"শঙ্কর লাহিড়ীর মুখার্জী কুসুম, বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়"
এক.
৭০ দশকে কৌরব পত্রিকার ক্যাম্পগুলো ছিল পাহাড়ে, জঙ্গলে, দলমায়। উদ্দেশ্য কবিতায় প্রচলিত গড্ডালিকা প্রবাহ থেকে বেরোন। প্রচলিত ধারা কবিতা থেকে মুক্তি। এতদিন পণ্ডিতি তর্কের নিষিদ্ধ শাসনে, ব্যাকরণের টিকা আর নির্দেশিকা মেনে যে কবিতাশাস্ত্রের দুর্লঙ্ঘ্য অনুশাসন মেনে চলে এসেছে ভাল ছেলের তকমা এঁটে, সেই ধারার পতনকে সুনিশ্চিত করতে কিংবা কৃত্রিম ছন্দের জারিজুরিকে ভেঙে দিতে যে সমস্ত কবি ধারামুক্তির প্রয়োজনে কৌরবের পাতায় বিকল্পবোধের চর্চা শুরু করলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি শংকর লাহিড়ী। স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ দশকের কিছু তরুণ কবির যাপনে ছিল একটা প্রথানুগ সীমানা ভাঙনের চেষ্টা। প্রথমে বোদলেয়ার, র্যাঁবো প্রদর্শিত পথে, পরে বীট জেনারেশনের বোহেমিয়ানিজম্ আত্মসাৎ করে তাঁরা কবিতায় কিছুদিনের জন্য আনলেন মুক্ত হাওয়া। কিন্তু যেহেতু তাঁদের ব্যাপারটা ছিল উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও বাহ্যিক দেখনেপনায় আচ্ছন্ন তাই ভাবনায়, চেতনায় তাদের সীমা ভাঙার খেলা সেভাবে কবিতায় সূক্ষ্ম ও গূঢ় অ্যাডভেঞ্চারগুলোকে নাড়াতে পারেনি। কবিতায় শব্দযোজনার পেছনে আনন্দের চেয়ে বিপণনের উদ্দেশ্যই যেহেতু বড় ছিল, আপাত বিদ্রোহের ইমেজের পিছনে ব্যবসায়িক চাতুর্য, তাই কবিতায় তাঁরা রয়ে গেছেন কিছুটা গিমিকে, কিছুটা জীবনানন্দের বাহ্যিক অনুকরণে এবং তাদের প্রাথমিক শিক্ষাগুরু বুদ্ধদেব বসুর নির্দেশিত পথে। যাঁর মতে, আধুনিকতার অন্যতম বৈশিষ্টও, কবিতায় লাগামছাড়া যৌনতার প্রকাশ চাই। বাংলার বিপণন সংস্কৃতি চিরকালই বিভিন্ন রূপে ব্যবসায়িক কিংবা কর্পোরেট হাউসের দখলে। 'সেলেবেল প্রোডাক্ট' হিসেবে পাব্লিক চিরকালই প্রেম এবং যৌনতার মিশ্র ককটেল উপভোগ করে। বিশেষ করে সেইসব মধ্যমেধার পাব্লিক যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাফাই গেয়ে, বিড়ালের মুখে পড়া ইঁদুরের হাসি দেখে, ক্যাটালগে বাছাই করা পুরস্কৃত বইগুলি সাজিয়ে রাখে বহুতলে সাজানো ফ্ল্যাটের ড্রইংরুমে। এর ফলে সিগনেট প্রেসের দিলীপ কুমার গুপ্তের স্বপ্ন থেকে ধীরে ধীরে নিজেদেরকে সরিয়ে, মুখে 'কমল কুমার-কমল কুমার' এবং বাইরে বাজারধন্য চোলাই-পাঁইটে বন্ধকী কলমের কালি ডুবিয়ে, কবিরা লিখতে থাকেন, দীর্ঘ দীর্ঘ কবিতা, গদ্য, রম্যরচনা, স্বনামে-বেনামে পেটমোটা থানইট উপন্যাস। কবিতার হয় সেখানেই সলিল সমাধি।
তো, পঞ্চাশের এই ঢক্কানিনাদ, ষাটের হাংরি প্রতীকবাদী-কংক্রিট-শ্রুতি-থার্ ড লিটারেচার ইত্যাদি কাব্য আন্দোলন, ৭০ দশকে মুক্তির দশক হিসেবে এমার্জেন্সীতে লেখা টাইম সার্ভারদের বিপ্লবী কবিতার আগে পরে মূলধারার বাংলা কবিতায় যাঁরা রাজত্ব করেছেন তাঁরা হলেন কলাকৈবল্যবাদী কিংবা এলিটিস্ট কবিরা। কিংবা ব্যতিক্রমী জীবনানন্দ। যিনি একই সঙ্গে পুরনো প্রচলিত এবং নব্য আধুনিক ভাবনার মধ্যে যোগসূত্র রচয়িতা হিসাবে ভবিষ্যতের অন্তহীন বিস্তীর্ণতায়, enternal-time বা চেতনার অসীম সম্প্রসারকে ধরতে পেরেছিলেন। এরফলে বাংলা কবিতা ভাগ হয়ে গেল দু'দিকে। একদিকে কবিদের বৃহৎ গোষ্ঠী ছুটতে শুরু করলেন, জীবনানন্দের আপাত ছাঁচ নকল করার দিকে। আর যাটের কাব্য আন্দোলন প্রভাবিত করলো ৮০'র কিছু শক্তিশালী কবিকে পরোক্ষভাবে।
এর বাইরে ৭০'এ পশ্চিমবঙ্গের বাইরে, জামসেদপুরে ধীরে ধীরে তৈরি হল 'কৌরব গোষ্ঠী'। '৭১-এ প্রথম কৌরব পত্রিকা প্রকাশিত। কৌরবের ৫০তম সভায় কবি স্বদেশ সেনের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয় কৌরবের তরুণ তুর্কী কবিদের। পরে কবি স্বদেশ সেনের কবিতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে, প্রকৃতির নৈসর্গিক পাঠশালায়, খোলামেলা আড্ডায় কৌরবের অবিস্মরণীয় ক্যাম্পগুলিতে 'সিরিয়াস' আলোচনা চলতে থাকে। কীভাবে এবং কেমন করে কবিতার চেতনাচল, আঙ্গিক, প্রকরণ, কবিতার সামগ্রিক চরিত্রে পুরনো ক্ষত আর বর্জ্যস্তূপের ঘোলা গন্ধ মুছে দিয়ে অফুরন্ত নতুন অক্সিজেনের আমদানি করা হয়। এই সময় থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আমরা পাই 'কৌরবে প্রকাশনীর' চারটি অবিস্মরণীয় ধারামুক্তির কবিতা-বই। পরীক্ষামূলক এই বই চারটি হলো, স্বদেশ সেনের 'রাখা হয়েছে কমলালেবু', বারীন ঘোষালের 'মায়াবী সীমুম', কমল চক্রবর্তীর 'মিথ্যেকথা', শংকর লাহিড়ির 'মুখার্জীকুসুম'।
যেহেতু কিছুটা কবিতাচর্চা করার নেশা এক সময় শুরু হয়েছিল আমার মধ্যে এবং কীভাবে লিখব এবং কীভাবে নিজের অনুভবকে, সেই ভাবনায় অস্থির-উদাস মুহূর্তে যখন রাশি রাশি লেখা লিখে ছিঁড়ে ফেলি এবং উদ্ভ্রান্ত হই, ঠিক তখনই বেশ কিছু কবিতা বই-এর পাশাপাশি উজ্জ্বল হতে থাকে একটি বই, মুখার্জীকুসুম। বেশ কয়েকবার পাঠে চমকে উঠি। নির্জন মুহূর্তে নিজেকেই বলতে থাকি- এর আনন্দ- বিকিরণ ক্ষমতা কতটা অব্যর্থে গিয়ে সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু কেন? কেন এই তীব্র ভাললাগার রেশ আজো রয়ে গেছে, সেই অনুভবের দু'এক কথাই আজ বলি। তার আগে মুখার্জী কুসুম থেকে ১৯ সংখ্যক কবিতাটি তুলে ধরছি --
মুখার্জী কুসুম / ১৯ নং কবিতা
ক্রমে আমি দেখি তোমাকেই,কবিতা বান্ধবী।
মনে হচ্ছে এইমাত্র জন্ম হতো যদি,
তোমারই সরল ও গাঢ় মেরুন রঙে যদি আকাশ বিভাজিত হয়।
যদি সুবর্ণ সোপান ধ'রে নেমে আসে আমাদের বোন
মুখে তৃপ্তি হাসির আভাস আর চম্পক আঙুল।
আসলে চেয়েছি তোমাকেই কবিতা, বান্ধবী,
আঙুল রেখেছি তোর অন্তর্গত তারে
আর ব'সে আছি
সময়কে স্রোতের সাথে তুলনা ক'রে
একা ও জটিল অসহায়।
হাওয়ায় তরঙ্গে এক অশ্রুরেখা টেনে রেখে গেছে
দেখেছি ঘুমন্ত মেয়েরা
স্বভাবে সুরেলা তারা অথবা তারা আধোজাগ্রত,
কোন্ লজ্জা ও অপমানে ওদের ঠোঁটের রঙ নীল-
কবিতা ছন্দমিল চিত্রিত আমূল ;
---আমরা কি শুধুই অশ্রুগান গাইছি,
কথা বলছি বেদনাভাষায়?
দুই.
কবি যখন গতানুগতিক পরম্পরাকে আক্রমণ করে কবিতাকে ভেঙে ফেলে, কবিতার স্বকপোলকল্পিত ধারণা, সংবিধান এবং অনুশাসনকে ভাঙে এবং সেই সব ভাঙা টুকরো নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করে, তখন 'পোয়েট্রি', 'অ্যান্টিপোয়েট্রির' রূপ নেয়। মোট ৩৫টি অংশে বিভক্ত 'মুখার্জীকুসুমে' প্রচলিত বিষয়ের মধ্যে কবি অভিনব ট্রিটমেন্ট এবং এক্সপ্রেসিভ একটা টিউনে আমাদের বেঁধে রাখেন প্রথম থেকে শেষ, পর্যন্ত। ১৯৮৫ থেকে '৯৪ এই প্রায় দশ বছরে লেখা কবিতা প্রসঙ্গে কবি নিজেই বলেছেন, 'সমসাময়িক বাংলা যা লেখাপত্র চলছে, তা আমাকে বিশেষ কিছু দিচ্ছে না। বরং বলা যায়, নেগেটিভলি দিচ্ছে। অর্থাৎ এটা নয়, ওটা ভুল, ওটা ছাই পাঁশ, এটা চোরাবালি। এরকম। অথচ ভ্যাকুয়াম তো কোথাও থাকে না। ফলে, এলেবেলেকেও নিয়ে হৈ - চই কূটতর্ক চুল ছেঁড়াছেঁড়ি পুরস্কার-টুরস্কার হ'তে থাকে। এটা শুধু সাহিত্যে নয়, সমস্ত মিডিয়ামে।'
এই প্রচলিত অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে কবিতাগুলো হয়ে উঠতে থাকে প্রতিকবিতা। কবিতার মাদার লিকারে 'মুখার্জী মুখার্জীরা' ভাসতে থাকে 'বহুরৈখিক অর্কেস্ট্রায়।' লেখার খেলাটা শুরু হয় এ'ভাবে,
"একটি কবিতার সাথে দেখা হোল বিকেলে উদ্যানে/মাথায় জরীর টুপি, প্যান্টুলুনে জিরো জিরো বেল্ট/দৈর্ঘ্যে বেশি বড় নয়, এঁটে যাবে এক পাতাতেই, মনে হোল,/-মনে হোল এসেছে সে কোনও বান্ধবীর সন্ধানে।"
ধীরে ধীরে অন্ধকার ক্যানভাসে আলো এসে পড়ে। একটা সম্ভাবনা ক্রল করতে থাকে স্পিটন দিয়ে আইস অ্যাক্স দিয়ে। উৎস-চেতনাকে, দ্বন্দ্বকে ধীরে ধীরে কবি চিহ্নিত করতে পারেন। শুরু হয় মুখার্জীদের নিয়ে কবির যাত্রা। যে জীবন পরমুখাপেক্ষী, উৎকর্ষতার সমস্ত সোপানেই তার ধাক্কাধাক্কি। এই সোপানের নিয়ন্ত্রক কিছু সফল মানুষ। নাগরিক জীবনে কিংবা অস্তিত্বের টানাপোড়েন- ওঠানামার দিকগুলি এরসঙ্গে জড়িয়ে। আধুনিক মানুষ, সে অর্থে ভালো-মন্দ এই অভিধায় ভেবে নেয়া নিতান্তই অপরিণত সারল্যের পরিচয়। এই সময়, মানুষকে এবং মানুষ সময়কে যে যার প্রয়োজনে ব্যবহার করতে থাকে। পারস্পরিক ব্যবহারের মধ্যে যে যত পরিস্থিতিকে কাজে লাগায় সে ততই এগোতে থাকে লক্ষ্যে। প্রয়োজনীয় সাফল্য চেয়ে কিংবা পেয়েও, প্রাপ্ত সাফল্যের সবটুকুকে নিজের গ্রহণক্ষমতার সীমারেখা ভেঙে মানুষ কখনো আয়ত্ত করতে পারে না। সীমাকে সাফল্য ভাঙতে চায়। চেষ্টা করে। হারে। বারংবার হেরেও সেই কাজই করে যায় মূর্ত জটিলতায়। এই চাওয়া-চেয়ে পাওয়া- পেয়েও সীমারেখা না ভাঙতে পারা- এবং তা জেনে একই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া- আপতিক ক্ষয়ক্ষতি-বিমূর্ত আত্মপ্রক্ষেপের দ্বন্দ্ব ও মুহূর্তের মাপে, পরিস্থিতির মাপে নিজেকে পাল্টে ফেলাই হলো নব্যআধুনিকতা। যা বাণিজ্যিক সিনেমার চিত্রনাট্যের সরলরৈখিক, একমেটে 'নায়ক ও খলনায়কের' ধারণার মত নয়। কেউ সে অর্থে ভালোও নয়, সে অর্থে খারাপও নয়। অবিমিশ্র-মন্তাজ। মুখার্জীরা বিভিন্ন বেশভূষায়, বিভিন্ন মুখোশে চেতনায় 'অ্যামালগ্যামেট' করতে পারে সব অবস্থাতে। ক্ষমতার তামসিক সুখানুভূতি একটা প্রসেসে সম্প্রসারিত হতে থাকে জীবনের বিভিন্ন কেন্দ্রকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে। নাগরিক চৈতন্যে আধুনিক বিষও প্রগতি, মননহীন যান্ত্রিক ভোগবাদ, প্রযুক্তি লালিত জাগতিক স্বেচ্ছাচার, চতুরালি, সবকিছুই বস্তুর গহন নির্যাস থেকে লুঠ করে নিয়ন্ত্রণ করে, সম্পর্কে-প্রেমে-আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায়, শিক্ষায়, সামাজিক মেলামেশায়, জীবনের যে কোন উত্থান পতনে, বোর্ডরুমে, বাগানবাড়িতে। নাচঘরে, নারীকে এমনকি কবিতাকেও লুঠ করে নেয় মুখার্জীরা। সুফলভোগী মুখার্জীরা, প্রাকৃত-লৌকিক জীবনে এবং প্রান্তিক সংস্কৃতির নিজস্বতায় হাত বাড়ায়। তাদের এই হাত এতই শক্তপোক্ত ও ডাঁটো যা মানুষের নিজস্ব ভাবনার বৃত্তটিকেও ঘুরিয়ে দেয়, আব্রহ্মস্তম্ভ লুটিয়ে পড়ে মুখার্জীদের পায়ে-
'আমাকে বাগানে আজ মুখার্জীরা ডেকে বলে গেছে/ও-গানের নাম নাকি সিন্ধু ভৈরবী, আর/ঐ ফল তারা নাকি প্রতিদিনই খায়।/ একথাও বলেছে যে আগামী আশ্বিন থেকে/এ-ফলের স্বাদ আমি কোথাও পাবো না- শুধু মুখার্জীরা পাবে, কেননা তাদের আছে/জেলি বানাবার পদ্ধতি।'
'খাওয়ার আগে যে ক্ষুধা, সেই হোল প্রকৃত খাবার/তাকে খাও, একথাই মুখার্জীরা আমাকে বলেছে; /আমিও তো একথাই আক্ষরিক সত্য, এই জ্ঞানে/বসে আছি।/নীরব আতার দেহে দাঁত বসাবার আগে থমকিয়ে, ভেবে,/আপেলের জেলি থেকে চামচ উঠিয়ে এনে, পুনরায় ভেবে,/ফলহীন র'য়ে গেছি,--- ফলভোগ মুখার্জী করেছে।'
তিন.
লৌকিক জীবন থেকে আধুনিক নাগরিক বৃত্তে গভীরে- মননে আভ্যন্তরিক অস্থিরতা, সম্পর্কের অনপেক্ষ ও দুর্মর আগুনগুলো নিয়ে আপন স্বভাববশে কুশলী নিপুণতায় খেলে যায় মুখার্জীরা। যেহেতু ক্ষমতা-অলিন্দ-অর্থ-বিত্ত ও কুক্ষিগত করার লড়াই-এ মুখার্জীরা হারে না, যে কোন মূল্যে মসনদ দখলে রেখে দেয়, এক মুখার্জী থেকে অন্য মুখার্জীর হস্তান্তরে যায় ক্ষমতা আর এই লড়াই থেকে যেহেতু ফেরা অসম্ভব, তাদের অমোঘ চৌম্বকশক্তির টানে অধিকাংশ বাসনাভোগী মানুষ বাদলাপোকার মতো সেই হিমনীল আগুনের চারপাশে ঘুরতেই থাকে। যুগ যুগ ধরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অনায়াস জয়ে বিজয়ীর দৃপ্ত হাসিতে, একচ্ছত্র প্রভুত্বের ক্রমাগত গরিমায়, মুখার্জীরা এটিই চিরকালীন সত্য বলে মেনে নেয়। এমনকি, বাংলা কবিতার আবহমান বাজারে, মুখার্জীদের প্রমোদ তরণী ভাসমান। এদের বজরায় একই সঙ্গে বাই ও বাবু। ফরাসডাঙার ধুতির কোঁচাটা লুটিয়ে, মুখার্জীদের জুতোর পালিশ অমলিন রেখে, মুছে সাফ করতে করতে কৃতজ্ঞ 'কবিবর' ভাবেন, 'কোন দিকে থাকা হয়? -- সম্ভ্রমে এ প্রশ্ন করাতে/আমার নিকটে এসে জানালো সে ঈষৎ গর্বিত:/এ তো স্বাভাবিক প্রশ্ন, প্রতিদিনই জানতে চায় লোকে,/থাকি মুখার্জীর ঘরে, তারই বরে হয়েছি বিখ্যাত।'
এই ছিন্নমূল নটেদের তৈরি প্রদূষণ আর নির্বিচার মাংস ও আতরের প্রদর্শনীর ঝাঁজ থেকে হাঁপিয়ে, সামগ্রিক সুবাতাসের সাথে আত্মিক সম্পর্কের জন্য কবির আর্তি। প্যাশন। তিনি চেয়েছেন গতানুগতিক, ক্রমে ক্ষয়ে যাওয়া, চেতনার 'বন্ধকী কারবারীদের' হাত থেকে দিক বদল। নতুন কবিতার জগৎকে খুঁজে প্যাশোনেটলি কখনো বিদ্রূপে, যন্ত্রণায়, বিষাদে, ক্রোধে, আনন্দে, কষ্টে, প্রয়াসে, ভাবনায় আবার কখনো তীব্র ভালবাসায়, প্রেমে 'মুখার্জীদের বনেদী ব্যাবসায়ী ভবন' কখনো 'মুখার্জীদের পালিত
নি-শিকড়-পিগমীদের' আক্রমণ করেছেন। চেয়েছেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনার হাজারটা দরজা খুলুক। সমস্ত চিরাচরিতকে আবহমানকে ক্রমাগত ভাঙতে থাকুক নতুন কোন পথ। কবি মুখার্জীদের কারিশমাকে নাগরিক রেসপেক্ট দিয়েই নিজের খেলকুঁদ-মজাকিতে বুঁদ হতে চেয়েছেন। চেয়েছেন শব্দগত ও চেতনাগত দু'ধরণের ব্যঞ্জনায় একটু মিউজিকাল অ্যাবস্ট্রাকশন। আর ক্রমাগত সুন্দর-সুন্দরতর-অনিন্দ্য সুন্দরের ধারাবাহিক মুখশ্রীর আড়ালে একটা 'ইমিডিয়েসি,' জীবনের সুন্দর দিকগুলোকে ঘিরেও একসময় তৈরী হয় অনিশ্চয়তা, ক্ষয়, উদ্বেগ, বিপন্নতা। সেই বিপন্নতা থেকে বেরিয়ে চিরভ্রাম্যমাণ মন আর ভ্রমণপিয়াসী পাঠকের মননকে একটি কেন্দ্রীয় বিন্দুতে, আত্মিকতায় মেলাতে চেয়েছেন শংকর।
কিছু উদাহরণসহ দেখা যাক
১.
'বসে আছি এতক্ষণ তোমারই আদেশ মেনে কাঠের ঘোড়াতে,/মুখার্জী অধ্যুষিত ছন্দময় পংক্তিময় সাম্রাজ্য পেরিয়ে/আমিতো পালাতে চাই, পিস্টন বাহিত হ'য়ে চলে যেতে চাই/কবিতা আহত দেখে, মৌলিক কাঠে ও নারীতে।'
২.
'আজ দীর্ঘদিন পরে নৈনিতাল থেকে তার চিঠিতে জেনেছি,/ সেবার জরতী বেশে সে-ই পুরস্কৃত হয়, শহরের প্রধান কবিরা/তাকে পুরস্কৃত করে একযোগে ধন্য ধন্য বলে।/ দ্বিতীয় পুরস্কার পায় ললনার ছদ্মবেশে মুখার্জীরই একটি কবিতা।'
৩.
'আরও শুভ্র, আরও ঝাঁক, সুবর্ণ, সুপার্ব, কম দাম/মুখার্জী, আমার প্রাণে তুমি এক মহিম সাবান।'
৪.
'কতদিন হ'য়ে গেল, কতদিন মুখার্জীর কাছে কাছে থেকে/দেখেছি তো কবিতার তত্ত্বজাল, কবিতার ক্রমিক বিপুল বিগ্রহ;/ দেখেছি জরির টুপী, প্যান্টুলুন, জিরো জিরো বেল্ট/দেখেছি নক্ষত্র বায়ু তিমি মাছ গন্ধর্ব কেশর/অদ্ভুত লোশনে রাখা, মুখার্জীরা সংগ্রহে রেখেছে।'
৫.
'ঘোর অবিশ্বাস হয়, তবু ভাবি স্পষ্টতঃ দেখেছি/প্রায় দেড় লক্ষাধিক লেখা হোল বিপুল কবিতা/মুখার্জী তোমারই মাপে।/ সকলে আমাকে বলে, আমিও আমাকে ডেকে বলি,/হতে হবে মুখার্জীর মতো।'
৬.
'মুখার্জী তোমারও দায়, এ দায়িত্ব নাও তুমি, সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা/কি রকম নষ্ট, ধীর, কাব্যময়, অপেশাদারিক,-/অন্ততঃ তোমার হাতে দু-একটা বাদাম তুমি ভাঙ্গো।'
৭.
'কবিতার মিক গ্যাস খুলে গেছে, মরেছে কবিরা/মুখার্জীর সমসাময়িক,/চোখের জ্বালায় কেউ, ছন্দপতনে, শ্বাসরোধে, / মর্মাহত হ'য়ে।'
৮.
'মনে হয় জ্বর হ'ল, অথবা কি শরীরে জাগালে/তোমাকে ছোঁওয়ার আর্তি?/তোমাকে ছোঁওয়ার আর্তি...!/অবিশ্বাস্য, মনে প'ড়ে গেল:/ আর্তি নাম্নী এক অষ্টাদশী বিহারী ললনা/দানাপুর ফাস্ট প্যাসেঞ্জারে/(-ছিলো জানালায় গ্রীবা, নক্ষত্রও ডুবে গিয়েছিলো) গেয়েছিলো শান্টিং-এর শব্দমালা আলোড়িত ক'রে/'পিয়া বিনা, পিয়া বিনা, পিয়া বি না...।'
৯.
'মুখার্জী রেখো তো মনে, দেখো তো এ কাব্যের/বিবাহযোগ্যতা যদি পুনরায় থাকে, যদি আজ গর্ভপাত প্রচলিত হয়, আর/পাও যদি সমর্থ প্রজাপতি।'
১০.
'মুখার্জীও ভেসে যায় সাদা পালে নীল পালে সময়ের বসন্ত প্রবাহে-/ পৃথিবীর তিনভাগ বসন্ত, তবু তার/সামান্য অংশ সুস্বাদু।'
১১.
'কবিতা রয়েছে নীচে আমার ও আমাদেরই/মগ্ন নীল নিতম্বের বজ্রাসনে, চাপে; রয়েছে সে তলদেশে, অর্থাৎ আক্ষরিক মৃত্তিকার খুবই কাছাকাছি; /- তাহ'লে নাচিনি কেন, নাচিনি কখনও, আহা/কাব্যকুসুমে তবে এতদিন চেপে বসে আছি?'
১২.
'দেখি সে দাঁড়িয়ে থাকে, হাতে তার নতুন কলম/চোখে এক নতুন কবিতা, মুখ সহাস্য নির্ভয়-/শাদা পাতা, জ্যোৎস্না নামে, জ্যোৎস্না নামে লুম্পেন,/ হেসে ওঠে মুখার্জী নিলয়।'
১৩.
'কমাও কোলন জলে ছবি ও বিষয় জল/শব্দ-ছন্দ-তাল, কুঁড়ি-ফুল-ডালপালা/ভাঙ্গ ছে, ঝালাপালা/পালা পালা, পালা পালা/ভাঙ্গ তবে, ভাঙ্গ তবে ভাঙ্গ
১৪.
'থাকুক আহারা ওরা বিষ বাষ্প বাছার লেগেছে
মুখার্জী, টাট্টুঘোড়া ঢিমে বেতো হাঁপানি ঘঙ্ঙ ঘঙ্ঙ
রয়েছে কবিতা- শায়া রক্তজলদাগ তাপলাগা
-রাতের খোঁয়াড়ি শেষে ধোবীঘাটে লেজ নাড়ে ভোর।'
ফ্লোরে একে একে উঠে আসে অনেকেই। জীবনের মানবিক সংবিত্তির সুস্থদিকগুলির পাশাপাশি নিঃশব্দে আধিপত্যবাদের বীজরোপন করে, নব্য আধুনিক মানুষের কৃতকর্ম আরোপিত ঔজ্জ্বল্যের মুখোশটি ঠিকঠাক সেঁটে রেখে সর্বশক্তিমান মুখার্জীরা ক্রমাগত মুনাফার স্ফীত আশ্বাসে নাগরিক মনোজগত ও রুচিকে এ্যানিমেশন কার্টুনে পর্যবসিত করে। এমনকী ধরাবাঁধা পথে, মানুষের চেতনালব্ধ স্বপ্ন ভাষায় তাঁরা বছরের পর বছর নির্বিচারে নৈরাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে। বিপণনের সূক্ষ্মজগত ও মায়াবী আলোর টানে অর্ধমনস্ক-অর্ধসচেতন-কূপমণ্ডুকে পরিণত হতে চাওয়া পাঠককে নিষ্প্রভকবিতার কুহকমন্ত্রে বেঁধে রাখে। এটাই তাদের সাংগঠনিক অঙ্ক। কবি চান এর থেকে মুক্তি। নতুন পথের আর্তি ছড়িয়ে পড়ে তাঁর সৃজন বিষাদে। যেহেতু এই নাচঘরের মালিক মুখার্জী, অথবা সে 'ডার্লিং অফ দা ফ্লোর'। তাই শব্দগত ও চেতনাগত ব্যাঞ্জনায় কবি চেষ্টা করেন, ভেতর থেকে নাড়া দিতে। একটা ম্যাজিক্যাল মুভমেন্ট। এক একটা সাডেন টার্ন। ফলে পাঠকের যাতে ত্বরণ অনুভব হয়। রক্তচলাচল বাড়ে। সেইমত তাজগি। ক্ষণস্থায়ী ভোগবাদকে ঘিরে একটা বিপন্নতা, উদ্বেগের পাশাপাশি এইসময়ের একটা সার্বিক বোধ রাখতে চান তিনি। যদিও কবির মতে, 'পাঠকের কাছে কখনো এটা অনেকটা বাঞ্জি জাম্পিং-এর মতন। ধরো, পর্বতশিখর থেকে নিচে অতল গভীরে তুমি ঝাঁপ দিলে। কিন্তু কতদূর যাবে তুমি তা নির্ধারিত হয়ে আছে শুরুতেই। তোমারই পায়ে বাঁধা ঐ ম্যানিলা রোপ।' পাঠকের যদি নতুন শিখরে ওঠার 'সামিট ফিভার' তৈরি হয়, তাহলেই সে জয়ের নেশাতে সর্বোচ্চ শিখরে উঠবে। নতুন ভাবনার কবির কাছে এই পর্বতাভিযানের কোন শর্টকাট্ প্রসেস নেই। তার ভাবনায় আনন্দগিরি। দায় নেই বাণিজ্যিকীকরণের...।
( বিশেষ দ্রষ্টব্য -- ঠিক সতেরো বছর আগে ২০০৮ সালে যে ভাবনা থেকে এই লেখাটির সূত্রপাত, আজ এতবছর পরেও আমি মনে করি, বাংলা কবিতার জগতে, শঙ্কর লাহিড়ীর , মুখার্জী কুসুম , কবিতার বইটি , Outstanding in every way. Successful counter-poetry to the monotony of the current trend is the only way to attack the prevailing trend. এবং এই ধরণের কবিতার বই বাংলা কবিতায় কম লেখা হয়েছে বলেই মনে করি আমি। সেইসময় কবিতা নিয়ে, তাঁর এই বইটা নিয়ে অনেক আড্ডা আলোচনা হয়েছে শঙ্কর দা র সঙ্গে আমার। সে সব স্মৃতি আমার পাথেয়। আজ তরুণ বা সদ্য লিখতে আসা কবিদের বলবো, এই বইটি সংগ্রহ করে অন্তত পড়ুন। বাংলা কবিতা কতটা এগিয়ে তা আপনারা নিজেরাই বুঝতে পারবেন।ধন্যবাদ।)



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন