রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

রাজা চট্টোপাধ্যায়-এর ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী

 

সময়স্মৃতি  সভ্যতার আলোকে সমরখন্দ

আমি তখন স্কুলের ছাত্র। নানা বিষয়ের পাঠ্যবইয়ের ভিড়ে ইতিহাস ছিল আমার সবচেয়ে আপন একটি জগৎ। রাজা,সম্রাট,নবাবদের উত্থান পতন, মুকুটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রাজনীতি, পাথরে গড়া প্রাসাদ,নীরব ভাস্কর্যের চোখে জমে থাকা সময়, এসব পড়তে পড়তে মনে হতো, আমি বইয়ের পাতায় নয়,সময় নামের এক নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছি। তবে এই ভালো লাগা যথার্থ অর্থে প্রাণ পেল, আমি যখন একজন উপযুক্ত গৃহশিক্ষকের সান্নিধ্যে এসেছিলাম। সাহিত্যের প্রতি যেমন তাঁর গভীর অনুরাগ, তেমনি ইতিহাসের প্রতিও ছিল এক অমোঘ টান। তিনি আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করতে এসে নিয়ম করে ইতিহাসের বই তুলে নিতেন। ওনার পড়ানোর ধরণ অনেকটা গল্প বলার মতো। মনে হতো তিনি  ইতিহাস পড়াতেন না, তিনি ইতিহাস বলতেন, গল্পের মতো করে। ওনারই প্রেরণায় স্কুলের পরীক্ষায় ইতিহাসে আমি বরাবরই সবচেয়ে বেশি নম্বর পেতাম। ইতিহাসের পরীক্ষা মানেই আমার জন্য ছিল আলাদা এক উৎসব। অতিরিক্ত পাতা নেওয়া ছিল অভ্যাস বরং বলা ভালো, প্রস্তুতি। সেদিন আমার কলম থামত না, চিন্তারা যেন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত কাগজে নামার জন্য। সহপাঠীরা মজা করতো, কারণ তারা বুঝত না, ওটা শুধু লেখা নয়, ওটা ছিল আমার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আজকে আমার এই স্মরণ, শুধু অতীতের কথা নয়, আমার শৈশবের এক জীবন্ত স্মৃতি, যেখানে গল্প, শিক্ষা আর স্বপ্ন একই পাতায় পাশাপাশি লেখা।



ভারতের ইতিহাসে তৈমুর লঙের নাম আসে এক ভয়াবহ অধ্যায়ের সঙ্গে। যখন দিল্লি সালতানাত রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল ছিল, সেই সময় তৈমুরের সেনাবাহিনী দিল্লি দখল করে এবং ব্যাপক ধ্বংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই অভিযান উত্তর ভারতের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত স্মৃতি হয়ে আছে। সেই গৃহশিক্ষকের কাছে, ওনার বলা গল্পে শুনেছিলাম, ভারতের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়ে তৈমুর লঙের নাম। তৎকালীন দিল্লি সালতানাত রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল ছিল, তৈমুরের সেনাবাহিনী, সেই সুযোগে দিল্লি দখল করে ব্যাপক ধ্বংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে, এই অভিযান আজও উত্তর ভারতের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত স্মৃতি বহন করছে। আমার গৃহশিক্ষক এমনভাবে বর্ণনা করতেন, মনে হতো কখনও তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে, কখনও দরবারের স্তব্ধতার ভেতর, আবার কখনও নিজেকে কোনো পরাজিত সম্রাটের নীরব দীর্ঘশ্বাসের পাশে বসিয়ে রেখে, অনর্গল বলে যাচ্ছেন ঘড়ির কাঁটাকে প্রশয় দিয়ে। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। সেই মুহূর্ত হয়ে উঠত জীবন্ত, শ্বাস নেওয়া, কথা বলা এক সত্তা। আজও স্মৃতির পাতা খুললে সেই গৃহশিক্ষকের কণ্ঠস্বর, আর নিজের ভালোলাগায় পরীক্ষার খাতায় অনর্গল লেখার আনন্দ একসঙ্গে ফিরে আসে। বইয়ের বাইরে ইতিহাস আমার কাছে শুধু অতীতের কথা নয়, আমার শৈশবের এক জীবন্ত স্মৃতি, যেখানে গল্প, শিক্ষা আর স্বপ্ন পাশাপাশি সহবস্থান করে। 



এরপর নদীর জলের মতোই অনেকটা সময় নীরবে গড়িয়ে গেছে। শৈশবের বইয়ের পাতাগুলো ক্যালেন্ডারের পাতার নিচে ঘুমন্ত। জীবনের বাস্তবতা, আমাকে টেনে এনেছে কর্মসূত্রে রাজধানী শহর দিল্লিতে। ভারতের রাজধানী দিল্লি, যে শহরের বাতাসে ইতিহাস মিশে থাকে, যার রাস্তায় হাঁটলে পায়ের নিচে শুধু মাটি নয়, শতাব্দীর স্মৃতিও শব্দ তোলে। মুঘল স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং তার বর্ণময় ইতিহাসে যেহেতু মুগ্ধ ছিলাম তাই সেই আকর্ষণ আর কল্পনার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকেনি। এই শহরে আমার দিনযাপনে, কখনও লাল বেলেপাথরের গায়ে সূর্যের আলো পড়তে দেখেছি, কখনও সাদা মার্বেলের নীরবতায় সময়ের দীর্ঘশ্বাস শুনেছি। দিল্লিকে কেন্দ্র করে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মুঘল স্থাপত্যগুলো, আমার সামনে খুলে দিয়েছিলো একটি বিস্তৃত ইতিহাসের মানচিত্র। যে তথ্য এতদিন ঘুমিয়ে ছিল বইয়ের পাতায় আর শিক্ষকের বর্ণনায়, কর্মসূত্রে এই ঐতিহাসিক নগরীতে এসে সেসবই প্রাণ পেলো। এরপর জীবনসংগ্রাম চলছিলো আর আমিও একটু একটু করে অর্থ জমিয়ে, নিজের দেশকে কাছ থেকে দেখার জানার সুযোগ পাচ্ছিলাম। আমার দেশের পাহাড় থেকে সমুদ্র,মরুভূমি থেকে সবুজ সমতল, প্রতিটি ভ্রমণ আমাকে শেখাল, আমার দেশের ইতিহাস কেবল বইয়ে নয়, মানুষের ভিন্ন ভাষায়,খাবারের স্বাদে গন্ধে এবং উৎসবের রঙে লুকিয়ে আছে। যখন পথচলার আত্মবিশ্বাস একটু বেড়ে উঠলজমল সাহস, জমল অল্প অল্প করে স্বপ্নের পুঁজি। একদিন, সময় আর সুযোগের ফাঁকে পেরিয়ে গেলাম দেশের সীমানা। ছুঁয়ে দেখলাম ভিন্ন ভূগোল,ভিন্ন শিল্প সংস্কৃতি, ইতিহাস আর মানুষের জীবনযাত্রার নতুন ছন্দ। 

মনের গহিনে উঁকি দিল এক বহুদিনের চেনা নাম, উজবেকিস্তান। ছাত্রাবস্থার বইয়ের পাতায় তাসখন্দ, সমরখন্দ ছিল কেবল শব্দ। ইতিহাসের সঙ্গে দেখা করার,গল্প হয়ে ওঠা শহরগুলোর দিকে আরও একধাপ এগিয়ে গেলাম। 



শুভক্ষণ আসতেই একদিন সকালে ইন্দিরাগান্ধী বিমানববন্দর থেকে, উজবেকিস্তান এয়ারলাইন্স আমাকে পৌঁছে দিলো রাজধানী শহর তাসখন্দে। সেখান থেকে আমার গন্তব্য ছিল সমরখন্দ। কারণ তৈমুর লঙ-এর বংশধর বাবর, সমরখন্দের স্মৃতি আর মধ্য এশীয় ঐতিহ্য বুকের ভেতর বহন করে এই ভারতবর্ষে, মুঘল সাম্রাজ্যের বীজ বপন করেছিলেন। ভারতের আগ্রা, দিল্লি ফতেপুর সিক্রি আসলে সমরখন্দেরই এক দূরবর্তী প্রতিবিম্ব।  সমরখন্দ ভারতের মধ্যে সম্পর্ক কেবল একটি সামরিক আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এই সম্পর্ক সভ্যতার উত্তরাধিকার ইতিহাসের দীর্ঘ সেতুবন্ধন হয়ে উঠেছিল। এর শিকড় প্রোথিত আছে হাজার বছরের ইতিহাসে। রেশম পথ ছিল এই সম্পর্কের প্রথম সেতু যার মাধ্যমে শুধুমাত্র পণ্য নয়,চিন্তা, বিশ্বাস সংস্কৃতিও পাশাপাশি যাতায়াত করত। আজও সমরখন্দ দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সেই দ্বন্দ্বের সাক্ষী হয়ে, যেখানে ধ্বংস নির্মাণ, নিষ্ঠুরতা সৌন্দর্য একই ইতিহাসের দুই মুখ।  তৈমুর লঙ-এর শাসনামলে সমরখন্দ হয়ে উঠেছিল শক্তির প্রতীক, আর সেই শক্তির দীর্ঘ ছায়া ছাপ ফেলেছিলো ভারতের ইতিহাসেও। ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে গিয়ে জেনেছিলাম, আকাশপথে ভারত থেকে সরাসরি সমরখন্দে ফ্লাইট খুব সীমিত। এবং উজবেকিস্তানের ভেতরে ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক উপায় হলো ট্রেন। তাশখন্দ-সমরখন্দ রুটে দ্রুতগতির ট্রেন রয়েছে, সময় লাগে প্রায় আড়াই তিন ঘণ্টা। দূরত্ব তুলনামূলক বেশি হলেও, সড়কপথে তাসখন্দ থেকে গাড়িতে করেও সমরখন্দে যাওয়া যায়। খুব ইচ্ছে ছিল, দ্রুতগতির ট্রেন আফ্রোসিয়ব চড়ে সমরখন্দে যাওয়ার কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও টিকিট পাইনি। ব্যর্থ মনোরথে ভেবেছিলাম, তাসখন্দ বিমানবন্দরে পৌঁছেই বিকল্প ব্যবস্থা নেবো। 



উজবেকিস্তান এয়ারলাইন্স, তাসখন্দ এয়ারপোর্টের মাটি ছোঁয়ার সাথে সাথেই, মন বলে উঠেছিল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ে পা রাখলাম। সেই নামার মুহূর্তটাই উজবেকিস্তানের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। বিমানবন্দরটি খুব ঝলমলে নয়, কিন্তু সংযত, শান্ত, আত্মবিশ্বাসী। দেয়ালে দেয়ালে মধ্য এশিয়ার নকশা শোভা পাচ্ছে। ,ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম, এখানে কোনো তাড়া নেই, সময়ের গতি এখানে একটু ধীর। স্থানীয় মানুষজনের আচরণে মৃদু সৌজন্য। এবার এখানথেকে সমরখন্দ যাওয়ার বিকল্প খোঁজার পালা। এয়ারপোর্টের এক স্টাফের কাছে জানতে চাইতেই, উনি চমৎকার ভাবে গাইড করলেন। ওনার কথায় ইয়ানডেক্স মোবাইল অ্যাপ ইন্সটল করে নিলাম। বললেন, এই ইয়ানডেক্স এখানকার বহুল জনপ্রিয় একটা অনলাইন ক্যাব সংস্থা। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, অন্যান্য কয়েকটা দেশেও এই অনলাইন ক্যাব বেশ জনপ্রিয়। যথারীতি এই ক্যাবের মাধ্যমে মিনিট কুড়ির মধ্যেই আমি পৌঁছে গেলাম ওখানকার বাস টার্মিনাসে। সমরখন্দ যাওয়ার বাসের খোঁজ নিতে গিয়েই পরিচয় হলো একটা স্থানীয় ড্রাইভার সুপুরুষ রফিক ভাইয়ের সাথে। উজ্জ্বল ত্বকে টুপি সহ উজবেকি পোশাকে ওনাকে দেখতে দারুন লাগছে। উনি আমার ব্যাগ হাতে নিয়ে, অনতিদূরে একটা গাড়ি দেখিয়ে বললেন, এক লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকায় আমাকে সমরখন্দ হোটেলে পৌঁছে দেবেন। টাকার অঙ্কের পরিমান শুনে, আমি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। রফিক ভাই সেটা বুঝতে পেরে বললেন, ব্রাদার অনলি টেন ডলার। আমার সম্বিৎ ফিরে পেতেই হিসাব করে দেখলাম, ওনার বলা টাকা এক লক্ষ ত্রিশ উজবেক সোম, আমাদের ভারতীয় টাকায় মূল্যে হাজার টাকারও কম। আমি সম্মুতি জানিয়ে ওনার গাড়িতে বসতেই দেখলাম, আরও দু'জন সহযাত্রী বসে আছেন। এই অচেনা দেশে ড্রাইভার রফিক ভাই  সহ তিনজন উজবেক যুবককে স্থানীয় পোশাকে দেখে, মনের মধ্যে একটু ভয় জন্মেছিলো। কিন্তু কিছুক্ষন পর নানা গল্পে আড্ডায় আমাদের পাঁচ ঘন্টার জার্নিটা দুর্দান্ত কেটেছিল। 



গাড়ি তখন হাইওয়ে ধরে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে। মাঝামাঝি একটি জায়গায় আসতেই রফিক ভাই  গাড়ি থামিয়ে দিলেন। নিচে নেমে দেখলাম, রাস্তার দুপাশ জুড়ে, কয়েকজন স্থানীয় মহিলা বাস্কেটে করে টুকটুকে লাল  স্ট্রবেরী বিক্রি করছেন। আমাদের দেখেই কয়েকটা হাতে দিলেন। মুখে দিয়েই দেখলাম মনমাতানো স্বাদ। রফিক ভাই এবং সহযাত্রীরা সকলে মিলে বাস্কেটে ভরা স্টবেরী কিনে নিলেন। আমি একা, তাই অল্প পরিমানে কিনলাম। এইভাবে আরও কিছুক্ষন কেটেছে, পথের ক্লন্তি টের পাইনি একবারও। ঘন্টাখানেক পরে আমার সারথি, আমাকে নামিয়ে দিলো, একটা হেরিটেজ বুটিক হোটেলের সামনে। দেশে থাকতেই অনলাইনে আমি বুক করে রেখেছিলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে রফিক ভাইকে বিদায় জানাবার আগেই উনি বললেন, এই শহরকে যদি আপনি ভালো ভাবে জানতে চান, ঘুরে দেখতে চান তাহলে ওনার এক আত্মীয়া মরিয়াম আমাকে সঠিক ভাবে গাইড করতে পারে। উনি আরও জানালেন, মরিয়াম এখানে ট্যুরিজম নিয়েই পড়াশোনা করছে, স্থানীয় গাইড হিসাবে কাজ করে তাই ওকে সামান্য সাম্মানিক দিলেই হবে। এতটা পথ একসাথে এসেছি তাই তখন রফিক ভাইয়ের অনুরোধ ফেরাতে পারিনি। আমাকে হোটেলে চেক ইন করে বিশ্রাম নিতে বললেন। হোটেলের স্বাগত কক্ষে প্রবেশ করে মনটা খুশিতে ভরে গেলো। আসলে পুরোনো শহরের ভেতরে অবস্থিত এই মাঝারি মানের হোটেলগুলো, উজবেক স্থাপত্যরীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে, আধুনিক সুবিধা দেয়। আর পর্যটকদের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ ঘটাতে সাহায্যও করে। আবার সমরখন্দের সবচেয়ে জনপ্রিয় রেজিস্তান স্কয়ার   মূল  সড়কের আশপাশে, অত্যাধুনিক সুবিধা সহ, বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানের হোটেল রয়েছে যেগুলো পর্যটন-অর্থনীতির সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এখানে কিছু স্থানীয় পরিবার দ্বারা পরিচালিত, গেস্টহাউসও রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, ভাষা দৈনন্দিন রীতির অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করতে পারেন। তবে আমার একার জন্য এই বুটিক হোটেলটি যে যথেষ্ট, সেটা রুমের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই অনুভব করেছিলাম। ব্যাগ রেখে একটু বিশ্রাম নিয়ে দ্রুত স্নান সেরে নিলাম। 



নরম বিছানায় শরীরটা এলিয়ে একটু চোখ লেগে গিয়েছিলো, ঘুম ভাঙলো ড্রাইভার রফিক ভাইয়ের ফোনে। জানালেন, রেডি হয়ে হোটেল লবিতে আসার জন্য। মিনিট পাঁচেক পরেই এসে দেখি, ওনার পাশে বসে আছে এক অপরূপা। পরিচয় করিয়ে দিলেন বছর কুড়ির মরিয়মের সাথে। চেয়ে দেখলাম মেয়েটির সৌন্দর্য অলংকারে ভারী নয়, বরং অলংকারই তার কাছে লজ্জা পাবে। নিমগ্ন চাহনিতে আত্মবিশ্বাসী সদ্য যুবতী মেয়েটি, আমাকে দেখে হালকা হাসলো। রফিক ভাই বললেন, আমাদের রেজিস্তান স্কয়ারে নামিয়ে দিয়ে উনি অন্য কাজে যাবেন। গাড়ি থেকে নামতেই দেখলাম, রেজিস্তান স্ট্রিট শান্ত। রেজিস্তান এই রাস্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর ছায়া। এই ছায়া কোনো গাছের নয়, এই ছায়া পড়ে নীল গম্বুজ আর বিশাল মাদ্রাসার। পর্যটকরা ধীর গতিতে হেঁটে চলেছেন হাতে ক্যামেরা নিয়ে, মাঝে মাঝে থামছেন, মুহূর্তটা কয়েদ করে নিচ্ছেন। রাস্তার শেষপ্রান্তে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উলুগ বেগ, শের-দর তিল্লা-কারী মাদ্রাসার অবিচল উপস্থিতি। মরিয়ম জানালো, এটাই নাকি সামারখন্দের রেজিস্তান স্কয়ার। “রেজিস্তানশব্দের অর্থ বালুময় প্রাঙ্গণ। এক সময় এই এলাকা ছিল

সমরখন্দের প্রশাসনিক সামাজিক কেন্দ্র। আমি আর সুন্দরী মরিয়াম পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি। স্থানীয় মানুষজন তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, অভ্যস্ত ভঙ্গিতে রাস্তায় হেঁটে চলেছে, কারণ এই রাস্তা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখানে আধুনিক দোকানের পাশেই পুরোনো দেয়াল, ক্যাফের পাশে ঐতিহাসিক খিলান। পুরোনোকে সরিয়ে না দিয়ে নতুনকে জায়গা করে দেওয়া, এই সহাবস্থানই রেজিস্তান স্ট্রিটের প্রকৃত ঐতিহ্য, আবেগ। আমরা দুজনে বেশ কিছুক্ষন ইতিউতি ঘোরাঘুরি করে, যখন একটা জায়গায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম, তখন মরিয়াম বলেছিলো, একটু পরেই তো সন্ধ্যা নামবে তাই আমরা আজ ভেতরে গেলাম না, পরের দিন দিনের বেলায় আবার আসবো। কারণ এই ঐতিহাসিক স্থানের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে হলে, স্থানীয় অর্থমূল্যে পঁচাত্তর হাজার টাকার টিকিট কাটতে হবে অথচ সন্ধ্যার আলো শব্দের প্রদর্শনী ছাড়া আর কিছু দেখা সম্ভব হবে না। হিসাব করে দেখলাম এই টিকিটের মূল্য ভারতীয় টাকায় প্রায় 'য়শো টাকা। 


মরিয়মের সাথে এই শহরের নানা খাবার এবং ছড়িয়ে থাকা নানা স্মৃতিকাহিনী নিয়ে, গল্প করতে করতে খিদে পেয়ে গেলো। কারণ সেই গাড়ি করে সমরখন্দ আসার সময়, একটা ক্যাফে তে ইটালিয়ান পাস্তা , স্যান্ডউইচ খেয়েছি। লক্ষ্য করলাম, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্তান স্ট্রিট বদলে যেতে শুরু করলো। রাস্তার আলো জ্বলে উঠে মাদ্রাসার গায়ে একটা সুন্দর আভা ছড়িয়ে পড়লো। হালকা বাতাসে ভেসে আসতে লাগলো কথাবার্তার শব্দ,কখনও সেতারের সুর, কখনও চায়ের কাপে চামচের টুংটাং। মরিয়াম আমাকে নিয়ে গেলো রেজিস্তান স্কয়ারের একটা ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরার সামনে। সমরখন্দের রেস্তোরাঁগুলো বিলাসী নয়, তারা গর্ব করে তাদের ঐতিহ্যে। খাবার এখানে কেবল রেসিপি নয়, একটা সাংস্কৃতিক স্মৃতি। রেস্তোরার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতেই, লক্ষ্য করলাম, উজবেক ঐতিহ্যবোধকে সামনে রেখে, জাতীয় নকশা আর রঙে ভরা হলে, হালকা আলো ছায়ায় পরিবেশ যেনো এক অন্য গল্প বলে।  

মরিয়াম আমাকে এখানকার রুফটপ এরিয়ায় নিয়ে গেলো। অজস্র চেয়ার টেবিলের কারুকার্য্য ভরা এখানকার কিছু অংশ ঘেরা আবার কিছুটা অংশ মুক্ত পরিবেশে। একজন গায়ক গিটার হাতে গেয়ে চলেছেন রোমান্টিক গান। ওনার কণ্ঠের মাধুর্য্যে আর সুরের মায়াজালে আগত অতিথিরা মাথা দোলাচ্ছেন। আমি আর মরিয়াম মুক্ত পরিবেশে একটা টেবিলে মুখোমুখি বসলাম। সামনেই শোভা পাচ্ছে রেজিস্তানের আলোকিত গম্বুজ। উজবেকি পোশাকে সুসজ্জিত একটি ছেলে এসে অর্ডার নিলো। আমি মরিয়মকে বললাম, তোমার পছন্দে এখানকার খাবার খেতে চাই। রেস্তোরার ওই কর্মী কিছুক্ষন পরে একটা সুদৃশ্য পটে ওখানকার জনপ্রিয় চা পরিবেশন করলো। মুক্ত পরিবেশে বসে ছিলাম, একটা ঠান্ডা হওয়ার ঝলক এসে শরীরে কম্পন এনে দিলো। ওই কর্মীটি ফিরে যাওয়ার সময়, মুখোমুষি বসা আমাদের   দুজনকে একটি করে উজবেকি ঐতিহ্যবাহী শাল পরিয়ে দিলো। আতিথেয়তার মুগ্ধ হলাম আমি। 


কিছুক্ষন পরেই আমাদের টেবিল ভরে গেলো, সেরামিকের সুদৃশ্য প্লেটে। সুগন্ধিত মসলায় মেরিনেটেড করা, কয়লার আগুনের ধোঁয়ায় সদ্য সেঁকা, চিকেন শাশলিক আমাদের টেবিলে এলো সরল ভঙ্গিতে, কোনো সসের ভার নেই, কেবল কাঁচা পেঁয়াজ, এক চিমটে লবণ, আর কয়েক ফোঁটা লেবুর রস। মরিয়াম বললো, মাটন, বিফ বা মুরগির মাংস, পেঁয়াজ, লবণ, গোলমরিচ, কখনও টক দই বা ভিনেগারে ভালো করে মাখানো হয়। এই মেরিনেশন অনেকটা দীর্ঘ সময় জুড়ে কারণ শাশলিক তাড়াহুড়ো সহ্য করে না। তারপর লোহার শিকে গেঁথে কয়লার আগুনে ঘোরানো হয় ধীরে ধীরে, যতক্ষণ না বাইরের অংশে হালকা পোড়া দাগ, আর ভেতরের অংশে নরম রস জমে ওঠে। এক পিস্ গ্রিল চিকেন মুখে দিতেই এক স্বর্গীয় অনুভূতি পেয়েছিলাম। এক কামড়েই টের পেলাম, এই স্বাদ যুদ্ধজয়ের নয়, দৈনন্দিন জীবনের। জানতে পারলাম, দিনের আলো নরম হয়ে রেজিস্তানের গম্বুজে আলো জ্বলে উঠলে,আগুনের পাশে বসে শাশলিক খাওয়া সমরখন্ডের সামাজিক রীতি। মরিয়াম অর্ডার দিয়েছিলো, সমরখন্দীয় স্টাইলে তৈরি উজবেক প্লভ। শুনলাম, এই বিশেষ ঐতিহ্যবাহী পদটি সুগন্ধ মশলা, চাল রসালো মাংসের সুষম সমন্বয়ে তৈরী এখানকার একটি জাতীয় খাবার। যা এখানকার স্থানীয় এবং পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। খাওয়ার শেষে আমি মরিয়াম কে, ওর কলেজ হোস্টেলে পৌঁছে দিয়ে, আমার হোটেলে ফিরলাম। পরের দিন সকাল করে উঠে ব্রেকফাস্ট করেই রেডি হয়ে নিলাম। 


  

পরের দিন সকালে যথারীতি মরিয়াম হোটেল এসে, আমাকে সাথে করে নিয়ে গেলো সামারখন্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত সিয়াব বাজারে। বিবি খানুম মসজিদের পাশে অবস্থিত এই বাজারে ঢুকলে মনে হয় যেন শতাব্দী পেরিয়ে কোনো প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্রে চলে এসেছি। চারপাশে ঘুরে দেখলাম, এখানে হাতে বোনা রেশম সুজানি কাপড়, ঐতিহ্যবাহী উজবেক টুপ, নীল-সবুজ নকশার সিরামিক প্লেট বাটি, নানা ধরণের শুকনো ফল, আখরোট, পেস্তা, কিশমিশ, নানা প্রকার মসলা, যার গন্ধে মধ্য এশিয়ার স্মৃতি মিশে থাকে। কয়েকজন বিক্রেতার সাথে কথা হলো, যেটুকু বুঝেছিলাম দরকষাকষি এখানে বিরোধ নয়, বরং সামাজিক আলাপের অংশ। সত্যিই মানুষজন খুব আন্তরিক এবং সদাহাস্য। পরখ করে দেখলাম, এখানকার ড্রাইফুট আমাদের দেশের তুলনায় অনেকটাই সস্তা, তাই যতটা নিয়ে আসা সম্ভব কিনে নিলাম। সেই দোকানের সদাহাস্য বিক্রেতার সাথে বন্ধুর মতো মিশেছিলাম। উনি আবদার করলেন, আগামীতে পরিবার নিয়ে সমরখন্দ এসে ওনাদের বাড়ির আথিথেয়তা গ্রহণ করার। ভিন দেশে এমন ব্যবহার নজর কেড়ে নিলো। সমরখন্দের সংস্কৃতি স্থানীয়দের জীবনযাপন সম্পর্কে যেটুকু বুঝলাম, এখানকার সংস্কৃতি মানুষের হাঁটার ছন্দে, কথার মিতব্যয়িতায় বাজারের নীরব শৃঙ্খলায়। এরপর একে আমরা দেখে নিলাম বিবি খানুম মসজিদ, গুর--আমির এবং শাহ--জিন্দা। মরিয়াম বললো, এই গুর--আমির হলো তৈমুরের সমাধি। নীল গম্বুজের নিচে ঘুমিয়ে আছে এক ভয়ংকর সম্রাট, কিন্তু চারপাশে এমন নীরবতা, যেন ক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত শান্তি খোঁজে। আর শাহ--জিন্দা হলো সমাধির এক দীর্ঘ সরু পথ। প্রতিটি দরজা আলাদা নকশায় সাজানো মনে হয়, মৃত্যুর পরও মানুষ সৌন্দর্য ছাড়ে না। এরপর আরও একটা ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরায় লাঞ্চ সেরে সবশেষে আমরা গেলাম, সমরখন্দের হৃদয়স্থল হিসাবে পরিচিত  রেজিস্তান স্কয়ারে। গতকাল বাইরে থেকে দেখেছি, আজ টিকিট কেটে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দেখলাম, নীল টাইলসে মোড়া তিনটে মাদ্রাসা, ঐতিহ্য আর সোনালি আলোয় মাখামাখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর জ্ঞান আর শিল্পের হাত ধরাধরি করে প্রার্থনা করছে। 


আরিফ ভাই এবং মরিয়মের সযত্ন সান্নিধ্যে, দুটো দিন ইতিহাসের আলোকে মোড়া, সমরখন্দ শহরকে  দুর্দান্ত ভাবে অনুভব করলাম। সমরখন্দ থেকে তাসখন্দে এসে ওখানকার ঐতিহ্যবাহী কয়েকটা স্থান দেখে আমার দেশে ফিরেছিলাম। কোনোরকম অত্যুক্তি না করেই বলছি, এখানকার মানুষ শান্ত, চোখে গভীরতার ঝলক। উজবেক পোশাকে রঙের  ব্যবহারে নীল, সবুজ, সোনালি, যেন আকাশ, মাঠ আর সূর্য একসঙ্গে বোনা।সমরখন্দ মানুষকে বিস্মিত করতে চায় না, সে মানুষকে ধীর হতে শেখায়। এই শহর বলে, সভ্যতা মানে শুধু অগ্রগতি নয়, স্মৃতিকে ধারণ করার ক্ষমতাও। তাই আমার কাছে এই সমরখন্দ থেকে 

ফেরা মানে, একটি শহর ভ্রমণে শেষ করা নয়, বরং নিজের সময় চিন্তাকে প্রশ্ন করা। তাই সমরখন্দ ছাড়ার সময় মনে হয়েছিল আমি কিছু রেখে যাচ্ছি, হয়তো নিজের সময়বোধ,হয়তো ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা একখণ্ড বিস্ময়। সেই সুখস্মৃতি রোমন্থন করলেই অনুভূত হয়,  এই শহর আমাকে ফিসফিস করে বলে,“পারো যদি ফিরে এসো, এসো ফিরে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন