রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

মৌলিনাথ বিশ্বাস-এর প্রবন্ধ

বাংলা নাটকের দু’শ তিরিশ বছর 


আজ থেকে দু’শ তিরিশ বছর আগে ১৭৯৫ সালের ৫ নভেম্বর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। ইংরাজি বিজ্ঞাপনের মূল বয়ান ছিল:-

By Permission of the Honorable the Governor-General

            Mr LEBEDEFF’S

New Theatre in the Doomtullah,

DECORATED IN THE BRNGALEE STYLE

Will be opened very shortly, with a play called

        THE DISGUISE

The Characters to be supported by Performers of both sexes.

 

শিল্পীদের দলের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ উভয়ই থাকবে – এই ঘোষণা সেই সময়ের কলকাতায় যে বেশ আলোড়ণ তুলেছিল তা বলাই বাহুল্য। কবিগান সং বাঈজিদের গান কীর্তন ছিল সেই সময়ের প্রচলিত সংস্কৃতি। বা বলা চলে আমোদ প্রমোদের আয়োজন। সেই প্রক্ষিতে থিয়েটার ছিল এক নতুন আমোদ। ফলে উত্তেজনা জন্মেছিল কলকাতার বাবু ও ইংরেজ উভয় মহলেই।

তখন কলকাতায় আর একটাই থিয়েটার হল ছিল যার মুখচলতি নাম ছিল কোম্পানির থিয়েটার। পোশাকি নাম সম্ভবত ছিল নিউ প্লে হাউস বা ক্যালকাটা থিয়েটার। ওখানে ইংরাজি নাটক অভিনীত হত। লেবেদেফ চাইলেন বাংলায় থিয়েটার মঞ্চস্থ করতে। এইখানে একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। লেবেদেফ গবেষক হায়াৎ মামুদ জানাচ্ছেন যে এই রুশ ভদ্রলোকের নামের যথার্থ উচ্চারণ বা প্রতিবর্ণীকরণ হল গেরাসিম্ স্তেপানভিচ্ লিয়েবেদেফ্ (১৭৪৯-১৮১৭)। আমরা এই লেখায় প্রচলিত নামটিই ব্যবহার করব।

বাংলা নাটকের ইতিহাস নিয়ে সামান্য চর্চাকারী যে কেউই সঙ্গীতজ্ঞ লেবেদেফ সম্পর্কে কমবেশি জানেন। আমরা এই প্রথম বাংলা নাট্যমঞ্চ ও নাটকের পৃষ্ঠাটি আজ একটু উল্টে দেখি। ২৫ নম্বর ডোমতলায় তিনি বসবাসের জন্য মাসিক ষাট টাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন। ভাড়ার অঙ্ক দেখে আন্দাজ হয় বাড়িটি বড় ছিল। ক্যালকাটা থিয়েটার ভাড়া না পাওয়ায় তিনি নিজের ওই ভাড়া বাড়িতে থিয়েটার হল নির্মাণ করেন।  আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, “আমি ডোমতলা সড়কের ২৫ নম্বরের আমার ভাড়া বাড়িতে অত্যন্ত সাহস করিয়া আমার হস্তে অবশিষ্ট অর্থ যাহা ছিল তাহা দিয়া নিজস্ব থিয়েটার নির্মাণ করিতে মনস্থ করি যাহাতে তিন শতাধিক ব্যক্তির স্থান সঙ্কুলান সেখানে হয়; এবং আমিই ছিলাম ইহার স্থপতি, একমাত্র অধিকর্তা, অথথা – কাঠামো-মিস্ত্রী, ছুতার, রাজমিস্ত্রী, জোগালিয়া ও অন্যান্যদের তদারককারী।”  

ঐ বিজ্ঞাপন প্রকাশের কিছুদিন পরে, ২৬ নভেম্বর ঐ  ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ দ্বিতীয় আর একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় নাটকের দিনক্ষণ জানিয়ে। তার বয়ান ছিল নিম্নরূপ:-

BENGALLY THEATRE

No.25 DOOMTULLAH

MR. LEBEDEFF

Has the honor to acquaint the ladies and Gentlemen of the settlement,

THAT HIS THEATRE WILL BE OPENED

TOMORROW, FRIDAY, 27 Inst,

WITH A COMEDY

Called

THE DISGUISE.

 

থিয়েটার শুরু হয়েছিল রাত আটটায়। আর টিকিটের দাম ছিল বক্স আট টাকা আর গ্যালারি চার টাকা।

নাটকটির দ্বিতীয় অভিনয় হয় ২১ মার্চ, ১৭৯৬। লেবেডেফ এবার টিকিটের দাম বাড়িয়ে এক মোহর করেছিলেন। অর্থাৎ নাটকটি দর্শকধন্য হয়েছিল। প্রথম দিন হয়েছিল একাঙ্ক হিসেবে। দ্বিতীয় দিন তিন অঙ্কই অভিনীত করা হয়।  

লেবেদেফের সঙ্গে যাঁর নাম অনিবার্য ভাবে স্মরণ করা উচিত তিনি হলেন তাঁর পণ্ডিত গোলকনাথ দাস। নাটকটির অনুবাদ লেবেদেফ গোলকনাথের সাহায্যেই করেছিলন। যোগাড় করেছিলেন কুশীলবদের।

লেবেদেফের নাট্যশালাটি আগুনে পুড়ে যায়। মনে করা হয় জোসেফ ব্যাটল নামে এক ইংরেজ এর পিছনে দায়ী ছিল।     

এই নাট্যাভিনয়কে শুভারম্ভ ধরে নিলে, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বরে বাংলা থিয়েটারের দু’শ তিরিশ বছর পূর্ণ হল।

প্রসঙ্গত, তৎকালীন ২৫ ডোমতলা মানে আজকের ৩৭ নম্বর এজরা স্ট্রিট। কলকাতা কর্পোরেশন থেকে ঐ স্থানে একটা স্মারকস্তম্ভ বসানো হয়েছে। আমি ওর আশেপাশের দোকানদারদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ওটা কীসের স্মারকস্তম্ভ। প্রায় সবাইই অবাঙালি। কেউই কিছু বলতে পারেননি।

থিয়েটারে ‘লোকশিক্ষা হয়’, আমোদ মেলে, মনোরঞ্জনও হয়। কিন্তু নাটক বা থিয়েটার শাসকের বিরুদ্ধে বার বার আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। যোগায় সাহস। এই কলকাতা তথা বাংলা জানে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই জানে, থিয়েটার প্রতিবাদেরও হাতিয়ার। আজও।   

(ঋণ- ১.বঙ্গীয় নাট্যশালা – ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

      ২. গেরাসিম লিয়েবেদেফ- হায়াৎ মামুদ)

 ছবিটি বর্তমান লেখকের তোলা।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন