মিথ্যার বহুমাত্রিকতা
উপনিষদ ও ভারতীয় দর্শনের আলোকে মিথ্যা হল মায়াময় জগত। যা দেখায় তা আসলে নেই। মিথ্যার বিপরীতে আছে সত্য। সত্য মানে ব্রহ্ম, চিরন্তন। সত্যের প্রতিপক্ষ হল অসত্য অর্থাৎ যার অস্তিত্ব নেই।
শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত দর্শনে মিথ্যা হলো: "সৎ ন, অসৎ ন — মিথ্যা"। যা পুরোপুরি সত্য নয় আবার পুরোপুরি অসত্যও নয়। জগৎকে দেখি, ব্যবহার করি, কিন্তু এটি স্থায়ী বা চিরন্তন নয় আসলে মিথ্যা।
ভারতীয় দর্শন, পুরাণ এবং সাহিত্যে মিথ্যার তাৎপর্য অনেক গভীর ও বহুস্তরীয়। মিথ্যা কখনও বিভ্রান্তি, কখনও কৌশল, কখনও শোষণের মুখোশ, আবার কখনও করুণার পর্দা।
পুরাণে ‘মিথ্যা’কে আশ্রয় করে অনেক কাহিনী গড়ে উঠেছে যেমন রামায়ণে মারীচ রাক্ষস সোনালী হরিণের রূপ ধরে রামের কুটিরে সামনে আসে। এবং রাবণকে সীতা হরণে সাহায্য করে। আজকের দিনে মিডিয়া কিন্তু মারীচের মতো মানুষকে বিভ্রান্ত করে বা মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেয়।
মহাভারতের যুদ্ধে “অশ্বথামা হত ইতি গজ” এই বাক্যটি সত্য মিথ্যার সীমারেখায় অবস্থিত একটি আংশিক সত্য যার উদ্দেশ্য বিভ্রান্ত করা। সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরও মিথ্যাকে আংশিক উচ্চারণ করেন। এর ফলে দ্রোণাচার্য বিশ্বাস করেন তাঁর পুত্র অশ্বথামা নিহত, এবং অস্ত্র ফেলে দেন। আজকের দিনে রাজনীতিতেও অর্ধ সত্য বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।
ইতিহাসে আমরা দেখছি একসময় ধর্মীয় বিভেদ বা সংঘর্ষ প্রায় ছিলই না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুবিধার্থে বিভেদের গল্পগুলি মিথ্যা বানিয়ে বলা হয়।
নারীর ইতিহাস মুছে ফেলা এক ধরণের সাংস্কৃতিক মিথ্যা । ‘institutional erasure’ একটি কৌশল ।
লড়াই করা পুরুষের নাম থাকে লড়াই করা মহিলাদের নাম মুছে দেওয়া হয়। স্ত্রী লেখকদের অনেক সময় পুরুষ লেখকের নাম দিয়ে লিখতে হয়েছে (উদাহরণ: মেরি অ্যান ইভান্স লেখেন জর্জ এলিয়ট নামে ) পরিবারেও সন্তান তার মাতৃ পরিচয় হারায়। বিয়ের পরে পদবী বদলে নিজের পরিচয় হারায়। কারো কারোর মতে ‘মেয়েরা নিজেরাই কবিতা। মেয়েরা কবিতা লিখতে পারে না’ এ সব কথাকে মিথ্যা প্রমাণ করে মেয়েরা কবিতা লিখছে এবং ভালো লিখছে। গেজ তত্ত্বে দেখব যে মেয়েদের শারীরিক সৌন্দর্য ও যৌন আবেদনকে বাড়িয়ে বলা এবং পাশাপাশি দুঃখ বা সংগ্রামকে গোপন করা হয়। এই মিথ্যা বিকৃতির একটি রূপ ।
যুদ্ধের ইতিহাসেও এক রকম ভাবে বিজয়ীরা লেখে। তাই অনেক কিছুই গোপন করা হয়। মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসাবে দেখা হয়। আমরা আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এখন দেখছি মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস , স্মৃতি চিহ্নগুলি মুছে দেওয়া হচ্ছে। ইরাক যুদ্ধে (২০০৩) যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের দাবী অনুযায়ী ইরাকের কাছে গণবিদ্ধংসী অস্ত্র ছিল বলা হয়েছিল। পরে দেখা গেছে সে খবর ভিত্তিহীন। যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র গণমাধ্যম শত্রু দেশকে বিকৃত ভাবে উপস্থাপন করে নিজেদের বীর গাথা প্রচার করে।
বৈজ্ঞানিক মিথ্যা অনেক সময় অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানেরও দায়বদ্ধতা থাকতে হবে সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে এর উলটো ছবি দেখা যায় । ১৯১২ সালে এক নতুন প্রজাতির মানুষের কথা বলা হয়েছিল। পরে দেখা যায় সেটি মানুষ ও বানরের কঙ্কাল জোড়া দিয়ে বানানো হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইত্যাদির গর্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জাল কঙ্কাল বানানো হয়েছিল।
তামাক সেবন ক্ষতিকারক অনেক আগেই প্রমাণিত কিন্তু বাণিজ্যিক কারণে তা অনেক পরে জনসম্মুখে আসে।
অনেক সময় দেখা গেছে একজন আবিষ্কার করেছেন অন্যজনের নাম হয়েছে ।
পরিবেশ বাঁচাও নাম করে নিজেদের পণ্য বিক্রি উদ্দেশ্য হয়ে যায় । মিথ্যা প্রোপাগান্ডা করে উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করছে বড় বড় কোম্পানী। গাছ কেটে নাম মাত্র গাছ লাগানো হয়।
আমরা যদি সাহিত্যের দিকে তাকাই দেখব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “রক্তকরবী” নাটকে মিথ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক, নৈতিক ও দার্শনিক স্তরে প্রতীকরূপে দেখানো হয়েছে। শুধু ভাষাগত অসত্য নয়, বরং ক্ষমতা, লোভ, নিপীড়ন ও ভয়ের এক ছদ্ম-বাস্তবতা, যা সত্যকে আড়াল করে রাখে। রাজার অস্তিত্ব ও তার উপস্থিতি নেই, কিন্তু তার হুকুম, তার খনির স্বর্ণলোভ, তার ভয়—সর্বত্র বিরাজমান। এখানে মিথ্যা-আতঙ্ক, যার মাধ্যমে প্রজারা নিয়ন্ত্রিত হয়। দরবারের ভাষা, আইন ও শাসন — এক সামাজিক মিথ্যে নাটকে রাজসভার কর্মচারীরা সত্যকে আড়াল করে, মিথ্যে নিয়ম ও আইন তৈরি করে মানুষের উপর শোষণ বজায় রাখে। মিথ্যের বিরোধী শক্তি নন্দিনী চরিত্রটি । অন্যদিকে যারা সত্য জানে, তারা চুপ — এটি আরেকটি বিপজ্জনক মিথ্যে।
কবিতায় কল্পনার অবয়বে অনেক মিথ্যা বলা হয় যেগুলো সত্যকে আরও গভীর করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেতনায় একটি আভিজাত্য পূর্ণ মিথ্যা বা নান্দনিক মিথ্যা এরকম হতে পারে
‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে।/ আমি চোখ মেললুম আকাশে,/ জ্বলে উঠল আলো/ পুবে পশ্চিমে।/ গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',/ সুন্দর হল সে।/ তুমি বলবে, এ যে তত্ত্বকথা,/ এ কবির বাণী নয়।/ আমি বলব, এ সত্য,/ তাই এ কাব্য।/ এ আমার অহংকার,’
“ সত্যি মিথ্যায় জড়ানো জগৎ । মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা। যারা যাদব ও পাগল দিদির পদধূলি মাথায় তুলিয়া ধন্য হইয়াছিল , তাদের মধ্যে কে দুজনের মৃত্যু রহস্য অনুমান করিতে পারিবে? চিরদিনের জন্য এ ঘটনা মনে গাঁথা হইয়া রহিল, এক অপূর্ব অপার্থিব দৃশ্যের স্মৃতি দুঃখ যন্ত্রণার সময় এ কথা মনে পড়িবে’’
যাদব ও পাগল দিদির (আফিম খেয়ে) স্বেচ্ছা মৃত্যু প্রসঙ্গে এই কথা গুলিও তেমনই সত্যি।
(‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ - মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়)
বহুদিন ধরে চলে আসা বাংলা প্রবাদ বাক্যগুলো দেখব -
-মিথ্যা বলিয়া কেহ বড় হয় না/-মিথ্যা কথা হাজার বার বললেও সত্য হয় না/-সত্যের জয়, মিথ্যার পরাজয়
সংস্কৃত প্রবাদে (সত্যমেব জয়তে, নানৃতম)/— সত্যেরই জয় হয়, মিথ্যার নয়। (মুন্ডক উপনিষদ)
প্রবাদগুলো আমাদের জানায়: মিথ্যা ক্ষণস্থায়ী, মিথ্যার উপর সমাজ-সম্পর্ক-আস্থা গড়া যায় না, মিথ্যা যতোই ছদ্মবেশ নিক, একদিন উন্মোচিত হবেই। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এই সব প্রবাদ প্রচলিত হয়।
স্কিতজোফ্রেনিয়া একটি অসুখ । সেখানে দেখা যায় রোগী অনেক মানুষের কথা শুনতে পায়। অনেক গল্প বলে । হ্যালুসিনেট করে। মিথ্যাগুলো ওই মুহূর্তে রোগীর কাছে সত্যি।
মিথ্যা কখনও মানবিক হয়। কাউকে প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ দেয়ার সময় তাকে প্রস্তুত হওয়ার সময় দেয়ার জন্য মৃত না বলে বলি গুরুতর আসুস্থ। রোগীকে শান্ত থাকার জন্য অনেক সময় মিথ্যা বলা হয়। রোগ সারবে না জেনেও তাকে আশ্বাস দিই যে সেরে উঠবে । নৈতিক দিক থেকে দেখলে এই মিথ্যাগুলি প্রশ্নবিদ্ধ নয় । কোথাও কোথাও মানবিক রক্ষকবচ হিসাবে কাজ করে। পরিবারের মধ্যে মায়েরা সব থেকে বেশি মিথ্যা বলেন । খাবার আয়োজন কম থাকলে পরিবারের সবাইকে খাইয়ে নিজে না খেয়ে বলেন খেয়েছি বা আছে।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা নিজেরাই নিজেকে প্রতারণা করি। ভাবি আমাকে সে ভালোবাসে কিংবা আমার যা আছে তাতেই আমি খুশি। অথচ জানি সম্পর্কটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এই আত্ম প্রতারণাও মিথ্যার নামান্তর।
আজকের দিনে সোস্যাল মিডিয়ায় যা দেখা যায় বাস্তবের সঙ্গে তার মিল অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না এটা সামাজিক মিথ্যা। সেলফি তোলার সময় একটা মিথ্যা হাসি ঝুলিয়ে রাখে মানুষ । মুখোসের আড়ালে প্রকৃত মুখ আর চেনা যায় না। ‘পাশে আছি’ ‘শুভেচ্ছা বার্তা’ র বন্যা দেখা দেয় কমেন্ট বক্সে। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধু খুবই কম।
আমরা যদি সিনেমা বা নাটকের অভিনয়ের কথা ভাবি সেখানে দেখব সত্যি সত্যি কিছুই না তবু আমাদের কান্না আসে, হাসি পায়। অভিনেতারা অভিনয়ের মাধ্যমে এতটাই সুন্দর উপস্থাপনা করেন যে মিথ্যা জেনেও আমাদের প্রতিক্রিয়াটি কিন্তু সত্যিই হয় । এই মিথ্যা কোনো এক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে।
ধর্মীয় আবেগ এবং কুসংস্কার অনেক বিভ্রম তৈরি করে। ১৯৯৫ সালে গণেশের দুধ খাওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল । আসলে এটি ছিল capillary action (ক্যাপিলারি ক্রিয়া) ও surface tension (পৃষ্ঠটান) এই দুই কারণে বিভ্রম সৃষ্টি হয়েছিল। সমাজ অনেক সময় এই ধরণের মিথাকে অলৌকিক বলে চালিয়ে দেয়। সন্তোষী মা প্রাচীন হিন্দু দেবী নন। ১৯৭৫ সালের একটি সিনেমা ‘ জয় সন্তোষী মা’ থেকে পরবর্তীতে ব্যপাক ভাবে ছড়িয়ে পড়েন। এটি নতুন লোক বিশ্বাস। কেউ যদি মরা মরা" বলতে বলতে থাকে, মুখের ধ্বনি বদলে "রাম রাম" হতে পারে। বারবার কোনো কথা বললে অবচেতন মনে ঢুকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ‘মিথ্যা’ বিশ্বাস বা বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাতের আকাশে তারা দেখি। অনেক আলোকবর্ষ পেরিয়ে আমাদের চোখে যখন ধরা দেয় তখন অনেক তারা হয়তো মৃত । সূর্যাস্তের সময় সূর্যকে লাল বলের মতো দেখি তা আসলে এটি বিজ্ঞানভিত্তিক মিথ্যা কারণ সূর্যাস্ত সত্যি সত্যি ঘটে না। দৃশ্যগত মিথ্যাও কত কবিতা গান ছবির জন্ম দেয়। এভাবে মিথ্যারা একদিন সত্যি হয়ে যায় ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন