Kigo কিগো
লিপস্টিকের রঙ হয় গোলাপী কিংবা লাল। এর ব্যতিক্রমের ধারণা নেই অনেকেরই। পৃথিবী এগিয়ে গেছে গোড়াপত্তনের ধারনার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে আরো অনেক দূরে।মেরুন, কফি কালার কত রঙে লিপস্টিক বেরিয়েছে বাজারে। পৃথিবী গোল নাকি চ্যাপটা এই নিয়ে ছিলো বহু বিতর্ক। কেউ বলে ঈশ্বর বা ভগবান থাকে মুর্তিতে, কেউ বিশ্বাস করে নিরাকারে। কেউ প্রাচীনকালে মুখে মুখে ছড়া বা কবিতা রচনা করতেন। সময়ের হাত ধরে চলতে চলতেব বর্ণের আবিষ্কার, লেখার পদ্ধতি, টাইপরাইটারের আগমন বর্তমানে স্মার্ট ফোনে যে কোন জায়গায় বসেই লিখে ফেলা যায় দীর্ঘ লম্বা প্রবন্ধ, উপন্যাস কিংবা পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম কবিতা হাইকু। আকারে সাকারে সে যতই ক্ষুদ্র হোক তার নিয়মে আছে কড়াকড়ি নির্দেশ। যেমন থাকে, ছড়াতে, যেমন থাকে স্বরবৃত্ত ছন্দের লেখায়, মাত্রা গোণা, অক্ষর বৃত্তে বিশেষজ্ঞ ভাব প্রকাশ করা, বাংলায় যেমন ব্যাকরণ আছে। জীবন চলার পথে তেমনি অনেক উপকরণ থাকে যার কিছু কাজে লাগে কিছু বা ভুল বুঝে হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভেঙ্গে যায় কাঁচের গ্লাসের মত। কবিতার জগত এতো বিশাল আর এতো কোটি কোটি কবি হয়েছে বিশ্বে। বাংলায় লিখেও আমরা ভ্রমণ করছি বিশ্বের কবিতা কানাচে। তাই তুলে আনছি নানা ধরণের কবিতার রূপ প্রকৃতি। এই নিরীক্ষার সময়ে অহেতুক বিশেষজ্ঞেরা এসেই বলবেন এটার গায়ের চামড়া কালো হয়েছে, ওটার মাথা মুড়ানো হলে ভালো হতো, আরে এটা ছাই ভস্ম কিছুই হয়নি। ভাবখানা এমন যে তিনি একমাত্র বিশেষজ্ঞ যিনি দুকলম না লিখেও মহাবিজ্ঞ। অন্যতম শীর্ষক আলোচক। নিজে নিজেই পণ্ডিত জগন্নাথ। ফুটো হেমনাথ।
গুরচণ্ডালি করলাম অনেকক্ষন। এবার হাইকু নিয়েই বলি। জাপানে উদ্ভুত তিনলাইনের সতের সিলেবালের এই কবিতার গাঁথুনিতে এক ইঞ্চি মেদ লাগাবার সুযোগ নেই। তাকে ইউরোপের মডেলিং স্লিম ক্যাম্পের বাসিন্দা করে রাখা হয়েছে। তবু সে ডানা মেলে আকাশে উড়তে চায়। র্যা ম্পেও কেট ওয়াক করতে সাহস রাখে। জাপান ছেড়ে ,ইংরেজ কবিদের সরাইখানা হয়ে বাংলাদেশেও ঢুকে পড়েছে হাইকু। চড়ুই পাখির মতো । ফুড়ুৎ ফাড়ুৎ। গায়ে গতরে ছোট, চিন্তায় চেতনায় কতো গভীর যিনি বুঝে লেখেন তিনিই জানেন। দুটো বিষয় নিয়ে হাইকু তার নৃত্য প্রদর্শন করে লেখকের চিন্তামঞ্চে। দুটি বিপরীত ধর্মী চিত্রকল্পের মধ্যে এক বন্ধন তৈরি করা। ঠিক বিপরীত মেরুতে আকর্ষণের মতো, যা পড়লে পাঠকের চিন্তা চেতনায় একটা আলোর ঢেউ ওঠে। আলোর ঝিলিক ওঠে। ভাবায় তাকে। হাইকুর পোস্ট দিলেই দেখেছি কিছু বন্ধু তিনলাইনে কিছু একটা লিখে মন্তব্য দিচ্ছে। বেশ তো। তারা চেষ্টা করছে। বাহ্যিক আকৃতি দেখে। মাত্রা বা শব্দাংশের বিশেষ ধারণা ছাড়া। লিখেই খুশীতে হাততালিও দিছে, এই দ্যাখো , আমিও পারি। এতে অসুবিধার কিছু নাই। পড়ছে , বুঝতে চেষ্টা করে লিখছেও।
হাইকু মাষ্টার ইউসা বুসন্স একটি মোমবাতির আলোকে বসন্ত আকাশের হাজার তারার আলোর রূপে কল্পনা করেছেন । মোমবাতি আমার কাছের। আর তারারা বহুদূরের। দুরের ও কাছের, একটির সাথে অসংখ্যের এবং সময় ,বসন্ত রাতের আকাশে জ্বলমান তারার তুলনা। এই দিয়ে একটি বৃহত কবিতাই লেখা হয় যেতে পারে। তা হলে তিনলাইনে এতো কসরৎ করার দরকার কি? মানুষের মাঝে বিচিত্র বর্ণের ক্ষুধা ও চিন্তা আছে তাই। সহজ কথা। বাড়িতে বড় বড় ডিনার প্লেট আছে, তা রেখে নাস্তার প্লেটে ডিনার খাওয়ার মজাই আলাদা। এটা কি সবার জন্য সত্যি? না। তাই বলে যে নাস্তার প্লেটে ডিনার খাচ্ছে তার খাবার বিস্বাদ বা মেনারলেস নয়। চিন্তা চেতনায় অভিনবত্ব। এটাকে কেউ রোধ করতে পারবে না।
বর্তমানে বাংলা ভাষাভাষীরা বাংলায় হাইকু লিখতে চাচ্ছে, বিতর্কের ঝড় উঠছে। মহাপ্রলয় ঘটছে। একদল উতসাহী কারিগর মনোযোগ দিয়ে হাইকুর বাগানে চারা গাছ লাগাচ্ছে ,পরিচর্যা করছে। এই যে নিরলস পরিচর্যা এর ফলাফল হবে আগামিতে অনেক হাইকু লেখক আসবে বাগানে ,জাপানের চেরি ব্লসম করতে । হাইকুর অন্তহীন বিতর্কের এক পক্ষ তো গোল দেবেই। নয় কি?
আদি হাইকুর রূপে যে অলংকার থাকে তা হলো, ৫/৭/৫ =১৭ সিলেবাল। অন্তমিল থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে। প্রথম লাইনের সাথে তৃতীয় লাইনের একটা বিপরীত চিত্রকল্প উজ্জ্বল সুর্য হয়ে রশ্মি ছড়াবে। জাপানিজ ভাষায় কিগো বা প্রকৃতির একটা বিশেষ রূপ প্রকাশ করতে হবে। আমরা প্রকৃতির মাঝে আছি। দিনরাত সুর্য, সকাল বিকাল, জল, নদী গাছ, পাতা, সবই তো প্রকৃতি। আর সিজন সেতো একেক দেশে একেক রকমের সিজন। বাংলাদেশে ছয় ঋতু, আমেরিকা,কানাডায় চার ঋতু। বৈচিত্র আর বর্ননা কত কোটিবার কত কবি লেখক নিজের মত করে লিখেছেন গল্পে, কবিতায়, নাটকে উপন্যাসে। ঋতুর কি তাতে কোন পরিবর্তন ঘটেছে? বিশ্ব জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। তাই ঋতুর পরিবর্তন ঘটছে। তাই কবিতার চেতনায় পরিবর্তন আসছে। কবির কল্পিত চিত্র কল্পেও পরিবর্তন স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক ধারাকে অনেকেই মানতে নারাজ। কেউ বলেন ,তিনি জন্মেই যে চাদর গায়ে দিয়েছেন,এখনো সেই চাদরই গায়ে দেবেন। মাপে হবে কি? বড় যে হয়েছেন, বৃক্ষ হয়ে যে কিছু ডালপালা গজিয়েছেন আয়না দেখে তাও কি বোঝেন না? না বোঝেন না। তাইতো বিতর্ক ওঠে। আর কিছু আছে চিন্তায় অক্ষম। লিখতে পারছে না দিলেন তর্কের ঝড়, সুনামী, সাইক্লোন তুলে যদি লাইম লাইটে একটু আসা যায়।
এ তো একজন হাইকুবিদের নিরীক্ষা। অন্যেরা কি বোকা? মুর্খ? তারা মাঠে নেমেছে চেরি ব্লসমে নতুন ও ভিন্ন ধরণের রঙ লাগাতে। জাপানিজ হাইকুর ট্রেডিশানাল উপাদান হলো Kiru and Kireji। সুনির্দিষ্ট নিয়ম।
জাপানিজ ভাষার সিলেবাল কে বলে morae., অন্য ভাষা থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন ইউনিট। কিন্তু ইংরেজী ভাষার থেকে আলাদা হয়ে যায়। স্বাভাবিক হিসাব ইংরেজ হাইকু লেখকেরা ইংরেজী ভাষায় এই মিটার বিবেচনা করেই লিখবে। আর যদি বাংলার কথায় আসি,তাহলে সব চেয়ে বড় যে কথা এসে সামনে প্লেট হাতে দাঁড়ায় তা হলো ছন্দের প্রকার ভেদ। যুক্তাক্ষর, বদ্ধাক্ষর, মুক্ত ছন্দ, স্বরবৃত্ত ছন্দ, অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, ইত্যাদি নানা জটিলতা। এইসব জটিলতার কচুরিপানার ভিড়কে ক্রমাগত চর্চার মাধ্যমেই সরিয়ে তো হাইকুর নৌকায় বৈঠা বেয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর যে বিতর্ক উঠাচ্ছে অন্যেরা তাদেরকেও সাধুবাদ জানাই যে এতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, ঢেউ ওঠে সমুদ্রে। ঢেউ তো সবার ভালো লাগে বেলাভূমে যখন পায়ে আছড়ে পড়ে।
তারপর আছে Kigo। বাংলায় কিভাবে লিখবো? কিগো,কেমন আছো? Kigo হলো শব্দের ফ্রেজ। আদিতেই এতোকিছু যোগ করেছে হাইকুবিদ।সেকি একদিনেই হয়ে গেছিলো? না ইতিহাসের পথ ধরে হাইকু হেঁটেছে বিদর্ভ নগরের পথে প্রান্তরে।
ভারতে উচ্চাঙ্গ সংগীতের বিভিন্ন ঘরানা আছে। প্রতিষ্ঠিত সকল ঘরানাই সুললিতভাবে খেয়াল শিক্ষা দেয়। কেউ কারো চেয়ে কম নয়। সবারই আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। হিন্দুস্থানী ক্লাসিকেলের রাগের চলনের সাথে কর্ণাটকের রাগের চলনে ভিন্নতা আছে। কিন্তু দুটোই শ্রোতার কানে সুধা ঢালে। এই কথাটাই ঘরানার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে। ইউসাকে যে মানবে তাকে এই নিয়মগুলো ফলো করে সাথে তার নিজস্ব চিন্তা ধারার ছাপ তৈরি করতে হবে। এবং সেটার নাম হাইকুই থাকবে। ‘এইকু’ ‘সেইকু’ হবে না। একবিংশ শতকেও ইউক্রেনে যুদ্ধ হচ্ছে। মানুষ মরছে। পৃথিবী হতবাক। বড় বড় ক্ষমতাশালীরাও হতবিহবল। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। আর হাইকু তো অতিক্ষুদ্র মিসাইল। তাকে নিয়ে আমরা বিতর্কের যে যুদ্ধে নেমেছি, সঠিক বেঠিকের যে দ্বন্দে আছি তা একদিন পরিস্কার আকাশে বসন্ত বাতাসে অনেক কৃষঞ্চুড়া ফুল ফোটাবে বাংলা ভাষায়। চেরি না থাকুক। আমাদের আছে কৃষ্ণচুড়া। লালে লাল হয়ে ফুটে থাকুক হাইকু বাগান ।
কিগো হাইকু
কবির মনে ভাব
বর্ণময় ইকু

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন