রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

তৈমুর খান-এর প্রবন্ধ


কবিতা বুঝতে না পারার মধ্যেও কবিতার ভালোলাগা বিরাজ করে 
কবিতা সবসময় বোঝার নয়, বাজারও। ভালো কবিতার ভালোলাগা থাকে, অনেক সময় সমালোচনা করা যায় না। এসব কথা আমরা হামেশাই শুনতে পাই। ভালোলাগার আবার ব্যাখ্যা কী! উপলব্ধির আবার ভাষা কী! ধ্বনির আবার অনুবাদ কী! সুতরাং সৌন্দর্যের যেমন মুগ্ধতা আছে তেমনি ভালোলাগারও শিহরন আছে। এসব ভাষাহীন এক রকমের পুলকিত নীরবতায় তা সর্বদা এক আবহ সৃষ্টি করে চলে।এই কথাটি সাহিত্য সমালোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ। আধুনিক ইংরেজি কবিতার জনক টি.এস. এলিয়ট (T.S. Eliot)-এর একটি বিখ্যাত উক্তির ভাবানুবাদ এটি: "Genuine poetry can communicate before it is understood."  অর্থাৎ সত্যিকারের কবিতা বোঝা যাওয়ার আগেই পাঠককে স্পর্শ করতে পারে। ​বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ বা বিনয় মজুমদারের মতো কবিদের ক্ষেত্রে এই কথাটি ধ্রুব সত্য।  এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা করি। 

কবিতা কেন না বুঝেও আনন্দ পাওয়া যায়?

কবিতা কেবল বুদ্ধির বা মস্তিষ্কের  বিষয় নয়, এটি অনুভূতির বিষয়। কবিতার আনন্দ পাওয়ার জন্য সবসময় 'মানে' বোঝার দরকার হয় না, এর কতগুলি কারণ আছে :

১)​ শব্দের সঙ্গীত :

 কবিতার শব্দের চয়ন এবং ছন্দের একটি নিজস্ব সুর থাকে। গানের ভাষা না বুঝেও যেমন আমরা সুরের মূর্ছনায় মুগ্ধ হই, কবিতার ক্ষেত্রেও শব্দের ধ্বনি (Soundscape) আমাদের অবচেতন মনে দোলা দেয়।

২) চিত্রকল্প বা ইমেজের শক্তি 

কবিরা অনেক সময় লজিক বা যুক্তি দিয়ে কথা বলেন না, তাঁরা ছবি আঁকেন। সেই ছবি বা 'ইমেজ' আমাদের মনের ভেতর এক অদ্ভুত আবহাওয়া তৈরি করে।

৩)অবচেতন মনের সংযোগ :

 কিছু কবিতা আমাদের যুক্তিবাদী মনকে (Conscious mind) পাশ কাটিয়ে সরাসরি আমাদের অবচেতনে (Subconscious) আঘাত করে। ফলে আমরা কারণ না জেনেই বিষণ্ণ বা আনন্দিত হই।


উদাহরণসহ বিশ্লেষণ

​বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য বাংলা সাহিত্যের দুজন বিখ্যাত কবির উদাহরণ নেওয়া যাক, যাঁদের কবিতা সব সময় 'বোঝা' যায় না, কিন্তু 'অনুভব' করা যায়।

১) জীবনানন্দ দাশ 

জীবনানন্দ দাশকে বলা হয় 'নির্জনতম কবি'। তাঁর অনেক কবিতার লাইন লজিক দিয়ে বোঝা কঠিন, কিন্তু পড়ার পর এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা তৈরি হয়। ‘বনলতাসেন’ কবিতায় তিনি লিখেছেন :

​"চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য..."

​বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই,এখানে ‘বিদিশার নিশা’ বা ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’ বলতে কবি ঐতিহাসিকভাবে বা ভৌগোলিক ভাবে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, তা না জানলেও একজন পাঠকের অসুবিধা হয় না। ওই ‘অন্ধকার’, ‘নিশা’ এবং ‘কারুকার্য’ শব্দগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে এক প্রাচীন, রহস্যময় এবং রোমান্টিক আবহ তৈরি হয়। পাঠক অর্থের গভীরে না গিয়েও সেই রহস্যময় নারীর সৌন্দর্য অনুভব করতে পারেন।

কবিতা যে সবসময় ‘কাটাছেঁড়া’ বা ‘সমালোচনা’ (Criticism) করার বিষয় নয়, বরং কেবল ‘অনুভব’ করার বিষয়—এটা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।  জীবনানন্দ দাশের আর একটি বিখ্যাত এবং ছোট কবিতা ‘হায় চিল’-কে উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক।​এই কবিতাটি যুক্তিবাদী মন দিয়ে বিচার করতে গেলে অনেক প্রশ্ন জাগবে, কিন্তু অনুভব করতে গেলে এক গভীর বিষাদে মন ভরে যাবে।


হায় চিল 

"হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!

তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!

পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;

আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে

বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!"

যদি এই কবিতার ‘সমালোচনা’ বা ‘ময়নাতদন্ত’ করি তবে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য। ​যদি একজন কঠোর সমালোচক বা যুক্তিবাদী পাঠক এই কবিতাটি পড়েন, তিনি নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো তুলতে পারেন এবং হতাশ হতে পারেন:

যুক্তি ১: চিল কি সত্যিই কাঁদে? চিলের ডাককে ‘কান্না’ বলা কি জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক?

যুক্তি ২: চিলের ডাকের সঙ্গে ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’-এর সম্পর্ক কী? বেত ফল তো এক ধরনের ফল, তার সঙ্গে চোখের তুলনা কেন?

যুক্তি ৩: সেই নারীটি কে? ‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যা’ বলতে কবি ঠিক কোন ঐতিহাসিক চরিত্র বা কাকে বুঝিয়েছেন? তিনি কোথায় চলে গেছেন?

 আসল ফলাফলে ​কেউ যদি এই কবিতার প্রতিটি লাইনের আক্ষরিক অর্থ বা লজিক খুঁজতে যান, তবে তিনি বলবেন— "এই কবিতার কোনো মাথামুণ্ডু নেই, অস্পষ্ট সব উপমা।" সমালোচনার টেবিলে এই কবিতা অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে কারণ এতে কোনো নির্দিষ্ট 'গল্প' বা 'তথ্য' নেই।

​ কেন কবিতাটি ‘না বুঝেও’ অসামান্য? অনুভবের ব্যাখ্যায় তা ধরা পড়বে। ​কবিতাটি পড়ার সময় পাঠক যখন লজিক বা সমালোচনা সরিয়ে রাখেন, তখন তিনি এক আশ্চর্য জগতে প্রবেশ করেন। এখানে অর্থ বোঝা জরুরি নয়, যা জরুরি তা হলো:

​ভিজু্যয়াল এবং অডিটরি এফেক্ট (Visual & Auditory Effect): ‘ভিজে মেঘের দুপুর’—এই তিনটি শব্দ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের মনে একটি স্যাঁতসেঁতে, মেঘলা, অলস দুপুরের ছবি ভেসে ওঠে। চিলের তীক্ষ্ণ ডাক সেই নির্জন দুপুরে এক হাহাকার তৈরি করে। এখানে বোঝার কিছু নেই, পুরোটাই অনুভবের।


অদ্ভুত উপমা (The Abstract Imagery): ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’—এর অর্থ অভিধানে পাওয়া যাবে না। কিন্তু পাঠক অবচেতনভাবে অনুভব করেন এমন এক চোখ, যা হয়তো অসুস্থ, ক্লান্ত, বা মৃত্যুর আগের নিস্তেজ চাহনি। বেত ফলের ফ্যাকাশে রঙের সঙ্গে চোখের মণির এই তুলনা পাঠককে এক ধরনের ‘বিষণ্ণ সৌন্দর্য’ উপহার দেয়।


স্মৃতি ও বেদনা (Nostalgia & Pain): কবিতার শেষ লাইন— "কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!"—এটি সর্বকালের এক অমোঘ সত্য। এখানে কবি নির্দিষ্ট কোনো নারীর কথা বলছেন না। চিলের ডাকের মতো কোনো একটি সামান্য ঘটনা আমাদের মনে পুরোনো কোনো হারানোর ব্যথা জাগিয়ে তোলে। পাঠক তখন আর কবির প্রেমিকার কথা ভাবেন না, তিনি নিজের জীবনের কোনো হারানো মানুষের কথা ভেবে ব্যথিত হন।

 সুতরাং ​এই কবিতাটি প্রমাণ করে যে, কবিতা সব সময় ‘মস্তিষ্ক’ (Intellect) দিয়ে বিচার করার জিনিস নয়। এই কবিতাটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে, কারণ এর আবেদন ‘স্নায়ু’ (Nerves) এবং ‘হৃদয়ে’। ​যেমন সুন্দর একটি ফুলকে ছিঁড়ে পাপড়ি আলাদা করে গবেষণা করলে (সমালোচনা) তার গঠন বোঝা যায়, কিন্তু সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে যায়—তেমনি জীবনানন্দের এই কবিতাটির অর্থ খুঁজতে গেলে এর জাদু নষ্ট হয়ে যায়। এটি কেবল চুপচাপ পড়ে সেই ‘ভিজে মেঘের দুপুরের’ বিষাদটুকু গায়ে মাখার জন্য সৃষ্টি হয়েছে।


২) শক্তি চট্টোপাধ্যায় 

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা 'অবনী বাড়ি আছো?' এর কথা ধরা যাক।

​"বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস

এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে

পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস

দুয়ার চেপে ধরে–

‘অবনী বাড়ি আছো?’”

যুক্তির বিচারে কোথাও কি বারোমাস বৃষ্টি পড়া সম্ভব? বা মেঘ কি গাভীর মতো ঘাস খেতে  পারে? সবুজ নালী ঘাস কি পরাঙ্মুখ হতে পারে দুয়ার চেপে ধরে? অবনীই বা কে?

লজিক খুঁজলে এর উত্তর মিলবে না। কিন্তু কবিতাটি পড়ার সময় পাঠকের মনে এক গভীর একাকিত্ব এবং বিষাদের সুর বেজে ওঠে। দরজায় কড়া নেড়ে কেউ যেন নিজের অস্তিত্বের খোঁজ নিচ্ছে— এই হাহাকারটুকু বোঝার জন্য পুরো কবিতার প্রতিটি শব্দের আভিধানিক অর্থ বোঝার প্রয়োজন হয় না।


৩) সুকুমার রায় (ননসেন্স রাইম)

সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো সুকুমার রায়ের “আবোল তাবোল”

​"সাঁঝের বেলায় জলার তলে

কালকে যারা আমায় বলে

করত রে ভাই চিম্‌নি-চালি,

আজকে তারা দিচ্ছে গালি!"

'হুকোমুখো হ্যাংলা' বা 'কুমড়োপটাশ'-এর অস্তিত্ব বাস্তবে নেই, এবং তাদের কার্যকলাপের কোনো বৈজ্ঞানিক অর্থও নেই। কিন্তু এই ছড়া পড়ার সময় যে অদ্ভুত রিদম বা ছন্দ তৈরি হয়, তাতেই আমরা আনন্দ পাই। এখানে 'অর্থ' গৌণ, 'ধ্বনি' এবং 'মজা'টাই মুখ্য।

​কবিতার কাজ সবসময় কোনো তথ্য দেওয়া নয়, বরং একটি 'মুড' (Mood) বা মেজাজ তৈরি করা। যখন কোনো কবিতা পড়ে আপনার মনে হয়— "জানি না কী আছে এতে, কিন্তু মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল বা ভালো লাগল"— তখনই বুঝতে হবে কবিতাটি সার্থক। অর্থ বা 'মানে' হলো হাড়ের কাঠামোর মতো, আর আনন্দ বা 'রস' হলো রক্তের মতো; হাড় না দেখেও যেমন মানুষের সৌন্দর্য বোঝা যায়, তেমনি অর্থ না বুঝেও কবিতার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন