বাংলা ছবিতে ডিপ্রেশনের ওপারেই ছিল ঋতুপর্ণর রামধনু ক্যানভাস
বৃষ্টির পরেই আকাশে রামধনু আসে। আলো-জলে মিলে তৈরি হয় সাত রং। আমরাও মুগ্ধ হই। তবে সাত রঙের আড়ালে বৃষ্টির হাজারও মনখারাপ থাকে। কারও অনুপস্থিতি রামধনুর আগে সেই এক পশলা বৃষ্টির কথাই মনে করায়। বিগত কয়েক বছরে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যেমন তাঁর অনুপস্থিতি প্রতি পদে পদে অনুভব করেছে। ৩০মে তাঁর মৃত্যু দিনে আরও একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলচ্চিত্র জগৎ বলেছে, হুম ঋতু থাকলে আজ অন্যরকম হত! ঋতুহীন বাংলায় কি শুধুই ডিপ্রেশন বা নিম্নচাপ? বৃষ্টির পরেও যে রামধনুর রং অনুভব করতেই হবে। কারণ, বাংলা ছবিতে তুলি হাতে নিজেই সাত রং এঁকেছেন তিনি। আমরা শুধুই চরিত্রের গল্প দেখিনি, আমরা কখনও কখনও ব্যক্তিজীবনের ঋতুপর্ণকেও অনুভব করেছি।যে বাঙালি মেয়েলি পুরুষ দেখেই নাক সিঁটকোয়, তাঁদেরও বড় পর্দায় সমলিঙ্গের ভালোবাসার গল্প উপহার দিয়েছেন ঋতুপর্ণ। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে গর্ববোধ করেছেন, অন্যদেরও গর্ববোধ করতে শিখিয়েছেন! তাঁর চিত্রনাট্যেও সেই গর্ব, সেই ভালোবাসা। কখনও ক্যামেরার পিছনে কিংবা কখনও ক্যামেরার সামনে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। আজ প্রাইড মান্থে ঋতুপর্ণর ছবি নিয়েই যদি আলোচনা না হয়, তাহলে আর কার ছবি নিয়ে আলোচনা করব?
শুধুই তো বাংলা নয়, বাংলার সীমানা পেরিয়ে মুম্বইয়েও একইভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর ছবিতে কাজ করেছেন বড় বড় তারকারা। একাধিক জাতীয় পুরস্কার জমেছে তাঁর গর্বের ঝুলিতে আজ এই বর্ষার ঋতুতে ঋতুর রামধনু নিয়েই একটু আলোচনা করি…
ছবির পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সংবাদমাধ্যমের সামনে কথা বলেছেন কৌশিক। একবার তিনি বলেছিলেন, এই ছবিটি ঋতুপর্ণর প্রতি তাঁর গুরুদক্ষিণা। আরও একটি সাক্ষাৎকারে কৌশিক বলেন, একদিন মেকআপ রুমে ঋতুপর্ণ বসে কাঁদছিলেন। তার অন্যতম কারণ এই ছবিতে তাঁর সাজ ও মেকআপ। সেই সাজ সাজতে পেরেই খুব খুশি ছিলেন তিনি । কারণ ওইভাবে সাজা তাঁর কাছে স্বপ্ন ছিল।
সাধারণভাবে গল্পটি একজন গে ফিল্মমেকারকে নিয়ে। যিনি বাংলারই একজন পুরনো মঞ্চ অভিনেতা চপল ভাদুড়ী (চপল রানি)-কে নিয়ে ছবি করছেন। সেই ছবিতে ওই অভিনেতার ভূমিকায় নিজেই অভিনয় করছেন পরিচালক ঋতুপর্ণ। সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। ভালোবাসছেন। শাড়ি, গয়না পরে চুল বেঁধে বড় পর্দায় ধরা দিচ্ছেন ঋতুপর্ণ। যাঁরা ঋতুপর্ণের অনুরাগী, তাঁরা মাঝেমধ্যেই ভেবেছি, আমরা কি ব্যক্তিজীবনে ঋতুপর্ণর যন্ত্রণা দেখছি? যিনি মনে করছেন, রাধা বিরহ বোঝার জন্য কৃষ্ণকে রাধা হয়ে জন্ম নিতে হবে! আবহে বাজছে, “বনমালি তুমি পরজনমে হয়ো রাধা”। আলোচনা হচ্ছে চৈতন্য জন্ম নিয়ে… সেসব কথা থাক । কিন্তু এখনও মনে হয়, সত্যিই যদি ঋতুর যন্ত্রণা বুঝতে পারতাম।
মেমোরিস ইন মার্চ
সঞ্জয় নাগ পরিচালিত এই ছবিটি মুক্তি পায় সেই বছরই। এই ছবিতেও বড় পর্দায় অভিনয় করেন ঋতুপর্ণ। একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতেন। সেখানেই তাঁর সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। ছবির শুরুতেই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় অর্ণবের(অভিনয়ে ঋতুপর্ণ) প্রেমিকের। চিত্রনাট্যে তাঁর প্রেমিকের প্রকাশ নেই, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি রয়েছে। ছবির প্রধান চরিত্র সেই অনুপস্থিতি। তাঁর আবাসনের প্রতিটা ঘরে অনুপস্থিতিই যেন ছবির প্রধান চরিত্র হয়ে উঠেছে। ছেলের মৃত্যুর পর শহরে আসেন তাঁর মা আরতি(অভিনয়ে দীপ্তি নাভাল)।
ছেলের প্রেমের কথা জানার পর আঘাত পান। কিন্তু পরবর্তীতে অর্ণবের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক খুব ভালো হয়। দুজনের স্মৃতি ও মনখারাপ নিয়েই ছবিটি তৈরি। সরাসরি কোনও সম্পর্ককে দৃশ্যায়িত না করেও একটি ভালোবাসার সম্পর্কের গল্প বলে মেমোরিস ইন মার্চ। হেটেরোনর্ম্যাটিভ সম্পর্কের বাঁধাধরা সীমা পেরিয়ে একটি সমকামী প্রেমের স্মৃতি উপহার দেয় দর্শককে। অর্ণবের চরিত্রে ঋতুপর্ণ মনখারাপের রামধনু তৈরি করেন।
চিত্রাঙ্গদা
এই ছবিটি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, বিতর্কও। না ছবির মান নয়, ছবির ন্যারেটিভ নিয়ে বিতর্ক ছিল। ঋতুপর্ণ নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেই বড়পর্দায় এভাবে মেলে ধরবেন, সেই কথা মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। অনেকেই বলেছিলেন, ছবি ব্যক্তিগত হয়ে গিয়েছে। তবে যাঁরা ঋতু অনুরাগী, তাঁরা যন্ত্রণা বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ঋতুপর্ণর পরিচালনা ও চিত্রনাট্যে চিত্রাঙ্গদার আধুনিক অ্যাডপটেশন দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সবাই। সত্যিই কুরূপা ও সুরূপার চরিত্রের এরকম উপস্থাপনা আগে দেখেনি বাংলা চলচ্চিত্র।
শরীর পরিবর্তনের সামান্য ইচ্ছে মাত্র। তাই ছবির নামও সেরকম। মঞ্চে যখন কুরূপা সুরূপা হয়ে উঠছেন, ঋতুপর্ণও হাসপাতালে শরীর পরিবর্তনের এক এক ধাপ পেরিয়ে যাচ্ছেন। কী অসাধারণ ভাবে মিলিয়ে দিয়েছিলেন দুই কাহিনী, দুই সময় ও দুই আত্মাকে। এদিকে ব্যক্তিজীবনেও সেই সময়ে সার্জারি চলছে তাঁর। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিয়ম। ২০১৩-এর ৩০ মে ভেঙে পড়ে ‘তাসের ঘর’, চিরনিদ্রায় চলে যান ঋতুপর্ণ।
ঋতুপর্ণর মা ও বাবার মৃত্যুর পর একাকিত্ব তাঁর লেখার ছত্রে ছত্রে উঠে আসে। তাঁর হাসপাতালের যে অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেছেন, সেই ছবিই যেন দেখতে পাই চিত্রাঙ্গদার দৃশ্যে। কী অদ্ভুত মিল! ব্যক্তিগত যন্ত্রণা নয়? তবু ডিপ্রেশনের পরবর্তী রামধনু তিনি, আমাদের সবার ঋতুপর্ণ। এই প্রাইড মান্থ-এ একজন সিনেমা অনুরাগী হিসেবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা…
এখন এখানে একটা কূট প্রশ্নের অবতারণা করা যেতে পারে,একজন পরিচালককে কি তাঁর নিজের ছবিতে অভিনয় করতেই হবে?এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়।কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর একাধারে সহজ আবার অন্যদিকে খুবই জটিল।এখানে ব্যাক্তি ঋতুপর্নের আশা,আকাঙ্ক্ষা,যৌনতা,যৌনতা সম্বন্ধে তাঁর ধারণা একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।এখন সাধারণ ভাবে আমরা দেখি অনেকে পরিচালককেই তাঁর নিজের ছবিতে দেখা গেছে।আর এটা তাঁদের সিগনেচার স্টাইল হিসাবেই ধরা হয়।যেমন আলফ্রেড হিচকক,অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় বা অজয় কর।এঁরা তাদের ছবিতে কোন না কোন জায়গায় থাকতেন।অবশ্যই খুব ছোট রোলে।যেমন সপ্তপদী ছবিতে রিনা ব্রাউন যখন গাড়িতে করে কৃষ্ণেন্দুর কাছে যাচ্ছেন তখন সেই গাড়ির ড্রাইভার যিনি,তিনি অজয় কর।
সখী হাম মোহন অভিসারে জাউ
বলে হাম এতক সুখ কাহ্যাঁ পাউ
এই বিখ্যাত গানের রচয়িতা তিনি।জীবনযুদ্ধে চড়াই উৎরাইয়ের সুখকর জীবন হয়তো এই মানুষটির ছিল না।বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়েও উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলছিলেন সবার মাঝে।তাঁর সৃষ্টি করা "সম্পদ সমূহ"এই বাধাগুলি দ্বিখণ্ডিত করে সুখের হাতছানি দিয়েছিল তাঁর জীবনে।তাঁর সৃষ্টিগুলি নিজের মতো আমার,আপনাদের সুখায়িত করেছে।তিনি আর কেউ নন,তিনি আমাদের সবার প্রিয় ঋতুপর্ণ ঘোষ।ঋতুপর্ণ ঘোষের জন্ম ১৯৬০ সালের ৩১ শে আগস্ট,কলকাতায়।বাবা-মা উভয়েই চলচ্চিত্র জগতের সাথে যুক্ত ছিলেন।বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন তথ্যচিত্র-নির্মাতা ও চিত্রকর।ভারতের LGBT সম্প্রদায়ের এক বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব ঋতুপর্ণ ঘোষজীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি রূপান্তরকামী জীবনযাত্রা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন।নিজের সমকামী সত্বাটিকে তিনি জনসম্মুখে খোলাখুলি ভাবে স্বীকার করতেন,যা ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে খুব কম মানুষই করেছেন।এর জন্য যে দুর্মর সাহস লাগে তা ঋতুপর্ণ ঘোষের যে অনেকটা বেশি পরিমানে ছিল এ কথা আজ স্পষ্ট।শিল্পীকে আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন এর জন্য।
তিনি শুধু পরিচালকই ছিলেন না।তিনি অভিনেতা হিসাবেও জনপ্রিয় ছিলেন।প্রথম অভিনয় করেন ওড়িয়া ছবি "কথা দেইথিলি মা-কু"তেহিমাংশু পারিজা পরিচালিত এই ছবিটি মুক্তি পায় ২০০৩ সালে।২০০৯ সালে তিনি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের "আরেকটি প্রেমের গল্প"এবং সঞ্জয় নাগের "মেমরিজ ইন মার্চ"ছবিতে অভিনয় করেন।"আরেকটি প্রেমের গল্প"ছবির বিষয় ছিল সমকামিতা।এছাড়া তিনি তাঁর শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি "চিত্রাঙ্গদা" ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন।
সালটা ১৯৯৪।আমি তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিদ্যাবিভাগের ছাত্র।ওই বছর নন্দন চত্বরে কোন এক বইমেলায় ঋতুপর্ণ ঘোষ কে প্রথম দেখি।এখনো মনে পড়ে নীল জিন্স ও গোল গলা নীল টি শার্ট-এ।চশমার আড়ালে উজ্জ্বল দুটি চোখ।ওই বছরই মুক্তি পেয়েছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের দ্বিতীয় ছবি “ঊনিশে এপ্রিল”বেশ মনে পড়ে হস্টেল থেকে বেশ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে “বসুশ্রী”সিনেমাহলে এই ছবি দেখেছিলাম।দেখেই বুঝেছিলাম এক নতুন ধারার চলচ্চিত্রকার বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশকে আলোয় আলোকিত করবে আরো বহুবছর।যদিও ১৯৯২ সালে নির্মিত তাঁর প্রথম ছবি “হিরের আংটি’তখনো আমার দেখা হয়নি।পরে দেখেছি।কিন্তু এরপর আমাদেরই চোখের সামনে ঋতুপর্ণ একের পর এক ছবি করে গেলেন।নিয়ম করে তাঁর প্রত্যেকটা ছবিই গভীর মনোযোগের সাথে দেখেছি।আর দেখেছি বলেই অনুভব করতে পেরেছি ব্যাক্তি ঋতুপর্ণ যেমন আমার প্রথম দেখা ঋতুপর্নের চেয়ে বহিরঙ্গে যেমন তার বিস্তর বদল ঘটেছে,মনোজগতেও তেমন বদল টা অনেকটাই হয়েছে।এটা আরও বুঝতে পারি তাঁর ছবিগুলি পরপর দেখে।তিনি নিজেই নিজেকে ভাঙছেন,আবার নতুন করে গড়ে তুলছেন।তাঁর বেড়ে ওঠা,তাঁর শিক্ষাদীক্ষা অন্য বৃহন্নলাদের থেকে অনেকটাই আলাদা,তাই তার প্ৰকাশও আলাদা ও স্বতন্ত্র।কিন্তু তিনি যখন দেহে,মনে ক্রমশ নারিত্বে উন্নীত করছেন নিজেকে তখন তাঁর ছবিগুলোও খুব সচেতনভাবেই তাঁর নিজস্ব এজেন্ডা বা বক্তব্যকে তুলে ধরার একটা মাধ্যম হিসাবে ব্যাবহার করেছেন।এ এমন বিপদজনক খেলা,খেলা না বলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও বলা যেতে পারে যা কিন্তু একজন চলচ্চিত্রকারের পক্ষে খুব সহজ কাজ নয়।মনে পড়ে যাচ্ছে বিখ্যাত রাশিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক অন্দ্রেই তারকভস্কির সেই অমোঘ শিল্প দর্শন।একজন শিল্পীকে নিজের বিরুদ্ধে হলেও সত্যিকথা বলে যেতে হবে।আমরা বলি না জীবন নিংড়ানো শিল্প আমরা আজ আর তেমন ভাবে দেখতে পায়না।কিন্তু ভেবে দেখুনতো ঋতুপর্নের জীবনটাই শিল্পের উপাদান হয়ে উঠেছে।ইচ্ছে করলেই তিনি সব লুকিয়ে রাখতে পারতেন।বিশ্বচলচ্চিত্রে এরকম অনেক পরিচালক আছেন যাঁরা তাঁদের জীবনের এই ধরনের সত্য প্রকাশ্যে আনেননি,কখনো লোকলজ্জার ভয়ে,কখনো খ্যাতির চূড়া থেকে পতনের আশঙ্কায়।কিন্তু ঋতুপর্ণ সেই বিপদজনক কাজটি অত্যন্ত অবলীলায় করে গেলেন সমকাল বা ইতিহাস তাঁর কি মূল্যায়ন করবে এই সব কিছুর তোয়াক্কা না করেই।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন