রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

গোলাম রাশিদ-এর প্রবন্ধ


বিভূতিভূষণের অরণ্যে...


আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ও ভোগবাদী সমাজে যখন মানুষ ভোগের মধ্যে মুক্তি খুঁজে ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে, তখনও বিভূতিভূষণের সৃষ্টিকর্ম তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেনি। প্রকৃতির নিরাবরণ মুক্ত রূপের স্পর্শ, ঝরা পাতার সোঁদা গন্ধ, চৈত্র দুপুরের অলস নিমফুলের সুবাস, বা জ্যোৎস্নাস্নাত মাঠের অপার্থিব দৃশ্যে মানুষের সুপ্ত ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ হয়ে ওঠে।

বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় ঔপন্যাসিক, গল্পকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪--১ নভেম্বর ১৯৫০) আগমন একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তাঁর লেখায় প্রকৃতি কেবল বর্ণনার পটভূমি হয়ে থাকেনি, বরং নিজেই এক জীবন্ত ও স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাঁর লেখায় প্রকৃতি ও মানবজীবন এমন নিবিড়ভাবে একাত্ম, যা সমসাময়িক অন্য কোনও লেখকের মধ্যে এতটা গভীর ও বিস্তৃত পরিসরে পরিলক্ষিত হয় না। প্রকৃতিকে এই অনন্য মাত্রায় তুলে ধরার কারণেই সমালোচকেরা তাঁকে যথার্থই ‘প্রকৃতির বরপুত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই উপাধি কেবল তার নিখুঁত ও সূক্ষ্ম বর্ণনার জন্য নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নিজস্ব আত্মিক ও দার্শনিক সংবেদনশীলতার গভীর যোগসূত্রের কারণেও সার্থক।

বিভূতিভূষণের সাহিত্য কোনও কল্পিত বা অলীক জগতের প্রতিচ্ছবি নয়। এটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নিবিড় সান্নিধ্য থেকে ছেনে আনা এক জীবন্ত ও শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিচ্ছবি। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি তাঁর প্রিয় বারাকপুরের খড়ের ছাউনির বাড়িতে কাটিয়েছেন, যা জীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি পাকা করেননি কেবল প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার জন্যই। এই ব্যক্তিগত জীবনবোধই তাঁর সৃষ্টিকর্মকে অনন্যতা দিয়েছে এবং পাঠকের কাছে চিরন্তন করে তুলেছে। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির রূপ ও রস তিনি আহরণ করেছেন প্রকৃতি থেকে এবং প্রকৃতির কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের জীবন থেকে। এক অর্থে, তিনি প্রকৃতিকে কেবল একজন মুগ্ধ দর্শক হিসেবে দেখেননি, বরং প্রকৃতির গভীরে প্রবেশ করে তার সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। এই আত্মিক সম্পর্কই তাঁর সাহিত্যকে এক নতুন দার্শনিক উচ্চতায় উন্নীত করেছে।

তিনি তাঁর দিনলিপি তৃণাঙ্কুর-এ প্রকৃতির নিরাময়কারী শক্তির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃতি মানুষের মৃত ও মূর্ছিত চেতনাকে জাগ্রত করার এক মহৌষধ বা ‘বিশল্যকরণী’। আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর ও ভোগবাদী সমাজে যখন মানুষ পণ্য-ভোগের মধ্যে মুক্তি খুঁজে ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে, তখন বিভূতিভূষণের এই ভাবনা তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেনি। প্রকৃতির নিরাবরণ মুক্ত রূপের স্পর্শ, ঝরা পাতার সোঁদা গন্ধ, চৈত্র দুপুরের অলস নিমফুলের সুবাস, বা জ্যোৎস্নাস্নাত মাঠের অপার্থিব দৃশ্যে মানুষের সুপ্ত ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ হয় এবং জীবনের সারসত্য উপলব্ধিতে সাহায্য করে। এটি তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক যে, তিনি প্রকৃতিকে শুধু সৌন্দর্যের উৎস হিসেবে নয়, বরং মানবাত্মার নিরাময়ের প্রধান আশ্রয় হিসেবে দেখেছেন। তিনি অতি সাধারণ গাছপালা, কীটপতঙ্গ এবং লতাগুল্মের এমন সূক্ষ্ম বর্ণনা দিয়েছেন যে পাঠককে তা এক নতুন অভিজ্ঞতার জগতে নিয়ে যায়। তাঁর এই সৃষ্টি কোনও বুদ্ধির কৌশল বা কৃত্রিম সাহিত্যিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তাঁর ভেতরের সরল, সাত্ত্বিক ও নির্লোভ সত্তারই প্রতিফলন, যা তাঁর ব্যক্তিজীবনকে প্রভাবিত করেছে। তিনি তাঁর লেখাকে নীতিগর্ভ করতে চাননি, বরং তা অবচেতন থেকে উঠে আসা এক স্বতঃস্ফূর্ত চেতনাপ্রবাহ, যা জীবনের শাশ্বত সত্যের বার্তা বহন করে।


গ্রামবাংলার নিসর্গ প্রতিচ্ছবি

বিভূতিভূষণের ছোটগল্প ও উপন্যাসে গ্রামবাংলার প্রকৃতি এক জীবন্ত চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হয়েছে, যা শৈশবের সরলতা, লোকজীবনের গভীরতা এবং মানুষের দৈনন্দিন আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। পথের পাঁচালীতে অপু ও দুর্গার চোখে দেখা বৈঁচির ঝোপ, ভাঁট ফুল, তেলাকুচার বন এবং মেঠোপথ-এর বর্ণনা নিছকই কোনও স্থান-কালের পরিচয় বহন করে না। বরং তা এক নিরন্তর যাত্রার প্রতীক, এক রহস্যের ইঙ্গিত, যেখানে শৈশবের মুগ্ধতা ও সরলতা জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে সহাবস্থান করে। এমনকি এই উপন্যাসে রেলগাড়ির আগমনকে তিনি ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন, যা ধীরে ধীরে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রাকে গ্রাস করছে।

তাঁর ছোটগল্প পুঁইমাচাতে প্রকৃতির একটি সাধারণ উপাদান পুঁই গাছ এক অসাধারণ প্রতীকী চরিত্র হয়ে উঠেছে। গল্পে ক্ষেন্তি নামের এক দরিদ্র বালিকার জীবনের সঙ্গে এই গাছটির জীবন মিশে যায়। ক্ষেন্তি যখন যত্ন করে তার বাড়ির উঠোনের কোণায় একটি পুঁই গাছ লাগায়, তখন তা কেবল একটি গাছের চারা থাকে না---এটি তার সুপ্ত জীবনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। পুঁই গাছটি যখন ‘সুপুষ্ট, নধর, প্রবর্ধমান’ হয়ে মাচা ছাপিয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা ক্ষেন্তির জীবন ও যৌবন বিকাশের পূর্ণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু তার অকালমৃত্যুর পর, সেই নধর পুঁই গাছটিই তার অচরিতার্থ জীবনের করুণ প্রতীক হিসেবে পাঠকের মনে স্থায়ী ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। এই ক্ষুদ্র উপাদানের মাধ্যমে লেখক দেখিয়েছেন যে মহাবিশ্বের সত্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুর মধ্যেও নিহিত আছে, যা তাঁর দার্শনিক গভীরতার পরিচয় দেয়। তালনবমী গল্পে তাল ও অরন্ধনের নিমন্ত্রণ-এর মতো ছোটগল্পে ফণীমনসার ডাল বা কচুশাক মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ধরা দেয়। এই উপাদানগুলো কেবল খাদ্য বা পূজার সামগ্রী নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বকে ধারণ করে। এই গল্পগুলোতে প্রকৃতি ও মানুষ এমনভাবে মিশে আছে যে একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

‘আরণ্যক’ উপন্যাসে বিভূতিভূষণ প্রকৃতিকে তার সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহত্তম রূপে উপস্থাপন করেছেন। এই উপন্যাসের কোনও সুসংবদ্ধ বা কার্যকারণ-সম্পর্কযুক্ত কাহিনি নেই। এর মূল চরিত্রই হল অরণ্য, যা প্রতিক্ষেত্রে নিজের সৌন্দর্য ও রহস্যের পরিচয় দেয়। লেখক তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিহারের এক বিশাল জঙ্গল মহালের আদিম অরণ্য ও তার সরল, রহস্যময় মানুষের জীবনপ্রবাহকে তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের কথক সত্যচরণ, একজন শহুরে যুবক, প্রাথমিকভাবে অচেনা পরিবেশে নিঃসঙ্গতা অনুভব করলেও ধীরে ধীরে অরণ্যের ‘মোহ’ তাকে গ্রাস করে। তিনি গভীর মুগ্ধতার সঙ্গে এখানকার নীরবতা, জ্যোৎস্না-স্নাত হ্রদের অপার্থিব সৌন্দর্য এবং রাতের রহস্যময়তাকে পর্যবেক্ষণ করেন। একইসঙ্গে এই উপন্যাসে এক গভীর দ্বন্দ্বের সুর ধ্বনিত হয়েছে। সত্যচরণের পেশাগত দায়িত্ব ছিল বন পরিষ্কার করে জমিকে চাষের উপযোগী করা। এই বনবিনাশের কাজে তার ভূমিকা তার মনে গভীর বিষণ্ণতা ও পাপবোধ সৃষ্টি করে। এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতই আরণ্যক-এর মূল সুর, যা আধুনিক সভ্যতা ও প্রকৃতির মধ্যেকার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। বিভূতিভূষণের এই রচনাকে তাই নিছক ভ্রমণবৃত্তান্ত বা দিনলিপি হিসেবে দেখলে ভুল হবে, কারণ এটি একটি সুগভীর দার্শনিক উপাখ্যান। তিনি এই উপন্যাসের মাধ্যমে যে পরিবেশ সচেতনতার বীজ বুনেছেন, তা ছিল তাঁর সময়ের চেয়ে বহু এগিয়ে। বিভূতিভূষণের প্রকৃতি চেতনা কেবল গ্রামবাংলা বা অরণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর চাঁদের পাহাড় ও ইছামতী-র মতো উপন্যাসগুলিতেও তা ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে।

চাঁদের পাহাড়-এ তিনি পাঠকের সামনে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক প্রকৃতির জগৎ উন্মোচন করেছেন। আফ্রিকার সাভানার তৃণভূমি, শুষ্ক মরুভূমি, রুক্ষ পর্বত এবং অন্ধকার গুহার রহস্যময় শ্বাসপ্রশ্বাস। বিভূতিভূষণ নিজে কখনও ভারত ছাড়েননি, তবুও তাঁর অসাধারণ কল্পনাশক্তি, অনুসন্ধিৎসা এবং ভ্রমণ-বিষয়ক ম্যাগাজিন ও গাইড গ্রন্থ থেকে অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি এই অদেখা ভূখণ্ডকে এতটাই নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন যে পাঠকের কাছে তা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এই উপন্যাসে প্রকৃতি কোনও নিরাময়কারী সত্তা নয়, বরং শংকরের দুঃসাহসিক অভিযানের পটভূমি। যা মানব মনের অদম্য সাহস ও অজানাকে জয় করার স্পৃহাকে ফুটিয়ে তোলে। এখানে প্রকৃতি মানব-অভিযানের এক রোমাঞ্চকর সঙ্গী।

অন্যদিকে, ইছামতী উপন্যাসে ইছামতী নদী কোনও সক্রিয় চরিত্র নয়, বরং এক নীরব ও অবিচল সাক্ষী। এই নদী সময়ের প্রবাহ, মহাজীবনের প্রতীক এবং ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে উঠেছে। নীলকর সাহেবদের অত্যাচার ও গ্রাম্য জীবনের উত্থান-পতনের বিপরীতে নদীটি তার শাশ্বত গতিতে প্রবাহিত হয়, যা মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির শাশ্বত প্রবাহের এক গভীর বৈপরীত্য তুলে ধরে। লেখক বিশ্বাস করতেন, মানুষের বাহ্যিক লোকদেখানো সামাজিকতা পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির রূপ অপরিবর্তিত থাকে। এই উপন্যাসে প্রকৃতি মানব জীবনের দুঃখ-কষ্টের আশ্রয় নয়, বরং তার নীরব ও অবিচল সাক্ষী, যা জীবনের এক বৃহত্তর দর্শনকে প্রতিফলিত করে। ইছামতীতে তিনি লি'েছেন, ‘... মড়িঘাটা কি বাজিতপুরের ঘাট থেকে নৌকো করে চলে যেও চাঁদুড়িয়ার ঘাট পর্যন্ত, দেখতে পাবে দুধারে পলতেমাদার গাছের লাল ফুল, জলজ বন্যেবুড়োর ঝোপ, টেপাপানার দাম, বুনো তিৎপল্লা লতার হলদে ফুলের শোভা, কোথাও উঁচু পাড়ে প্রাচীন বট-অশ্বত্থের ছায়াভরা উলুটি-বাচড়া-বৈঁচি ঝোপ, বাঁশঝাড়, গাঙশালিখের গর্ত, সুকুমার লতাবিতান। গাঙের পাড়ে লোকের বসতি কম, শুধুই দূর্বাঘাসের সবুজ চরভূমি, শুধুই চখা বালির ঘাট, বনকুসুমে ভর্তি ঝোপ, বিহঙ্গকাকলি মুখর বনান্তস্থলী। গ্রামের ঘাটে কোথাও দু’দশখানা ডিঙি নৌকো বাঁধা রয়েছে। ক্বচিৎ উঁচু শিমুল গাছের আঁকাবাঁকা শুকনো ডালে শকুনি বসে আছে সমাধিস্থ অবস্থায়, ঠিক যেন চীনা চিত্রকরের অঙ্কিত ছবি। কোনো ঘাটে মেয়েরা নাইচে, কাঁখে কলসি ভরে জল নিয়ে ডাঙায় উঠে, স্নানরতা সঙ্গিনীর সঙ্গে কথাবার্তা কইচে।...সবুজ চরভূমির তৃণক্ষেত্রে যখন সুমুখ জ্যোৎস্নারাত্রির জ্যোৎস্না পড়বে, গ্রীষ্মদিনে সাদা খোকা খোকা আকন্দফুল ফুটে থাকবে, সোঁদালি ফুলের ঝাড় দুলবে নিকটবর্তী বনঝোপ থেকে নদীর মৃদু বাতাসে, তখন নদীপথ-যাত্রীরা দেখতে পাবে নদীর ধারে পুরোনো পোড়ো ভিটের ঈষদুচ্চ পোতা, বর্তমানে হয়ত আকন্দঝোপে ঢেকে ফেলেচে তাদের বেশি অংশটা, হয়ত দু-একটা উইয়ের ঢিপি গজিয়েচে কোনো কোনো ভিটের পোতায়। এইসব ভিটে দেখে তুমি স্বপ্ন দেখবে অতীত দিনগুলির, স্বপ্ন দেখবে সেইসব মা ও ছেলের, ভাই ও বোনের, যাদের জীবন ছিল একদিন এইসব বাস্তুভিটের সঙ্গে জড়িয়ে। কত সুখদুঃখের অলিখিত ইতিহাস বর্ষাকালে জলধারাঙ্কিত ক্ষীণ রেখার মতো আঁকা হয় শতাধীতে শতাধীতে এদের বুকে। সূর্য আলো দেয়, হেমন্তের আকাশ শিশির বর্ষণ করে, জ্যোৎস্না-পক্ষের চাঁদ জ্যোৎস্না ঢালে এদের বুকে।’


বিভূতিভূষণ ও জীবনানন্দ 

বিভূতিভূষণ ও জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যের দুই বিশিষ্ট স্তম্ভ, যাঁরা প্রকৃতিকে তাঁদের সৃষ্টিতে অনন্যভাবে ব্যবহার করেছেন। তবে তাঁদের প্রকৃতিভাবনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি ব্যক্তিগত এবং নস্টালজিক চেতনাময়। তিনি প্রকৃতিকে তাঁর স্বপ্ন, স্মৃতি ও শ্রুতির আবেগ দিয়ে দেখেছেন। তাঁর রূপসী বাংলা একাকিত্ব, বিষণ্ণতা এবং মহাকালের বোধের সঙ্গে একাত্ম। তাঁর প্রকৃতি প্রায়শই শহরের কোলাহল ও আধুনিক জীবনের ক্লান্তি থেকে এক নির্জন আশ্রয়। জীবনানন্দ প্রকৃতির সৌন্দর্যে মগ্ন হয়ে নিজের অস্তিত্বকে তার বিশালতার মধ্যে মিলিয়ে দিতে চেয়েছেন, যা মুগ্ধতার সঙ্গে বিষণ্ণতার এক গভীর মিশ্রণ তৈরি করে।

বিভূতিভূষণের প্রকৃতি সর্বব্যাপী, বস্তুনিষ্ঠ এবং আধ্যাত্মিক। তিনি প্রকৃতিকে জীবনের সারসত্য এবং আনন্দের উৎস হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বর্ণনাগুলো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হলেও তার লক্ষ্য ছিল একটি সর্বজনীন, মহাজাগতিক সত্যকে উন্মোচন করা। তিনি প্রকৃতিকে একটি শিশুর চোখে দেখেছেন (পথের পাঁচালী-র অপু)। এই দৃষ্টিতে মুগ্ধতা ও বিস্ময় থাকলেও কোনও হতাশা বা বিষণ্ণতা নেই। জীবনানন্দের প্রকৃতি মূলত বাংলার রূপ, যা এক ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ। কিন্তু বিভূতিভূষণের প্রকৃতি চেতনার ব্যাপ্তি আরও বেশি। তা গ্রামবাংলার মেঠোপথ থেকে শুরু করে আফ্রিকার মরুভূমি এবং মহাজাগতিক সত্য পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল একজন সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রকৃতির একজন নিবেদিত শিল্পী। যিনি প্রকৃতির মধ্যে জীবনের দর্শন, আধ্যাত্মিকতা এবং পরিবেশ সচেতনতার বীজ বুনে দিয়েছেন। তাঁর অনন্য দৃষ্টির কারণে তিনি প্রতিটি গাছ, লতা, কীটপতঙ্গ এবং নদীর মধ্যে এক অসীম সৌন্দর্য ও শাশ্বত সত্য দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্য আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ তিনি এমন এক সময়ে প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন যখন আধুনিক সভ্যতা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করতে শুরু করে। তাঁর লেখা আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া বিশল্যকরণী-র কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং প্রকৃতিকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখায়। তাই আমরাও অপুর পায়ের ছাপ ধরে ফিরে ফিরে যেতে চাই তাঁর সাহিত্যের কাছে, অরণ্য, লতাগুল্মের কাছে। তাই তো তিনি পথের পাঁচালীর শেষে লিখেছেন, ‘...পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বোত্রাবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে...দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গণ্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশে...।’

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন