসে
ঝোলা ভর্তি ভারতবর্ষ নিয়ে
এক অক্ষরচাষী

ভূগোলের অলিগলি থেকে
আমাদের সান্তা
আদর কুড়িয়ে এনে
ভিজিয়ে দিচ্ছে ঘাসের আড্ডা

ঘাসের ঘাম ভর্তি  ঝোলা কাঁধে
এক মালবাহী জাহাজ
মহানগরে পৌঁছে দিতো মরুদ্যান

আমরা তাঁর নাম দিয়েছিলাম নাসের হোসেন

আমাদের কেউ কেউ
নাসেরদা
কেউ কেউ নাসের বলে
ইশারা করতাম।

কোনো এক বই-উৎসবের শেষে
লড়াই হলো খুব

শব্দবাউল ফিরে এলেন জয়ের হাতটি নেড়ে

গোপনে তৈরি হলো পথ
মুন্সীবাগানের দিকে

তুমি কি জানতে না নাসেরদা

মুন্সীবাগানের পথ থেকে
ফিরে আসেনা কেউ

কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখা
পত্রিকা আর প্রুফ ভর্তি ঝোলা
কোল হারিয়ে আজ অনাথ

অসমাপ্ত আদর মেখে
কচি কচি মুথা ঘাস
অপেক্ষায় রয়ে গেলো
ঘাসের আড্ডায়

শিস দিয়ে চলে যাচ্ছে ভাগীরথী
ঢেউ তুলে চলে যাচ্ছে ভাগীরথী
এপারের যাবতীয় লেনদেন রেখে
ওপারে চলে গেলেন ভালোমানুষ

কুয়াশায় ভিজছে
মুন্সীবাগানের সাড়ে তিন হাতের নবাব
চতুস্কোনের দিকে মুখ বাড়িয়ে বলছেন
তোমরা সবাই কুশল আছো তো??