জল, তোমাকে...
জল, কাকচক্ষু-মোহ পরিত্যাগ করো
এই কালখণ্ডে কেউই জলের আয়নায় নিজেকে দেখে না
তোমার প্রবাহে সাঁতার কাটে যারা, অবগাহনে মত্ত হয়
তারা কেউই তপস্বী নয়, ঋষিসুলভ উদাসীন পোশাক
আর নির্বিকার মুখোশের আড়ালে ওরা সবাই
তমসা-বিহারী, সৌন্দর্য নিধনে উল্লসিত হয়
ওই যে — তোমার নির্মোহ নির্জনতায়
পাশাপাশি বসে আছে ওরা —
একে অপরের ভেতর নিজেকে খুঁজছে, ওদের
তোমার অনন্তপয়ারের সঙ্গে যুক্ত করো, নতুন শব্দের
আধার হয়ে প্রবাহিত হও, আর সংলাপহীন
নয়, মুখরিত হও — নিজেকে উপচে তোলপাড় ঢেউ তোলো
বহুবর্ণ ঢেউ ওদের যুগলবন্দিশের নোটেশন হোক
তুমি বাঁক নিয়ে মাত্রাবৃত্তের ঝুলবারান্দা থেকে দূরে
যেখানে এসেছ — এ তোমার
স্বপ্নের তপোবন নয়, হিংসায় উন্মত্ত নৃশংস
শিকারিদের চারণভূমি
এখানে তোমার ঘাটে জল খেতে আসা
বাঘ এবং হরিণ — কেউই যে নিরাপদ নয় সেই সত্য কি
জল, তুমি জানতে পেরেছ? জেনেছ কি
এখানে আহুতিমন্ত্র নয়, হুক্কাহুয়া
যাপন-প্রবচনে রূপান্তরিত হয়
শব্দের আধার, কবিতার উৎস তুমি যে শিকারিদের পাতা
ফাঁদ হয়ে উঠেছ — এহেন বিচ্যুতি, আত্মবিচ্ছেদ
তোমাকে মানায় না, ভাবতে পারছ কি?
ওই কারা যেন কোনো কারণ ছাড়াই
কাকচক্ষু তোমাকে ঘোলা জলে পালটে দিতে চায়
ওদের পিছনে অপেক্ষা করছে তারা
যারা ঘোলা জলে মাছ ধ'রে পরমানন্দ, যেন-বা
মোক্ষলাভ অনুভব করে
আর মৃদুমন্দ সহজ-প্রবাহ নয়, অশান্ত-উত্তাল হও
তোমার বহুস্তরীয় রূপকথায় মাছ বাঁচুক মাছ হয়ে
জলের বাহিরে মাছ বাঁচে না ঠিকই
জলও কি মাছ ছাড়া জল হয়ে উঠতে পারে?
*** *** ***
জল, তোমার কি পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে, জন্মচক্রের
বাষ্পীভূত অনিশ্চিত অভিযাত্রাপথে
বাংলা কবিতায় অনুপ্রবেশ, কবিতার রহস্যময় স্পেসে
তোমার ও নাসেরের সেই চির-অসম্পূর্ণ আলাপচারিতা —
নান্দনিক উচ্চারণের চিরকালীন ভাষ্যগুলি, মনে পড়ে ?
কিংবা মেঘজন্ম — ঋতুমুগ্ধ হাওয়ায়
ভেসে যেতে যেতে খরাক্রান্ত প্রান্তরের আকাশে থমকে গেলে
বুকে একফোঁটাও জল সঞ্চিত নেই, বৃষ্টি হতে না-পারার
তোমার অসহ যন্ত্রণা টের পেয়েছিল যে কবি
তোমাকে বৃষ্টির শরীরে বিনির্মাণ করেছিল তার ছন্দভাঙা ছন্দের
পাণ্ডুলিপিজুড়ে — সেই কবিকে অবশ্য
তোমার মনে থাকার কথা নয়, তবে
তাকে নিশ্চয় মনে রেখেছ —
বিকেলের ছাদে নিজস্ব নির্জনতায়
অপেক্ষায় ছিল মেঘমল্লার মোডে, তুমিও অসময়ের শ্রাবণ হয়ে
তাকে পরিপূর্ণ অবগাহনে নিষিক্ত করেছিলে
সেই অভিসার-স্মৃতি, আনন্দ নাকি বিষাদ — কোন অনুভাবে
বহন করছ তুমি, জানি না, জানতে চাই এমনও নয়
যদিও এই নিয়ে নন্দনকাননের আনাচকানাচে বহুমাত্রিক ফিশফাশ কান না-পাতলেও
কানে এসেই যায়
আচ্ছা, তোমার দু-পাড়জুড়ে সাঁকো নির্মিত হয়েছে
তারপরও ওরা মাঝির খোঁজ করে, কেনই-বা
তোমাকে ছুঁয়ে থাকা নৌকোতেই ওদের
পারাপার, এ বিষয়ে তোমার পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে
তুমি কী বলবে ? সাঁকো ও নৌকোর সঙ্গে
তোমার সম্পর্ক-রসায়ন জানতে সত্যিই আমি কৌতূহলী
মধ্যরাত্রিতে সাঁকো ও নৌকো ঘুমিয়ে পড়লে তুমি কি একাই
শব্দহীন জেগে থাক, নাকি কক্ষচ্যুত
অবিন্যস্ত হলুদ নক্ষত্রটি নেমে এসে তোমাকে মহাকাশের নক্ষত্রযাপনের অশ্রুতপূর্ব কেচ্ছা শোনায়
*** *** ***
জল, ওরা চির-ব্যর্থমনোরথ, তোমার অতলে আত্মবিসর্জন দিয়ে
পুনর্জন্ম পেতে চায় কবিতার নতুন ভুবনে
ওরা এজন্মের সাঁতার ভুলতে চায়
তোমার সহজিয়া নির্লিপ্ত প্রবাহ ভুলতে দিচ্ছে না, অথচ
আত্মবিসর্জনের সময় অতিক্রান্তপ্রায়, আর
বিলম্ব নয়, তুমি দু-পাড় ভাসানো তীব্র জোয়ার ডেকে আনো
প্লাবনের চোরাস্রোত আর ঘূর্ণির অব্যর্থ টানে
জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী মোহনায় বিপজ্জনক প্রতিধ্বনি হও
আত্মবিসর্জনে উন্মুখ ওদের মুক্তির দিশারি
প্রিয় হন্তারক হয়ে ওঠো
ওরা আর কিছুতেই ওদের জন্মান্ধ শিবিরের
বিষাদগাথায় ফিরবে না
সব মেঘই বৃষ্টি হয় না জানি, তবে এও জানি ---
মেঘ ও বৃষ্টির দ্বৈত উচ্চারণে অজস্র নতুন শব্দ ঝরে পড়ে
কবিতার শূন্যতায়, সে যা-হোক, দ্যাখো
তোমার আকাশে একখণ্ড মেঘ মুচকি হাসছে,এখনই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে --- তুমি শরীর ও মনের সর্বস্ব উজাড় করে
স্বতঃস্ফূর্ততায় ওকে স্বাগত জানাও
আলিঙ্গন করো, পূর্ণ চিত্তের নিত্য-আকুলতায়
সমর্পণের এক নতুন অধ্যায় রচিত হোক...
পাদটীকা : সবাই বলাবলি করছে, ইতিমধ্যেই নাকি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন