রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

সৌমিত্র চক্রবর্তী-র ধারাবাহিক গদ্য : "চলনবিল"


চলনবিল 

তেরে মেরে মিলন কে ইয়ে নয়না... নয়া কোই ফুল খিলায়েগি…” নতুন ফুল আসে পুরোনো সব সুগন্ধ ঝরিয়ে। 


প্রথমে সবাই হাত ছোঁড়ে ওপরের দিকে। যাহোক খড়কুটো, জলের বহমান স্রোতের স্পর্ধা, নিদেন অলীক হাওয়ার খোঁজেই। গলা বসে গেলে বহুদিনের জমা কফ জড়ো হয় আর্ত সিগন্যালে। তারপর ড্রপসিন। তারপর … চেঙ্গিসের তলোয়ারের ঝিলিক মারা ফলায় বিক্ষত হয়ে কবে যেন পড়েছিল নিরেট লাশ। বহু নদী শুকিয়ে বালিখাত, বহু নদী বিষাক্ত কোবরার বাসা।


একখানা সবেধন নীলমণি চশমা চাপে চাপে চৌচির কাচকণা। পকেটের যা কিছু রসদ আলাদিনের জিনের সাথেই কবেই ছিনতাই হয়ে গেছে। মাথার খুলি থেকে গোড়ালির হাড় চাপে চাপে কাগজ হতে হতে ছিঁড়েখুড়ে ভেঙেচুরে ফর্দাফাই। অস্তগামী সূর্যরঙ জলীয় দ্রবণ ছড়িয়ে প্যাচপ্যাচে কাদা হয়েছিল পুর্বানুরাগে, এখন তাও ফসিল। রাস্তার ডান বাম মাঝ সব জুড়ে কেবলই শবের লংমার্চ সেই বার্বেরিয়ান এরা থেকেই। পায়ের চাপে কেবলই কিমা হয়ে গেছি, মানুষ হওয়া হয়ে ওঠেনি এখনো।


সকলের যখন ঘুম থেকে ওঠার সময় হয় কুয়াশা তখনই ঘুমোতে যায়। মানুষের তৈরী বাঁধ ভেঙে ফেলে দুচোখের পাতায় হুড্রুপ্রপাতের বেগে

ঝাঁপিয়ে পড়ে দুষ্টু ঘুম; সকালের কিশোরী রোদ্দুর জানলায় এসে থমকে দাঁড়ায়, 'আহা, ওকে শান্তির দেশে থাকতে দাও!' সাত সকালের কুয়াশা কেটে ছুটে যায় দূর প্রান্তিক সব্জীবাহী ট্রাক। ড্রাইভারের পাশে খুপরি জানলায় উঁকি দেয় ঈশ্বরের নীল কিশোর মুখ। বাজারের ধূপগন্ধের হাওয়া ঝাপটা দেয় নিত্য থলি হাতে ভাঙাচোরা অবয়বজুড়ে

কাটা পোনার তত্ব আউড়ে, স্তনের মাঝের উপত্যকায় ওজন কারচুপির ছক কষে বাওড়া মাছওয়ালি। বাসের চাকা ঘোরে, অটোরিক্সা  শস্তার গাঁদায় মেকআপ কমপ্লিট করে নিজেকেই ঘুরে ফিরে দেখে পাঁচ ইঞ্চির আয়নায়। সকলেই ব্যস্ত খুব। ঝনঝন শব্দে খোলা বন্ধ হয় গোসাপের চামড়ায় বেআইনি পার্সের আব্রু। সবাই যখন ব্যস্ত রীতিমতো কুয়াশা তখনই ঘুমায় নিশ্চিন্ত আবেশে।  জঞ্জাল বাড়তে থাকে জানলার বাইরে।


কেমন আছি এই অবসরপ্রাপ্ত দুপুরে?

হ্যাঁ ভালোই তো আছি

অন্ততঃ ভালো থাকা উচিৎ মনে হয়। কখনো এসক্যালেটরের খাঁজে অবচেতন আমিকে  খুঁজে পাই। অবাক হয়ে দেখি তারও আমার মতোই মূর্খতা রয়েছে অবিদ্যায়। সামনের অলীক মঞ্চনাটক। দুচার কিস্তির খেজুরে সংলাপআগড়ম বাগড়ম হাসির প্রলাপ

আর আমি?

হ্যাঁ তাল মেলাই - তেরে কেটে তাক তাক


কোথায় যেন গম্ভীর সুরে একটানা একটা ঘন্টা বেজেই চলে, ঢং ঢং ঢং... বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যে নামে, সন্ধ্যার আয়ু শেষে জড়ায় পরম আদরে রাত্রি। ঘন্টার শব্দের কম্পনাঙ্ক দিনের আলোয় চাপা পড়ে যায় ক্ষণভরি স্মৃতির মানুষের হৈ হট্টগোলে। কিন্তু রাত্রি বাড়লেই দ্বিপদের তৈরী নকল আওয়াজ কমতে থাকে। আর রাস্তা, ঘাট, এই চরাচর, মহানগরের প্রান্তিক ফুটপাত, গ্রামীণ বাঁশের খুঁটির সাথে জোড় বাঁধা কুঁড়েঘর, আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া কুয়াশায় মোড়া মাঠকুয়ো, কনফেশনে মগ্ন চার্চ, শীৎকার ভাসিয়ে খদ্দেরের মনোরঞ্জনে শস্তার মেকআপ নেওয়া বেশ্যালয়, একান্ত পীড়িত স্যালাইন চলতে থাকা হাসপাতালের ছমছমে করিডোর পেরিয়ে ছড়িয়ে যায়, দিগন্ত আবৃত করে সেই ভুবনডাঙ্গার ঘন্টা - ঢং ঢং ঢং... শব্দাঙ্কের গভীরতা ছিন্নভিন্ন করে স্বল্পদৈর্ঘ্যের হৃদবাস। হৈমন্তিক রাত্রির উটচরা মরুভূমির বালির পায়ের দাগে দাগ বুলিয়ে নেমে আসে হিম। শহুরে ছোটখাটো মানুষ, গ্রামীণ ছোটখাটো মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে আখড়ার বেতলতা ঘেরা সীমান্ত ছাড়িয়ে চারপাশে খেলে বেড়ায় বাউলের মরমিয়া গলা, 'কয় জনম পার হলি মন, মানুষ হলি কই...!' আশ্চর্য সেই চাঁদক্ষরণে আপনমনে সঙ্গত করে অলৌকিক ঢং ঢং ঢং...


ছেলেবেলায় রুশদেশের উপকথা হাতে দিয়ে বাবা বলেছিলেন, ভাগ করে পড়তে হয়। গ্রামের বাড়িতে আমার সদাহাসিমুখ কাকিমা, হাতে মিষ্টি দিয়ে বলতেন, ভাগ করে খেও সোনাআর তখন থেকেই ভাগ শব্দটা আমার মজ্জায় সাঁতারু হয়ে ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়া শুরু করেছিল। আমার শ্রদ্ধেয় বয়স্করা ভাগ শব্দে রেখেছিলেন  অসীম প্রীতি। দেশ কে মা বলেই চিরে ফেলেছিলেন তাঁরা ভাদুরে কুত্তার বিহ্বলতায়। সেই শুভ রাত্রি বারোটায় বাজির ঝলকানিতে উন্মাদিনী হয়ে ভাগের মা ডুবেছিলেন পঞ্চনদে-পদ্মায়।


প্রতিরাত আমাকে চোখ রাঙায় হিসেবের গরমিলে সুখপালকের ওম ভাগ করে নিতে পারিনি বলে। প্রতিদিন মাথা নিচু করে নীতি ভাগ হয় স্যুট টাই পরা অর্থজীবি লেজার খাতায়। প্রত্যেক গণতান্ত্রিক বিহ্বলতায় ভোটবাক্স ভাগ হয়ে যায় ক্ষমতাশালীর পেটো, মাস্কেট আর পেশীর অনুপ্রেরণায়। আনন্দ ভাগ করে লাফিয়ে উঠেই দুদল একশো ডেসিবেল হিংস্রতায় চিৎকার করে যায় -মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল। মান্নার গানও লজ্জায় খোঁজে দুই বারের মধ্যবর্তী শান্ত কবর।



ক্রমশ...
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন