কবি প্রাণজি বসাক
বাংলা ভাষার প্রখ্যাত ভারতীয় কবি প্রাণজি বসাক বিগত পাঁচ দশক ধরে কবিতাচর্চায় নিয়োজিত। এই মানুষটি আদ্যোপান্ত বাংলা কবিতায় ডুবে থাকতে ভালোবাসেন। পেশাগত কারণে প্রায় ৪৫ বছর ধরে দিল্লিপ্রবাসী। তিনি ২৮ টি কাব্যগ্রন্থ, ৩ টি সম্পাদিত, ২ টি গল্পগ্রন্থ / রম্যরচনার বই সহ মোট ৩৩ টি গ্রন্থ রচনা করেছেন । আত্মজ মায়াজাল, রুটিনের মুড়ি ও নিমগাছ, অস্বাক্ষরিত গোপন চুক্তি, দেখি এক অন্যমানুষ, ইউটিউব ও লালটিপ,রূপবৃত্তে ছায়াবৃত্তে, মানুষে মানুষে সহ তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থে মানবধর্মী ভাবনা, সমাজ চেতনা ও মুক্তির খোঁজ পাওয়া যায়। কবি প্রাণজি বসাকের কবিতার স্বতন্ত্র ভাষা, বুনন ও বাচনভঙ্গি অন্য কবিদের থেকে ভিন্নতা এনে দেয়। দিল্লির বাংলা সাহিত্য আন্দোলনের শরিক হিসেবে কবি প্রাণজি বসাক সেখানকার কবিদের কবিতা নিয়ে সম্পাদনা করেছেন - ১) দিল্লি হাটার্স কবিতা সংকলন ২) দিল্লির নির্বাচিত বাংলা কবিতা। এই দুটি সংকলন থেকে পাঠক দিল্লিতে বাংলা কাব্যচর্চা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করতে পারেন। বাংলা কবিতা নিয়ে তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশসহ বাংলাদেশ ও ইউরোপ ভ্রমণ করেছেন বেশ কয়েকবার। কবিতার প্রতি তীব্র ভালোবাসায় তাঁর নিজস্ব এবং সাবলীল উচ্চারণ - জয় বাংলা কবিতার জয়।
বিভিন্ন সময়ে পেয়েছেন সাহিত্য সন্মান ও পুরস্কার।
আন্তর্জাতিক রূপসী বাংলা পুরস্কার, বনানী পুরস্কার , ভারত- বাংলাদেশ সাহিত্য সংহতি পুরস্কার, শৃন্বন্তু সারস্বত সম্মান, উত্তর বাংলা পদক, তিনবাংলা সম্মাননা, খড়গপুর বইমেলা সম্মাননা ২০২২, ডাঃ রূদ্রকুমার ঈশ্বরারী স্মৃতি সম্মাননা পুরস্কার ২০২২-২৩, দূরের খেয়া জয়াপদ ভট্টাচার্য স্মারক কবিতা পুরস্কার ২০২৩, অর্কিড সৃজনী সম্মান ২০২৫ উল্লেখযোগ্য এবং বাসভূমি জীবনকৃতি পুরস্কার ২০২৫।
রোদ খেলা
ভোর হয় পাখি ডাকে ধানবাদে
বিছানায় খুলে রাখা রোদে খেলা
অপূর্ব সুন্দর একটা সময়ে
ডোরবেল নয় সোজা অনুবাদে
নৈঃশব্দ্যে অনুপ্রবেশ পরাবত
সিঁদুরমেঘে কী আর সন্দিহান
সে এক এমন মুহূর্ত আবেশ
গোলাভরা ধান গূঢ় গবেষণা
আশা করে বসে থাকা গ্রীষ্ম বর্ষা
আমাদের শ্বাস পড়ে মাঘ শীতে
উষ্ণ অভ্যর্থনা কতভাবে নিলে
মাঠময় দৌড়ে যাই তীব্র সুখে
ভুলে যাই নীল দুখ পরম্পরা
শিরা উপশিরা উপজিব্য জৈব
ক্রিয়াশীল গতিবেগ থেমে পড়ে
অনুবাদে রাখা মৌন বাক্যভাষা
মায়াজাল ছিঁড়ে চলে যায় মন
গাঢ় রঙে চোখ তুলে রাখা প্রশ্ন
নির্জনে নির্বাক সম্মতি প্রশ্রয়
আশা রাখা যায় রোদের খেলায়
শুধু কাল হেরি
দু’পা তুলে বসে আছ ওহে বন্ধু
নামো দেখি বিশ্ব জুড়ে চাঁদ ওঠে
গান ধরে রাতজাগা পাখি ঐ যে
সুরে নেই খামতি যেমন ঝাঁঝে
প্রান্তর জুড়ে খামোশ অবশেষে
তুমি আর আমি শুধু কাল হেরি
জীবন্ত মাছের মত লাফ দিই
একজন এসে ঘাড় ধরে পড়ে
আমার আস্ফালন থমকে যায়
দম নিতে চাই পারি না যখন
আসমান পাক খায় বেসামাল
চোখে অন্ধকার নেমে আসে যত
সলতের পোড়া গন্ধে সন্ধেবেলা
অহেতুক নয় আসা ফিরে ফিরে
এক কাপড়ে জড়িয়ে দীপ হাতে
তুলসীতলায় মন বসে না হে
তবুও গৃহকর্মেনিপুণা হও
বাঁকা চাঁদ ওঠে রূপ গলে পড়ে
ভাল বাসা
চোখে ওঠে প্রিয়তম হাসিমুখ
ফালা ফালা করে দেয় চেনা সব
নাম না করেই বলি ইশারায়
এসো চাঁদ মরে গেলে নেশা লাগে
নেতাদের ঘুম আসে নাই রাতে
দেশটারে খায় তারা দিনে দিনে
জনগণমন পিছে পিছে ঘোরে
ভোর হয় রোদ ওঠে সন্ধ্যা হয়
কামে যায় দিন ঘাম ঝরে রাতে
কেউ কয় সত্য কেউ কয় মিথ্যা
কেউ কয় প্রেম কেউ ভালোবাসা
কেন যেন কম্প ওঠে তুমি বন্ধু
দিনকাল যা পড়েছে অবিশ্বাস্য
ঘনঘটা বেশ লোভনীয় আশ
বাঞ্ছারাম সাজায় বাগান বসে
কেউ তোলে ফুল কেউ তোলে ফল
জল বয়ে চলে নদী দেখে চেয়ে
জীবনটা জানি বড় মায়াময়
আখের গোছাতে ব্যস্ত কিছু জন
হাইওয়ে ধরে ছোটে ধারাপাত
অঙ্ক মেলে না কিছুতে আজকাল
তবু রোদ পড়ে গেলে ছোটে ঘরে
রাতের আঁধারে কয় মন-কথা
ছু্ঁয়ে থেকে রাত জাগে আনমনা
স্বপ্নে কথা কও নাম ধরে ডাকো
কার ডাকে সাড়া দাও সারাক্ষণ
আমি হেরে আছি তুমি জিতে নিলে
হারজিত বড় দেখি গোলমেলে
তলে তলে কলকাঠি নেড়ে জেতে
ঈশ্বর জানেন ভালমন্দ খেলা
অনায়াস যাত্রা
কী অনায়াসে জেব্রাক্রসিং পেরিয়ে ফিরে তাকাও
নজরে আসে শাদা পায়রার খসে পড়া পালক —
বাজেয়াপ্ত নকশার মত বুড়োনিমের ছেঁড়া ছায়ায়
বাগান বসেছে হেমন্তের শেষবেলায় দেদার গল্পের
কথামতো কথারা এসে টেনে দেয় বাৎসরিক দাগ
আদচিনি বাজারে মনখারাপের টিউন বাজে কণ্ঠে
ওঠানামা করে কতকিছু বদল হয় বাহানা আড়ালে
থেমে থেমে লাল-সবুজের নৃত্যগান হলুদের প্রশ্রয়ে
দফায় দফায় যখন আরও হুমকি বার্তা নিশ্চুপ হয়
কী অনায়াসে ঢুকে যাও গ্রামারে অপূর্ব এক সন্ধ্যায়
সরল দিনে
বুঝি না বুঝি একটা সরল দিনে বদলে গেল ভাষা
ভাবনার খেই ধরে হারিয়ে ফেলি আখ্যান তারপর
এইতো সময় খানিক দাঁড়ায় বুঝি নিয়মের বাইরে
তোমাকে কতবার বলেছি একটু শ্লোকের মত থাকো
সর্বংসহা পৃথিবী থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের অনন্তে
অদ্ভুত রহস্যে ঘন হয়ে আসে আনন্দ সুখ অনুভূতি
একের পর এক নক্ষত্রমালা এখন দৃশ্যপটে উৎসবে
কীসব তারা বলে সহাস্যে আমাকে তোমাকে নিরন্তর
যেন দীর্ঘ এক কবিতা যেন এক অফুরান উপাখ্যান
যেন নিয়ামক মহাজন মহাকাল অন্তহীন সৃষ্টির যজ্ঞে
আরো দূর দূর
আরো দূর দূর থাকো যমুনার ওপারে শান্ত মহলে
আমি নিজামুদ্দিন পেরিয়ে দেখি যাবতীয় কুয়াশা
কতদিন কতদূরে ফেলে চলে এসেছি মালবীয়নগর
তোমাকেই পাবো জেনে হাওয়া বদলের কথা শহরে
সাড়া দিতেই কতবার বসন্তবাতাস উড়ে গেল বনে
পাখিরা কি বিকেলের রং বদলের অপেক্ষায় থাকে
অন্তরের অন্তরঙ্গ ক্ষত মোলায়েম ছোঁয়ায় বিগলিত
এতো নিচু স্বরে কথা বলো – ডেকে নাও কাছে পিঠে
পাখিদের চঞ্চুতে লেগে থাকে তিয়াস মেটে না তেষ্টা
কোন অন্ধকার প্রেম অনুষঙ্গ আরো দূর দূর থাকো









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন