রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

তপন বাগচী-র প্রবন্ধ

কবি জসীমউদদীন : তাঁর সংগীতচর্চা 

জসীমউদদীনের (১৯০৩-৭৬) পরিচয় পল্লিকবি হিসেবেই প্রকটিত হলেও তিনি কবি, আধুনিক কবি, লোকায়ত জীবনের আধুনিক কবি।জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু, গা-খানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু’ --এরকম দুটি মৌলিক উপমার মাধ্যমেই তাঁর আধুনিক কাব্যচিন্তার ধরন বুঝতে পারা যায়। কিংবা তাঁর চরণ--

মন সেতো নয় কুমড়ার ফালি, যাহারে তাহারে 

কাটিয়া বিলানো যায়।

তোমারে যা দিছি, অপরে তা যবে জোর কওে চাবে

কী হবে উপায় হায়!’

এরকম আধুনিক কাব্যালঙ্কার জসীম-পরবর্তী কজন আধুনিক কবি সৃষ্টি করতে পেরেছেন। তবু তাঁকে আধুনিক কবি বলতেই নারাজ একালের সমালোচককুল। 

আমরা জানি যে জসীম কেবল কবি- নন, গান-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ-, স্মৃতিকথা-ভ্রমণকাহিনি লিখেছেন এবং লোকসংগীত সংগ্রহ মূল্যায়ন কওে ফোকলোরবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন, সরকারি সংস পাবলিসিটি বিভাগের (অধুনা গণযোগাযোগ অধিদফতর) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এতসব পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে তাঁর কণ্ঠশিল্পী পরিচয়টি। জসীমউদদীন গান লিখেছেন, লোকমুখ প্রচলিত গান সংগ্রহ করেছেন, সুরসহ গান তুলে দিয়েছেন আব্বাসউদদীন আহমদ আবদুল আলীমের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে। এঁদের তিনি গান শিখিয়েছেন এমন স্বীকারোক্তিও রয়েছে জসীমের স্মৃতিকথায়।

জসীমউদদীন তাঁর ফরিদপুর অঞ্চলের কানাইলাল শীলকে দোতারাবাদক সংগীতসংগ্রাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। এইচএমভি রেকর্ড কোমম্পানি এবং আকাশবাণীতে বাজানোর সুযোগ করে দিয়েছেন জসীমউদদীনই। জসীমউদদীন আকাশবাণীতে সংগীতও পরিবেশন করেছেন। বিশেষত কবির লড়াইতে তিনি অংশ নিয়েছেন, সে কথাও অনেকের জানা। জসীমের কণ্ঠ তেমন সুরেলা ছিল না হয়তো, কিন্তু সুরের খেলাটা তিনি রপ্ত করেছিলেন। তাই মাঠের কবিয়ালদের গান নিজ কণ্ঠে ধারণ করেছেন, নিজে তাৎক্ষণিক রচনায় কবি গান গেয়েছে, আবার কবির দলের পক্ষ হয়ে বেতারেও গান পরিবেশন করেছেন। একজন আধুনিক কবির পক্ষে কবিগান পরিবেশন করা, অনেক বড় সাহসের বিষয়। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি কণ্ঠশিল্পের পরিচয়কে তুলে ধরলেন।

জসীমউদদীনের সংগৃহীত গান গেয়ে আব্বাসউদদীন খ্যাতি বিস্তৃত হলো। বৃহত্তর ফরিদপুর থেকে গান সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন জসীম। কিন্তু কেবলই গান নয়, সঙ্গে থাকতো সুর। সেই সুর তো কেবল জানেন সংগ্রাহক। কণ্ঠের জোর না থাকলে এই কাজ সম্ভবপর হয়, তা বুঝতে বেশি চিন্তা করতে হয় না। 

আব্বাসউদদীন বিখ্যাত হওয়ার জন্য ভূমিকা রেখেছিল ভাওয়াইয়া গান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পরেও জসীমউদদীন গিয়ে উঠলেন কাড়েয়া রোডের ছোট্ট একটা বাড়ির কোঠাঘরেও, যেখানে থাকতেন গোলাম মোস্তফা আব্বাসউদদীন। একজন কবি আর একজন শিল্পী। সেখানে যুক্ত হলেন কবি শিল্পী জসীমউদদীন। তিনজনেই থাকতেন একটি ঘরে। তিনজনের সংসারেও কোনো কাজের লোক ছিল না। তিনজেনই বাজার করতেন, তিনজনেই রান্নাবান্না করতেন। রান্নাবান্নার মধ্যেই চলতে গান। গোলাম মোস্তফার গানের গলা মোটামুটি। আব্বাসের গানের গলা তো সেই সময়ের সেরা। কিন্তু জসীমের কণ্ঠ সুমধুর নয়। জসীমের ভাষায়-‘কত রকমের গান যে হইতো রান্নার সমং। আব্বাস আর মোস্তফার সুরেলা কণ্ঠের সঙ্গে আমার বেতালা কণ্ঠস্বও মিলিয়া একটা তাল-বেতালের কা- হইতো।

সেই সময়ে যে সকল গানের সঙ্গে জসীম কণ্ঠ মেলাতেন তা হলো--

কীসের বা রান্ধন, কীসের বা বাড়ন

কীসের বা হলুদের কোটা

আমার নয়নের জলে এবুক ভিজিল

ভাসিল হলুদের পাটা।

কিংবা

যখন কালা বাজায় বাঁশি

তখন আমি রানতে বসি,

আমি রানতে বসে কানতে বসি ড়ো

হলুদ দিতে দেই লবণ;

পরের জন্য কান্দেরে আমার মন।

বোঝা- যাচ্ছে যে, তিন বন্ধু মিলে লোকসংগীতের চর্চা করতেন। এবং এইসব গানের কলি সুর জসীমউদদীনের পক্ষেই সংগ্রহ করা সম্ভবপর ছিল। আর সেই গীতিময় পরিবেশের সরস বর্ণনা ফুটে উঠছে জসীমের জবানিতে--‘আমাদের মুখে ছিল অদম্য হাসি, কণ্ঠে ছিল নেই বংশপরম্পরায় পাওয়া পল্লিকবিদের ভাবধারা। গান গাহিতে গাহিতে চোখে অশ্রুধারা বহিতে চাহিত। তখন আব্বাস আমার মুখের নকল করিয়া এমনি ভঙ্গি করিত যে, হাসিয়া গড়াইয়া পড়িতাম। আমাদের রান্না দেখিতে পাশে বাড়ির লোকেরা আসিয়া জড়ো হইত।

জসীমউদদীন যে গানের ভেতরের কৌশলগুলো জানতেন, তা পরিস্ফুট হয় গানের পরিভাষা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। জসীম বলেন, ‘‘আমি যখনরানতে বসে কানতে বসি রেগাহিয়া কণ্ঠের স্ববর উদারা মুদারা ছাড়াইয়া দিতাম, তখন আব্বাস মুখভঙ্গি করিয়া ধরিত: ‘হলুদ দিতে দেই লবণ’, অমনি মোস্তপা সাহেব এক খাবলা লবণ লইয়া তরকারিতে ছাড়িয়া দিতেন। সেদিন তরকারিতে এত লবণ হইত যে কী বলিব।’’

তর্কের খাতিরে বলা যেতে পারে যে, এই গান সেই গান নয়, যার জন্য জসীমউদদীনকে কণ্ঠশিল্পী বলা যেতে পারে। তাহলে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে কিছু কথা বলতে হয়! ভাওয়াইয়া আর ইসলামি গানের শিল্পী আব্বাসউদদীনকে পল্লিগান গাওয়ার সুযোগ করে দিতে জসীম অবতীর্ণ হলেন গানের শিক্ষক হিসেবে। আব্বাসের গানের শিক্ষক জসীম? কপালের চোখ তোলার মতো খবর বটে! কিন্তু এটিই সত্য। গোলাম মোস্তফা যখন বিয়ে কওে ভিন্ন বাড়িতে ওঠেন, তখন একঘওে পড়ে রইলেন জসীম আব্বাস। জসীম তখন আব্বাসে পল্লিগান শেখাতে বসেন। গান শিখতে আব্বাসের একটু বেশি সময় লাগতো। কোনো কোনো গান শিখতে একমাসেরও বেশি সময় নিতেন বলে জসীম জানিয়েছেন। জসীমের ভাষায়Ñ‘এনবার আমি আব্বাসকে গ্রাম্য-গান শিখাইতে আরম্ভ করিলাম। আব্বাস উল্টরবঙ্গেও লোক। পূর্ববাংলার সুর তার গলায় আসে না। সে গান শিখিতে হগারমোনিয়াম লইয়া কসে। ভঅটিয়ালির সুর এত সূক্ষ্ম যে হারমোনিয়ামের পরদায় তাহা বাজানো যায় না। সেখানে সুর পোয়া মাত্রা বা তারও কম, সেখানে হারমোনিয়াম াচল। কিন্তু আব্বাস হারমোনিয়ামের সঙ্গেই গানের সুর মিলাইতে চায়। ইহা লইয়া তাহার সঙ্গে আমার বচসা হইত। দুই বন্ধুতে তর্ক-বিতর্ক করিয়া বহু সময় অপব্যয় হইত। তাহা ছাড়া তাকে গান শিখানো যে কত কঠিন, তাহা যহারা তাকে গান শিখাইছেন, তাঁহারাই জানেন। এক-একটি গান শিখিতে আব্বাস একমাসেরও বেশি সময় লইত। আমি নিরস্ত হইতাম না। ভাবিতাম, তার মতো সুরেলা কণ্ঠে যদি গ্রাম্য-গান ঢুকাইয়া দিতে পারি, তদবে শহরের সমাজে লোকগীতির একটি উচ্চস্থান তৈরি হইবে।এইখানে স্পষ্টতই প্রতিভাত যে জসীমউদদীন গান গাইতেন, এবং গান শেখানোর মতো শিল্পীসত্তা অর্জন করেছিলেন। আব্বাসেক জসীম যেসকল গান শিখিয়েছিলেন তার মধ্যেধামার গহিন গাঙের নাইয়া’, ‘তোরা কে কে যাবি লো জল আনতে’, ‘ধাগে জানলে তোর ভাঙা নৌকায় চড়তাম না’, ‘তুই যাওে হানলি ওে আঞঘাত, সে কি তোর পর’, ‘বাজান চল যাই চল, মাঠে লাঙল বাইতেপ্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

আব¦াসউদ্দীন যে জসীমউদদীনের শিষ্যত্ব গস্খহণ করেছিলেন, সেই খবর প্রচার হলে আব্বাসকে ছোটো করা হয়, এমন বিবেচনা থেকেই হয়তো তাঁর সন্তানেরা এই সত্য স্বীকার করতেন। জসীমউদদেিনর আক্ষেপবাক্য থেকেই সেই কথা জানা যায়। তিনি বলেন, ‘ধাব্বাস তার আত্মজীবনীতে আমার প্রশংসা করিয়াছে কিন্তু আমি যে কীভাবে তাহাকে লোকগিিত শিখাইছি, তাহার উল্লেখ করে নাই। আব্বাসের ছেলেআব্বাসউদ্দীনের গানপুস্তকের ভূমিকায়ও গানের এই শিক্ষাদানের কথা উল্লেখ করেন নাই। কিন্তু তষনকার দিনের আব্বাসের বন্ধুরা সকলেই জানিতেন কীবাবে আমি আব্বাসকে পল্লীগানে শিক্ষাদান করিয়াছিলাম। মা যেমন সন্তানকে স্তন্য দুগ্ধ দিয়া লালন কওে, সেইভাবে আমি আব্বাসকে লোকসংগীতের সুরসুধা পান করাইয়াছিলাম।কেবল আব্বাসউদদীন আবদুল আলীমকেই নয় তিনি আরও অনেককে গান শিখিয়েছেন।আমার গহীন গাঙের নাইয়াগানটি ছাত্রাবস্থায় শিখেছিলেন জসীমের সহপাঠী আবদুস সালাম খান। তিনি ানেক অনুষ্ঠানে গানটি গাইতেন। সাবেক মন্ত্র কর্নেল ফারুক খানের চাচা এই আবদুস সালাম খানও মন্ত্রী হয়েছিলেন। এই গানটি জসীমউদদীন তৎকালীন প্রখ্যাত শিল্পী হিমাংশু দত্তকেও শিখিয়েছিলেন। অনেক অখ্যাতি শিল্পী এসে জসীমউদদীনের কাছে গান শিখে বিখ্যাত হয়েছেন। কণ্ঠ সুরেলা না হলেও জসীম গাইতেন এবং গেয়ে-গেয়েই শেখাতেন গান।

এশবার চাচার বিয়ের বরযাত্রী গিয়ে ঢোলের বাদ্য শুনে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন কবিগান হচ্ছে। তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে সেই গান শুনতে লাগলেন। এবং বিয়ে বাড়িতে ফিরে বরযাত্রার পেছনে পেছনে চলতে গিয়ে কবিগানের আসওে চেনা সুর নেচে নেচে গাইতে লাগলেন। তাঁর ভাষায়, ‘এইরূপ গাহিতে গাহিতে সুরের ভিতরে যেখানে নারে নারে করিতেছিলাম সেখানে যা-তা ইচ্ছামতো কথা জুড়িয়া দিয়া ছন্দের পরিমাপ বিষয়ে আমার মনে একটা ধারণা আসিল। তারপর হঠাৎ কথার সঙ্গে কথা আসিয়া কেমন করিয়া যেন একের সঙ্গে অপরের মিল হইয়া গেল। তখন আর আমাকে পায় কে; সারা পথ ইচ্ছামতো উপস্থিত বোল রচনা করিয়া গান গাহিতে লাগিলাম। সে কি আনন্দ! কথার সঙ্গে কথা আসিয়া যখন মিলের বন্ধন পরিতেছে, তাহার তালে তালে আমার বুক নাচিয়া উঠিতেছে।এই গাওয়াও তো একজন শিল্পী হিসেবে গড়ে ওঠার পর্যায় মাত্র। পরিণত বয়সে তিনি নরসিংদীর কবিয়াল হরিচরণ আচার্যেরও সঙ্গে দেখা করেছিলেন। প্রখ্যাত গুসংগীতশিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস জসীমের কণ্ঠের প্রশংনা করলে তাঁর শিল্পীসত্তার প্রশংসা করেছেন। এক স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন, ‘নানা অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গান গেয়ে চলেছিলাম আমরা। কাজেই কবি জসিমউদ্দীনও [?] গান ধরলেন। পূবর্ব ঙ্গের রাখালীয়া গানের বিলম্বিত সুরের সূক্ষ্ম খোঁচগুলি এমন চমৎকার তাঁর গলায় উঠছিল যে সরল সবুজ গ্রাম্যতার স্পর্শ আমরা সবাই তাতে পাচ্ছিলাম। অথচ গায়ক বলে কিন্তু তাঁর নাম নেই। -গানই হয়তো রেকর্ড বা রেডিওতে অচল। অন্য যে কোনো শহুরে পল্লীগায়ককে দিয়ে গাওয়াতে গেলে তাঁর গলার এই গান জল ছাড়া মাছের মতো ছটফটিয়ে মরবে।আকাশবাণীতে গান পরিবেশন, আব্বাস-আলীম-হিমাংশুকে গান শেখানে, বিভিন্ন আসরে স্বকণ্ঠে সংগীত পরিবেশনের তথ্য জানার পরে জসীমউদদীনকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি থাকার কথা নয়।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন