রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

শাশ্বত বোস-এর প্রবন্ধ

রঙ্গমঞ্চ’…আদি থেকে অবক্ষয়, যেন অনুসারী মায়াময়তার আখ্যান 

তিরিশে অগ্রহায়ণ, কৃষ্ণা দ্বাদশী তিথি, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর, রবিবার, শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস বসে আছেন মঞ্চের সামনে। ঠিক পাশেই বসেছেন মাস্টার বাবুরাম নারায়ণ। বাংলার গ্যারিক শ্রী গিরিশ ঘোষও এসেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যে গিরিশবাবুর লেখা নাটকের প্রশংসা করছেন। বরং গিরিশের মনেই তখন ঈষৎ সংশয়! “লিখেই গেছি শুধু ঠাকুর! ধারণা হল কই!” ঠাকুর আশ্বস্ত করে বলছেন, “লিখেছ এমন, ধারণা নিশ্চিত হয়েছে।গিরিশ হয়তো তখন নিজের creative rut ঝেড়ে ফেলছেন ঠাকুরের সামনে, “মাঝে মাঝে মনে হয় থিয়েটার আর করা কেন!” উত্তরে ঠাকুর হয়তো সহাস্যে বলছেন, “না না থাক, ওতে লোকশিক্ষে হবে।খানিকক্ষণের মধ্যে যদি ফ্রেমটা ফেড আউট করে যায় চোখের সামনে থেকে, বেশ কিছুটা দৃশ্যগত প্রতিক্রিয়া আর অনেকবার স্নায়ুশিরা কেঁপে ওঠার পর ধীরে ধীরে আমরা হয়তো বুঝতে পারবো, এই থিয়েটারের লোকশিক্ষা দেবার দায়টা প্রায় যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত সত্য। প্রখ্যাত আমেরিকান অভিনেতা ব্যারিটোন গায়ক টেরেন্স ভন মান এর একটি প্রখ্যাত উক্তি আছে, “Movies will make you famous, Television will make you reach But theatre will make you good” এর আগে বাংলা থিয়েটারকে মূল স্রোতে নিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণ। সেই ১৮৮৪ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর, ঠাকুর স্বপার্ষদ গিরিশচন্দ্রের চৈতন্যলীলা দেখতে গেলেন। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকবার ভাব হোল তাঁর। দেখার শেষেকেমন হয়েছে?’ এর উত্তরে তিনি গিরিশ্চন্দ্রকে বললেন, “আসল নকল সব এক হয়ে গেছে।সেই স্থানেই স্বয়ং নটী বিনোদিনী তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে আশীর্বাদ করে তিনি বিনোদিনীকে বলেন, সেই শাশ্বত সারাৎসার, “মা তোর চৈতন্য হোক!”


কিন্তু সত্যিই কি থিয়েটারকে লোকশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে নিয়েছিল সুশীল সমাজ! সাধারণত রঙ্গমঞ্চের শুরুর দিকে ছেলেরাই মেয়েদের পোশাক পরে অভিনয় করতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরামর্শে বেঙ্গল থিয়েটারে প্রথম অভিনেত্রীদের প্রবেশ ঘটে এবং সেই সাথেই পতিতাবৃত্তির মতন কৌলিন্যহীন পেশাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা মেয়েরা যেন জীবন যুদ্ধে শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে ওঠবার ছাড়পত্র পায়, এই পুরুষশাসিত সমাজের কাছে। বাইজিঘরে বা বেশ্যাকোঠার বিছানায় শুধু নয়, রঙ্গমঞ্চের আমোদক্ষেত্রে বিনোদনমূলক প্রোডাকশনগুলোতেও এবার থেকে তথাকথিত বাবু শ্রেণী পেতে শুরু করলো, ‘মেয়েছেলে স্বতঃস্ফূর্ত ছলাকলার আস্বাদ! কিন্তু ঠিক সেই দিন থেকেই ভদ্র শিক্ষিত বঙ্গসমাজ থিয়েটারের সাথে সব পাট চুকিয়ে দেয়। কেশব সেন থেকে নরেন্দ্রনাথ এমনকি স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাইও মঞ্চে পতিতার অভিনয় মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু স্বয়ং শেক্সপিয়ার তো তারঅ্যাস ইউ লাইক ইটনাটকে বলতে পেরেছেন, সমগ্র বিশ্ব একটি মঞ্চ এবং সকল নারী পুরুষ সেই মঞ্চে এক একজন খেলোয়ার। থিয়েটার মূলতঃ একটি পারফর্মিং আর্ট যা এই genZ, chatGPT আর গুগল এর জমানাতেও সমান ভাবে চিরকালীন আবার একইসাথে চূড়ান্তভাবে মৌলিকতা মানব দক্ষতা নির্ভর। আবার হয়তো সেই থিয়েটারই পারে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে মানব মনের গভীরে গিয়ে মূল্যবোধে নাড়া দিতে। তৈরী করে দেয় অখণ্ড আত্মবিশ্বাস! ভেঙে দেয় মুহূর্তের গায়ে সমসত্ত্বে লেগে থাকা লুকোনো ভয় ভীতির নিখাদ আঁধার!


১৯৪৪ সালে নবান্ন নাটকের মাধ্যমে মূলত গ্রূপ থিয়েটারের জন্ম হয় এবং সেই প্রথম হয়তো পেশাদারী রঙ্গমঞ্চ নিজের যাত্রাপথে বেমক্কা এক বাঁক নিল! কলকাতা থিয়েটার দ্য প্লে হাউস এর মতো মঞ্চগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কলকাতার প্রথম দিককার নাটক ছিল মূলত অভিজাত ইউরোপীয়দের জন্য। এইবারে হয়তো সেই আত্মবিস্মৃত শিল্প প্রদর্শন, খুঁজে পেল এক অতীন্দ্রিয় মানব চেতনা! জন্ম হল গণনাট্যের! উদ্দেশ্য সামাজিক রাজনৈতিক স্তরে শ্রেণীচেতনার উন্মেষ ঘটানো! এই ভীষণ প্রতিক্রিয়াশীল সময়ে পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের দাপট কিন্তু বিন্দুমাত্র কমেনি। ক্রমবিবর্তনের হাত ধরে মঞ্চ সিনেমা এই দুই আপাত স্ববিরোধী মাধ্যম শিল্পের তাগিদে একে অপরের হাত ধরাধরি করেই চলেছে অবিরত। নটসূর্য্য অহীন্দ্র চৌধুরী, পাহাড়ি সান্যাল, কমল মিত্র, নটসম্রাট ছবি বিশ্বাসের হাত ধরে রঙ্গমঞ্চ সিনেমায় প্যারালাল অ্যাক্টিং এর যে ধারা শুরু হয়েছিল অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়, শিশির ভাদুড়ী, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অরুন মুখোপাধ্যায়, রমাপ্রসাদ বণিক, মনোজ মিত্র হয়ে নিজ নিজ সময়ের চিত্র তারকা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, নৃপতি, শ্যাম লাহা, কানু বন্দোপাধ্যায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, নির্মল কুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অনুপ কুমার, ভানু বন্দোপাধ্যায়, জহর রায়, সত্য বন্দোপাধ্যায়, কালী ব্যানার্জী, রঞ্জিত মল্লিক এমনকি আশি বা নব্বইয়ের দশকে উঠে আসা শঙ্কর চক্রবর্তী, ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, পাপিয়া অধিকারী, তাপস পাল, মহুয়া চৌধুরী, রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী মায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নামক অভিনয়ের চারাগাছটির ইন্ডাস্ট্রি হয়ে ওঠবার প্রাক মুহূর্ত অবধি সে ধারা নিজস্ব গমকে মুখর করে রেখেছে অভিনয় জগতের দিগমণ্ডল। এমনকি অনেকেই হয়তো জানেন, ষ্টার থিয়েটারে প্রায় তিনশ রজনী দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিলেন স্বয়ং মহানায়ক, শ্যামলী নাটকে তার অনন্য অভিনয় শৈলীর মাধ্যমে। সাথে বোধহয় যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন কিংবদন্তী শিল্পী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় এক মূক মেয়ের চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে।


ইতিহাস বলছে প্রথম বাংলা নাট্যমঞ্চ স্থাপন করেন রুশ মনীষী লেবেদেফ। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ডোমতলায়। এখন রকমারি আলোর পসরা সাজিয়ে যে জায়গাটি এজরা স্ট্রিট নামেই বেশী পরিচিত, ঠিক সেখানটাতেই বেঙ্গলী থিয়েটার স্থাপন করে সেই বছরেই ২৭শে নভেম্বর কাল্পনিক সংবদল নামের একটি বাংলা অনুবাদ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এর আগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত দুটি নাট্যমঞ্চ ছিল। যেখানে কেবল ইংরিজি নাটকই অভিনীত হত। কিন্তু লেবেদেফের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে উনিশ শতকে বাঙালিরা কলকাতায় বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ করেন। যেমন হিন্দু থিয়েটার (১৮৩১), ওরিয়েন্টাল থিয়েটার (১৮৫৩), জোড়াসাঁকো নাট্যশালা (১৮৫৪) বিদ্যোৎসাহিনী মঞ্চ (১৮৫৭) ইত্যাদি। ১৮৫৮ সালে কলকাতার পাইকপাড়ায় রাজ ভাতৃদ্বয় ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ প্রতাপচন্দ্র সিংহের উদ্যোগে তাদের বেলগাছিয়া ভিলায়, বেলগাছিয়া থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, গুরুদাস বসাক, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ এই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটারের সভ্যগণ সর্বশ্রেণীর দর্শকদের সুবিধার্থে ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা বছরেই ৭ই ডিসেম্বর দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি অভিনয়ের মাধ্যমে এই থিয়েটারটির উন্মোচন হয়। ১৮৭৩ সালের ১৬ই আগস্ট আশুতোষ দেবের দৌহিত্র শরৎচন্দ্র ঘোষ কর্তৃক কলকাতার নম্বর বিডন স্ট্রিটে বেঙ্গল থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৮৩ সালে কলকাতার ৬৮ নম্বর বিডন স্ট্রিটে গিরিশ ঘোষ, বিনোদিনী দাসী অমৃতলাল বসু প্রমুখ নাট্যব্যক্তিত্বের স্মৃতিধন্য ষ্টার থিয়েটার এর জন্ম হয়। ১৮৮৮ সালে হাতিবাগানে প্রতিষ্ঠা হয় ষ্টার থিয়েটার এর, যার সাথে পরে গিরিশ ঘোষ যুক্ত হন। ১৮৯৩ সালে কলকাতার নম্বর বিডন স্ট্রিটে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের জমিতে প্রতিষ্ঠা হয় মিনার্ভা থিয়েটারের। তখন থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত্য গিরিশচন্দ্র, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, ক্ষীরোদপ্রসাদ, অমৃতলাল, অমরেন্দ্রনাথ সহ অন্যান্য নাট্যকার বিরচিত প্রায় ৬০ খানা নাটক এখানে মঞ্চস্থ হয়েছিল। প্রঙ্গত উল্লেখ্য ষ্টার থিয়েটারের মঞ্চেই হীরালাল সেন প্রথম বায়োস্কোপের ক্যামেরায় ‘Flower of Persia’ নাটকের দৃশ্য চিত্রবদ্ধ করেছিলেন। সে অর্থে রঙ্গমঞ্চই কিন্তু প্রথম সিনেমার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে এলো টিভি, তারপর স্মার্টফোন, ওটিটি, সোশ্যাল মিডিয়া রিলস। মানুষের স্ক্রিনটাইম বাড়লো, ধৈর্য্য কমলো, হলগুলো ডুবে গেলো অমাবস্যার অন্ধকারে। ১৯৪২ সালে শিশিরকুমার নাট্যনিকেতন মঞ্চ লিজ নিয়ে তৈরী করেন শ্রীরঙ্গম। ১৯৬৬ সালে সেইখানেই জন্ম নিলো বিশ্বরূপা। তারাশঙ্করের আরোগ্য নিকেতন, শংকরের চৌরঙ্গী, সেতু একসময় বিশ্বরূপার এসব নাটক সারা ফেলেছিল অফিস ফেরত দর্শকের মনে। ১৯৩১ সালে কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে রবীন্দ্রনাথ রায় সতু সেনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় রংমহল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, কৃষ্ণচন্দ্র দে (সম্পর্কে গায়ক মান্না দের কাকা), মহেন্দ্র গুপ্ত, ধনঞ্জয় বৈরাগীর মতো মানুষের স্মৃতিধন্য সেই রংমহল, যেখানে মায়ামৃগ, সাহেব বিবি গোলাম, দুই পুরুষ, কবি, শতবর্ষ আগের মতো থিয়েটার মঞ্চস্থ হয়েছে, সেই রংমহল আজ শপিং মল! বিশ্বরূপার জায়গায় মাথা তুলেছে অভিজাত আবাসন! রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিট, একসময় রঙ্গমঞ্চের পীঠস্থান ছিল যে রাস্তাটি, সেখানে আজ শুধুই ছোপ ছোপ বিষন্নতা! কিন্তু ঠিক কি কারণ লুকিয়ে আছে, বর্তমান প্রজন্মের থিয়েটার বিমুখতার পেছনে! দর্শকের অভাব কেন! কেন এই চরম অর্থনৈতিক সংকট! খামতি বা ঔদাসীন্য ঠিক কোন পক্ষের! শাসক না বিরোধী! অভিনেতা না দর্শক! উত্তর হারিয়ে যায় উইংসের পেছনে ভিড় করা অন্ধকারে! সাঁজোয়া আলোর পেছনে মুখ লুকোনো শিল্পরুচিকে পুরোপুরিভাবে অপ্রয়োজনীয় বলে দাগিয়ে দেওয়া কিংবা অপসৃয়মান সুখস্মৃতির সম্পূর্ণ বিলোপ, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আলো আর আবহে বুঁদ হয়ে থাকা অগোছালো বাঙালি আসলে জানে না আসল থিয়েটারে থার্ডবেল বলে কিছু হয়না যেমন হয় না রিয়েল লাইফেও!


তথ্য সূত্র : অন্তর্জাল

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন