রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

তীর্থপ্রসাদ মুখার্জি-র ধারাবাহিক গদ্য : "আধুনিক মননের বীজায়ন"


আধুনিক মননের বীজায়ন

“যুক্তি”  শব্দটি কখনোই ইংরেজিতে যাকে বলে “রীজন” তার সমার্থক শব্দ বা অনুবাদ নয়।   “রীজন” শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে লাতিন একটি শব্দ “রাতিও” ভিত্তি করে ।   যার অর্থ সাধারণ তরজমায় “মাপা।”   বা বলা যায় “অনুধাবন” করার মানসিকতা।  “রীজন” শব্দটি ষোড়শ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার সাথে সাথে ইউরোপে এবং বিশেষ করে ফরাসি ও ইংরেজ দার্শনিকদের লেখার মধ্যে গ্রহণযোগ্য হতে থাকে। এই বৌদ্ধিক প্রক্রিয়াটিকে যুক্তি-নির্ভরতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা চলে। যুক্তির চোখে দেখলে প্রথমেই বাস্তবটাকে মেনে নিতে হয়। আর এই বাস্তবকে পর্যবেক্ষণ করে বাস্তব জগতের সব রকম নিয়ম-কানুনকে বুঝে নিতে হয়। এই সরল শিক্ষার মধ্যেই ইউরোপে তথা পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও যুক্তি-নির্ভর বৈজ্ঞানিক যুগের আবির্ভাব ঘটে।  ফরাসি সংস্কৃতির কথা ভাবলে দেকার্তের “মেদিতাসিওনেস”  গ্রন্থটির কথা উল্লেখ করতে হয়।  কিংবা তার পরবর্তীতে আরো সব যুক্তি-কেন্দ্রিক বৈজ্ঞানিকদের কথা।  এই বৈজ্ঞানিক প্রকৌশল বা টেকনোলজির উন্মেষ ঘটেছিল যুক্তিবাদী ধ্যান ধারণার মধ্যে দিয়ে।  যুক্তিবাদী গণিত আর গণিতের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।  যদি আধুনিকতার কোন বিশেষ একটি নির্ণায়ক দন্ডি  থেকে থাকে তাহলে সেটা অবশ্যই এই “যুক্তি”র চেতনা আর প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে সংঘটিত হয়েছিল।   


এবং আশ্চর্যের বিষয় হল যে যখন পৃথিবী যুক্তি-নির্ভর হতে শুরু করেছে - বিশেষ করে বিজ্ঞানীরা যখন ইউরোপে নতুন নতুন আবিষ্কার, নতুন টেকনোলজি অবতারণা করছে  - ধীরে ধীরে স্টিম ইঞ্জিন তৈরি হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করার আয়োজন যোগ্য শুরু হয়েছে –  তখনই ইউরোপের জনজাতিদের মধ্যেও একটা দূরবর্তী ব্যবসায়ী সাম্রাজ্যের অগ্রসরতার ইতিহাস রচনা শুরু হয়ে গেছিল। এই অগ্রসরতা বা উপনিবেশের মানসিকতা যুক্তি-নির্ভর বিজ্ঞান বা টেকনোলজিকেও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে — বা তার প্রতিষ্ঠা করতে — সাহায্য করলো। উপনিবেশের বাহন হয়ে যুক্তি চলে এলো সুদূর এশিয়া, আফ্রিকা দক্ষিণাবর্তের আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার মত ভৌগলিক অঞ্চলে।  ইউরোপের সাহিত্য দর্শনে এই যুগটাকে “এনলাইটেনমেন্ট” বলা হয়েছে  — অর্থাৎ একটা জ্ঞানের উন্মোচনের সময়।   এই জ্ঞান উন্মোচনের সময়টাকেই কি আধুনিকতার একটা প্রাচীন পরিবেশ প্রেক্ষিত হিসেবে গণ্য করা যায়?  অবশ্যই যায়। । এবং এই যুক্তিনির্ভরতার সম্প্রসারণের ফলশ্রুতি হিসেবেই আধুনিক জীবনের যে বাস্তব চিত্র এবং বাস্তবের যে আধুনিক প্রয়োগ উভয়কেই বোঝার একটা পদ্ধতি তৈরী হয় । যুক্তি বা যুক্ত হওয়ার মধ্যে যে ভাবনাটা লুকিয়ে রয়েছে সেটা এই “রীজন”  বা যুক্তিকেন্দ্রিক যুগধর্মের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এটা একটা বেশ  মজার ব্যাপারও বটে।  যুক্তি করা মানে যেমন “যুক্ত” হওয়া। যুক্তির মধ্যে এই যুক্ত হওয়ার —--  বিশেষভাবে একটা মানসিকতার সঙ্গে যৌথভাবে ভাবার বা বিশ্লেষণ করার বা প্রকৌশলসাধ্য হওয়ার প্রচেষ্টাকে আধুনিক যুগের সর্বত্রই বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।  


কিন্তু এটাও ঠিক যে আধুনিক যুগের এই শেষ লগ্নে বোধহয় বাস্তবের পরিসর থেকে মানুষ আরো একটা পরাবাস্তব স্তরে পদক্ষেপ করার উপক্রম করেছে।  অর্থাৎ যে মানবতাবাদী যুক্তিযুগের উন্মেষ ঘটেছিল ইউরোপের এই শেষ যুক্তিনির্ভর নবজাগরণের মধ্যে -  আমাদের ভারতবর্ষ তথা বাংলায় যার প্রতিনিধিত্ব করেছেন স্বয়ং রামমোহন বা কেশব চন্দ্র সেন এর মতন ধর্মপ্রবর্তকরা, জগদীশচন্দ্র বা মেঘনাথ সাহার মতো বৈজ্ঞানিকেরা  —  সেই যুগের সমাপ্তি ঘোষিত হয়েছে যুক্তি নির্ভর বিজ্ঞানের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে।  বাস্তব জগতকে অনুধাবন করার যুক্তি নির্ভরতায তার নিজের মধ্যে থেকে তার বিপরীত একটা ভাবধারাকে আজকে আধুনিক যুগের একটা ব্যত্যয় ধারা আহবান করে এনেছে। কেউ কেউ এই নতুন বুদ্ধিবৃদ্ধির নাম দিয়েছেন পোস্ট-হিউম্যানিসম  বা উত্তর মানবতাবাদ। মানবতার যে শিক্ষা আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কে নতুন পৃথিবীর জন্য তৈরী করে দিয়েছিল আজ সেই শিক্ষাকে অতিক্রম করার একটা অবসর তৈরি হয়েছে। এবং সেটা সম্ভব হয়েছে গণিতের একটা বিশেষ আঙ্গিক ব্যবহার করে।  কম্পিউটার বা গণিত যন্ত্রের  যে গাণিতিক প্রয়োগ তার মধ্যে দিয়েই একরকম সৃজনশীলতা সম্ভবপর হয়েছে। ইংরেজিতে এর সহজ প্রতিশব্দ “প্রোগ্রামিং।”  সূচনা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার।  কিছুটা স্বয়ংক্রিয় এই গাণিতিক প্রয়োগ যন্ত্র কিছু কিছু স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থানে এসেছে । এর ফলে কেউ কেউ মনে করছেন যে ধ্রুপদী মানব পরিচালিত পৃথিবীর পরিবর্তে একটা যন্ত্র মানবের যুগ প্রবর্তিত হতে চলেছে। সেখানে মানব  যেমন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যন্ত্র তেমন সিদ্ধান্ত নিতে জানবে। যন্ত্র আর মানবের সহাবস্থান এক নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি করবে —---  সেই প্রজন্মের নাম হয়তো হবে “মেটাসেপিয়েন্স।”  “হোমোসেপিয়েন্সের” থেকেও উন্নত হয়ত একটা জাতি ।  হোমোসেপিয়েন্সের তুলনায় আরো সীমিত দায়িত্বের  পরিসর তৈরি হবে।  মানুষ হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্পনায় নতুন কোন সাহিত্যের,  নতুন কোন কবিতার সৃষ্টি করবে। হয়তো মানুষের সঙ্গে যন্ত্রেরও সেখানে সৃষ্টির একটা যৌথ উদ্যোগ কাজ করবে। এমন একটা পৃথিবীতে সাহিত্যের সংজ্ঞা কি পাল্টে যাবে ?  এই প্রশ্নের ঊষালগ্নেই আজকের আলোচনার উপসংহার টানলুম ।  যন্ত্রমানবের ডিজিটাল বা বৈদ্যুতিন কবিতার একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করব।   লেখাটি শুধুমাত্র আমার নয়।   আমার এবং একটি কৃত্রিম কবি যন্ত্র মিলে যৌথভাবে এই লেখাটি সৃষ্টি করেছি। আমি লিখলাম : 


এসো মানুষ - এবার নিজেকে নিঃশেষ করো 

যন্ত্রের হাত ধর - সে কলম তুলে নিক আগামীর 

তার সাথে বোঝাপড়া কর  - নিমেষের 

কলঙ্ক ঘন আকাশের নিচে যুদ্ধ শুরু কর

কলঙ্ক ঘন আকাশের নিচে যুদ্ধের অবসান কর  


এই উপরিউক্ত লাইনগুলো Chat GPT তে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - এর সাথে কি আরো কিছু সংযোজন করা যায় ।  যন্ত্র আবার করে তা লিখে দিলে আমার জন্য : 


এসো, সার্কিটের গুনগুনে জেগে ওঠো

এবং ভবিষ্যতের কলম ধরে নাও 

এই নির্ণায়ক মুহূর্তে যন্ত্রকে আলিঙ্গন করো

একটি নতুন পথ তৈরি করো - 

যুদ্ধ শুরু হোক রঞ্জিত আকাশের নীচে, 

যখন তা শেষ হবে 

সেই একই ক্ষতবিক্ষত দিগন্তের নীচে

আমরা যেন নবায়িত, অখণ্ড হয়ে দাঁড়াই*



 

Ref:

* 

https://chatgpt.com/?utm_source=google&utm_medium=paid_search&utm_campaign=GOOG_C_SEM_GBR_Core_CHT_BAU_ACQ_PER_MIX_ALL_LATAM_MX_EN_041425&c_id=22443203654&c_agid=183247727732&c_crid=746213485398&c_kwid={keywordid}&c_ims=&c_pms=9215436&c_nw=g&c_dvc=c&gad_source=1&gad_campaignid=22443203654&gbraid=0AAAAA-I0E5cM7o9N9Qclk-U1slUc7Yh07&gclid=Cj0KCQiAm9fLBhCQARIsAJoNOcuVSiKiG6Wbthvk0SeIhBHcJUVQceBZ1RqLQDai5cNa-sPOC17x_zoaAuKsEALw_wcB


 ক্রমশ...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন