শনিবার, ১ মে, ২০২১

সুবল দত্ত-এর ঝুরোগল্প

 

রিপোর্ট  


নিজস্বসংবাদদাতা: মুর্গালড়াই সমিতি, কর্ণক্ষেত্র

 
আজ অতিমার হিংস্র বদতমিজ লড়াইয়ের মুর্গাটি নিহত। না, এখন কোনো পরবের সময় নয়। তবে এই মুরগাটি এমন বলশালী, কখনো কোনো লড়াইয়ে হারতো না। ওর উপরে যারাই বাজী রাখতো,জিতে যেত। এটির মালিক অনেকগুলিই। তবে সমিতিতে এবার যিনি অধ্যক্ষ নির্বাচিত তিনি তান্ত্রিক। এখন তিনিই লড়াইয়ের চারণ ক্ষেত্র তৈরি করেন। খবর এই যে, প্রতিপক্ষ হারবেই, তা নিশ্চিত জেনেও এই মুরগাটির পায়ে যে তীক্ষ্ণ ছুরিটি বেঁধে দেওয়া হতো তাতে বিষ মেশানো হতো,যাতে নিহত পক্ষীটির মাংস যারা খেত তারাও অসুস্থ কমজোর হয়ে পড়ত। এমনিতেই হামেশা জোর করে জুয়া খেলতে বাধ্য করায় তারা সর্বসান্ত হয়ে কমজোর প্রতিবাদহীন। এই পরম্পরা দীর্ঘদিনের। কোনো পক্ষের কারো কোনো ওজোর আপত্তি থাকতো না। তবুও চলতো ওই মুর্গাটিকে ব্যবহার নিয়ে পলিটিকস। প্রতিটি লড়াইয়ে বীভত্স জিত হওয়ার জন্য ইদানীং এই লড়াকু মুরগাটির আচরণ বেশি মাত্রায় হিংস্র হয়ে গিয়েছিল। গতকয়েকদিন আগে ছাড়া পেয়ে মুর্গা খোঁয়াড়ের বেশ কিছু পক্ষীর হত্যা করে উড়ে পালিয়েছিল। সেটিকে আজ একটি পাঁচিলের ধারে মৃত পাওয়া গেছে। খবরে প্রকাশ যে পাখিটি উঁচু দেওয়াল উড়ে পার হবার সময় নিজের ছুরিতে চোট লেগে মরে। এটি অধ্যক্ষ মশাইয়ের কথা কিন্তু অন্য ভাগীদার সন্দেহ প্রকাশ করছেন। যাইহোক। মুরগাটি বেশ ভারী ছিল। তার মাংস রান্না করে অধ্যক্ষ বাদে সব পক্ষই আজ পার্টি করবেন। তবে যে খেরো খাতাটিতে সেই পক্ষীটির দ্বারা উপার্জিত জমা রাশি ও তার হিসাব কিতাব,সেটি এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। 

প্রাণজি বসাক-এর অণুগল্প


 ঠাণ্ডা হাত দুটো

আগরতলায় কুয়াশা – বিমান উড়ছে না সকাল থেকে । কলকাতায় নামল এক ঘণ্টা দেরীতে । বোর্ডিং হল । আমার পাশের সিটে এক কিশোর বালক । হ্যালো-হাই হলে সে জানায় ওর বাবা বিএসএফে চাকরি করে । ত্রিপুরা বর্ডারে পোস্টিং । কয়েকদিন আগে আচমকা ওর বাবার ব্রেন হেমারেজ হয়েছিল । এখন খানিকটা সুস্থ । মাকে রেখে ও ফিরছে ।



কাল থেকে ওর স্কুল খুলছে । ক্লাস এইটের ছাত্র , পড়ে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় ছাওলা ক্যাম্প দিল্লিতে । কথায় কথায় গল্পে গল্পে জিজ্ঞেস করলাম ওর ক’জন বন্ধু রয়েছে । ডানহাতের আঙুল তুলে দেখাল –পাঁচজন । বন্ধুরা সবাই দক্ষিণ ভারতীয় । ছেলেটি ব্যাঙ্গালুরুর । যদিও মাতৃভাষা কান্নাড় , তবে বলে হিংলিশ ।হাল্কা মেজাজে জিজ্ঞেস করি – তোমার ক্লাসে কোনো বাঙালি ছাত্র নেই । সে বলে – হ্যাঁ আছে । একটি মেয়ে, মিস গৌরী কুন্ডু ।



তাই । ইউ মাস্ট টেল হার টু সিং রবীন্দ্র সঙ । ওর কাছ থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে নেবে । ইউ উইল এনজয় ।



আঙ্কল, শুনেছি । ও একটি গান শোনায় মাঝে মাঝে । আ গু নে র প র শ ম নি ছোঁ য়া ও প্রা ণে ...



ভেঙে ভেঙে ওর নিজস্ব উচ্চারণে বলে ।



আঙ্কল, ও আমার হাত ধরে গানটি গায় । ওর হাত দুটো ভেরী-ভেরী কোল্ড , বেজায় ঠাণ্ডা ।

অসীম কুমার রায়-এর অণুগল্প


সাদা ক্যানভাস

কাগজের পৃষ্ঠাটা সাদা ছিল। তখনও কোনো কালির আঁচড় সাদা পৃষ্ঠায় লাগেনি। গল্পের প্রথম অংশে কোনো অক্ষর,শব্দ, বাক্য কিছুই ছিল না...। সাদা আর সাদা। দুধের মতন। কিংবা রূপকথার সমুদ্রের মতন।

 

একজন বাতিকগ্রস্থ  লেখক ভাবল, গল্প-সল্পতে একটি গল্প লিখবে। কিন্তু শত শত শব্দে, কালো কালো অক্ষরে, অজস্র অজস্র সরল, যৌগিক এবং জটিল বাক্যে ভিড় করে আসা তার জীবন – এই মুহূর্তে কিছুই লিখতে পারল না৷ শুধু  সাদা পৃষ্ঠার প্রথম অংশ ছেড়ে দিয়ে,  নিচের দিকে প্রথমে সে একটি মেয়ের মুখ আঁকলো। তারপর একটি ছেলের। ছেলেটা ও মেয়েটার ছবির নিচে দুটো ফুটকি ও ড্যাশ দিয়ে ব্যর্থ লেখক গল্পটা শেষ করলেন।

        

গল্পটা পোষ্ট করা মাত্রই হৈ হৈ, রৈ রৈ করে কমেন্ট শুরু হোল।   প্রথম জন লিখল, “এটা কী ছবি না গল্প? না কবিতা! না প্রবন্ধ? মহাশয় অনুগ্রহ করে একটু বলবেন?”

    দ্বিতীয় জন, “আপনি কি  সিম্বলিজ্‌ম এনে একটি জীবনের গল্প লিখতে চেয়েছেন”

       তৃতীয় জন, এগুলো খ্যাপা লোকের খ্যাপামী।

       “সাদা পৃষ্ঠা — মানে, সাদাটে মার্কা আমাদের — ফাঁকা জীবন৷ তার নীচে, একটি পুরুষের ও একটি নারীর ছবি৷ সব শেষে, বহু ব্যবহৃত আমাদের লেখ্য ভাষায় — কোলন চিহ্ন —  প্রেম অথবা প্রেমহীনতা – অস্থিরতা –

লেখক এটাই বুঝাতে চেয়েছেন‌ মনেহয়!” আরেকজন লিখল।

       “নারী ও একটি পুরুষ — নীচে দুটো ফুটকি ও একটি ড্যাশ। এটি একটি চটি গল্প৷ এগুলো কি মাথায় কিলবিল করছে মশাই?”

       অপর একজন লিখল, “সাদা পৃষ্ঠা – মানে আমাদের জীবনের মতন। শেষে প্রতীকের আশ্রয় — মানে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পন। কোলন চিহ্ন মানে এখানে আমাদের লিঙ্গ চিহ্ন — শিব বা মঙ্গলের ধারণা৷”

         

একজন কমেন্টে লিখল, “যারা যারা খিল্লি করতে চাও সব এক লাইনে এসে দাঁড়াও।” 

    “কোলনের মতন দুটো ফুটকি পাশে ড্যাশ — অসভ্য। আপনি মানুষ না চতুষ্পদ?” 

    আরেকজন, “এই আপনাদের মতোন অসভ্য লোকদের জন্যই সাহিত্য সংস্কৃতিতে এত অপসংস্কৃতি। আপনাদের মতন লেখকদের গুলি করা উচিত।” 

    কিছু তরুণী লিখল, “ফুটকি ড্যাশ ঠিক আছে, কিন্তু ড্যাশের গায়ে জামা পড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল লেখকের৷”

  আরেকজন মহিলা,“দেখ কী অসভ্য। জানোয়ার। এদেরকে পুলিশে দেওয়া উচিত।”    শুধু কেউ কেউ বলল, “এটার ভিতরে হয়ত একটা গভীর ইনার মিনিং আছে।”

 

লেখকের উত্তর — “আমার গল্পে প্রথমে যে ফাঁকা সাদা অংশটা রেখেছি, সেটা আমাদের জন্মের পর মুহূর্তের ফাঁকা জীবন। যার যা জীবন — ঘটনা-দূর্ঘটনা, হতাশ-হাহুতাশ, পাওয়া-না পাওয়া, ব্যথা-যন্ত্রণা, সুখ-দুঃখ, লজ্জা, ঘেন্না, ভয়, আনন্দ, শোক, তাপ, জ্বালা, হীনমন্যতা, অনুতাপ, অনুশোচনা...। ঐ অংশে সেটা সে লিখবে। আর একটি নারী এবং পুরুষের ছবির নীচে কোলন এর পর ড্যাশ – আপনারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জীবন নিয়ে খিল্লি করবেন আবার ভূয়সী প্রশংসাও করবেন...। মান আর অপমান নিয়েই তো আমাদের জীবন...! বলুন, তাই নয়?”