রবিবার, ১ আগস্ট, ২০২১

কাজল সেন-এর ঝুরোগল্প


নাইসা

নাইসা আমাকে বলল, তুমি জানো, আমার নাম নাইসা কে রেখেছে এবং কেন রেখেছে?

আমি অজ্ঞতা প্রকাশ করে বললাম, না রে, তোর নামকরণের সময় আমি হাজির থাকতে পারিনি, আর পরেও তেমন কোনো উৎসাহবোধ করিনি। তা প্রসঙ্গটা যখন এসেই গেল, তখন তোর নামকরণের ইতিহাসটা বলেই ফেল!

আমার কথায় নাইসা হাসল, মজা করে বলল, আমার নাম রেখেছে আমার বর।

-সে কী! তোর জন্মের সময় তোর বর প্রেজেন্ট ছিল?

-ছিল তো! আমার বর আমার থেকে চারবছরের বড়। ওর নাম নাইস। দেখতে খুব সুন্দর তো, তাই তার নাম নাইস। জন্মের পর আমাকে দেখে নাইস আমার প্রেমে পড়ে গেছিল। বলেছিল, বড় হলে আমাকেই বিয়ে করবে, আর নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে আমার নাম রেখেছিল নাইসা। বুঝলে?

 

না বুঝে উপায় নেই। ইদানীং মায়ের গর্ভ থেকে বেরিয়েই যে ছেলে মেয়েরা প্রেমে পড়ে যাচ্ছে, এটাও না মেনে উপায় নেই। এরপর হয়তো মায়ের গর্ভে থাকাকালীন তাদের প্রেমের শুরুয়াৎ হবে! নাইসাকে বললাম, তা নাইসের সঙ্গে আমার আলাপ করাবি না? নাইসের সঙ্গে আমার কবে দেখা হবে?

নাইসা দুঃখ দুঃখ মুখ করে বলল, আমার সাথেই যে কত কতদিন দেখা হয়নি!

-মানে? দেখা হয়নি কেন? কোথায় থাকে নাইস?

-নাইস তো অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। আমার যখন মাত্র দেড়বছর বয়স, তখনই ওরা চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া। ওখানেই থাকে।

-তাহলে তোর সঙ্গে যোগাযোগ আছে কেমন করে?

-নেই তো! যোগাযোগ তো নেই!

-তাহলে তুই কোন আশায় বসে আছিস যে নাইস তোকে বিয়ে করবে? নাইস তোর বর হবে

-বিয়ে কেন হবে না?

-কী করে হবে? কোনো যোগাযোগই তো নেই!

-তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা তো ইচ্ছে করলেই যোগাযোগ করতে পারি। ফোনে কথা বলতে পারি। ভিডিও কলে কথা বলা দেখা দুটোই একসঙ্গে হতে পারে। মেল আই ডি তে মেসেজ পাঠাতে পারি। হোয়াটস অ্যাপে চ্যাট করতে পারি। ফেসবুক আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার তো কোনো কমতি নেই! কিন্তু আমরা কিছুই করি না। এমন কি আমরা কেউ কারও ছবিও দেখি না। আমাদের দুজনের দেখা হবে একেবারে বিয়ের ছাদনাতলায় শুভদৃষ্টির সময়।

 

আশ্চর্য! খুবই আশ্চর্য! আমার বাপের জন্মে এমন প্রেমকাহিনী আমি শুনিনি। কিন্তু নাইসার কথা আমি ফেলতে পারি না। নাইসা আমার বন্ধুর মেয়ে। ভালো মেয়ে। সম্প্রতি একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কমপিউটার সায়েন্স নিয়ে সেকেন্ড  ইয়ারে পড়ছে। দুবছর পর কমপিউটার ইঞ্জিনিয়ার হবে। নাইসা দেখতেও বেশ সুশ্রী। নাইসা নামটা ওর শরীরের সঙ্গে মানিয়ে যায় পুরোপুরি। কিন্তু উত্তর আধুনিক যুগের একটি সুস্থ সাবলীল মেয়ে যে তার নেহাৎ বাচ্চা বয়সের নিছক বাচ্চামিকে এভাবে প্রশ্রয় দিয়ে বুকের মধ্যে সযত্নে বয়ে বেড়াচ্ছে, তা আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। পাগলামিও বলা যায়। 

 

নাইসকে আমি কখনও দেখিনি, যদিও নাইসের বা্বাও আমার বন্ধু ছিল। আগামী অক্টোবরে কোম্পানির কাজে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। নাইসের সঙ্গেও আশাকরি দেখা হবে।

​সোনালি বেগম-এর ঝুরোগল্প

 

কালপুরুষের স্বাধীন বন্যতা

সেপ্টেম্বর মাসের সন্ধ্যের আকাশের দিকে তাকাই। দক্ষিণ আকাশে উজ্জ্বল শনিগ্রহ আর  যে বৃশ্চিক তারামন্ডলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র জ্যেষ্ঠা বা অ্যান্টারেস। মধ্যরাতের আগেই অস্ত হয়ে যায়। ছায়াপথ ধরে হেঁটে যাইউত্তরের ঈগল তারামন্ডলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র অ্যালটেয়ার-কে জড়িয়ে ধরি কিছুক্ষণ। ছায়াপথের আরও উত্তরে সোয়ান তারামন্ডলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র দেনেব ছুঁয়ে সরে যেতে থাকি। আকাশে এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখি উড়ে যেতে থাকে। ক্রমে শীতকাল এসে যায়। কালপুরুষ বা অরিওনের উজ্জ্বল কোমর-বন্ধনী স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কালপুরুষের কুকুর সাইরাস অসামান্য উজ্জ্বলতায় ধেয়ে আসে। আকাশ থেকে নেমে আসেহাঁপাতে থাকে সে। অতিযত্নে তার শুশ্রূষা করি। আমাদের ছায়াপথে তথা সমগ্র ব্রহ্মান্ডে নিশ্চয় কোনো কোনো গ্রহ আছেযার অধিবাসীরা আমাদের থেকে বুদ্ধিতে উন্নত হবে। অনুসন্ধানে চলছে। সচেতন অস্তিত্ব তথা মানুষ এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে পাড়ি জমাতে উৎসুক। এই যে আমরা ইন্টার ন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আই.এস.এস.)-এর ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নভশ্চরনানান পরীক্ষা নিরীক্ষায় মশগুল। চব্বিশ ঘণ্টায় ষোলোবার পৃথিবী প্রদক্ষিণরত স্পেস-ল্যাবরেটরী। সুতরাং আমরা একদিনে ষোলোবার সূর্যের উদয়-অস্ত দেখছি। সেকী রোমাঞ্চকর অনুভূতিবলে বোঝানো যাবে না।

কালপুরুষ খুব কাছে এসে বসেছে। আমরা একসঙ্গে আকাশ পরিক্রমা করছি। ছায়াপথের উত্তর আকাশে ধ্রুবতারার কাছাকাছি জায়গায় ইংরেজি এম অক্ষরের আকৃতি নিয়ে অবস্থান করে এটা-ক্যাসিওপেয়ী তারামন্ডল। শেলি- বিখ্যাত পংক্তি মনে পড়ে যাচ্ছে“The maze of planets struggling fierce towards heaven’s free wildness.” অর্থাৎ গ্রহ বিন্যাস তীব্র আকুলতায় স্বর্গীয় স্বাধীন বন্যতার দিকে ছুটে চলে।

আমরা কি একটু বন্য হতে পারিনাএই মহাকাশে ভারশূন্যতায় সমস্ত শারীরিক আবেগকে সরিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে চারশো কিলোমিটার উপরে ভেসে থাকি। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা প্রথম আবিষ্কার করেন যে কীভাবে বর্ণালী থেকে নক্ষত্রের তাপমাত্রা নিধারণ সম্ভব।

সমস্ত ছায়াপথ জুড়েআছে নীহারিকা যা ধুলো এবং গ্যাসের মেঘপুঞ্জ। এখান  থেকেই নক্ষত্রের জন্ম হয়। আজ কালপুরুষ অবাধ্য হয়ে উঠছে। স্পেস-ওয়াক সেরে সবে আমরা স্পেস-ল্যাব-এর ভেতর প্রবেশ করলাম।

 হী জাতা হ্যায় ওহ রাহ পর গালিব,

কোঈ দিন আউর ভী জিয়ে হোতে

কালপুরুষ শুনিয়ে যাচ্ছে একের পর এক গালিব-এর শায়রী। সত্যিআরও কিছুদিন পৃথিবীর বুকে যদি বেঁচে থাকিবেঁচে থাকুক সে এবং ভালোবাসতে রাজিও হয়ে যাবো হয়তো বা একদিন

মেঘ অদিতি-র ঝুরোগল্প


মানুষের মুখ

শীতের ক্ষণস্থায়ী বিকেল তখন সন্ধ্যার সাথে জায়গাবদল করছে। কিছু দূরে নীলরঙা পাহাড়। সন্ধের ম্লান আলোয় তারা দ্রুত ঝাপসা হতে চাইছে। শীতের এক ঝকঝকে দিনের শেষবেলায় সেখানেই ওদের দেখা হয়ে গেল। ওরা মানে দুটি গান যাদেরকে শুনতে প্রায় একইরকম। একথা জানবার পর থেকেই প্রথম দ্বিতীয়কে অনেকদিন ধরে অনুসন্ধান করছে। ওরা হাঁটছে সমুদ্রতীর ধরে। সরুচোখে দ্বিতীয়কে অনেকক্ষণ ধরে দেখে প্রথম। দেখতে দেখতে ঘাড় ফিরিয়ে দ্বিতীয়কে বলল, শেষ অবধি দেখা হলো তাহলে! বলেই কর্তৃত্বের সুরে বলল, এসো, এগোনো যাক। 

দ্বিতীয় মৃদু হাসে। হাওয়ায় ওর চুল এলোমেলো। নোনা হাওয়ার দখলদারির হাতে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে দ্বিতীয়। পা ফেলছে এলোমেলো। পোশাক আলুথালু। প্রথম লক্ষ্য করল, দ্বিতীয়কে সে নিজের মতই যতটা গোছানো ভেবেছিল আসলে সে ততটা নয়। ভ্রূ কুঁচকে ঘুরে দাঁড়ায় সে। সরাসরি দ্বিতীয়র উদ্দেশ্যে বলে, তোমাকে সবাই আমার কপি বলে কেন

সমুদ্রের ঢেউগুলো পরপর আছড়ে পড়ে। আবার তারা ফিরেও যায়। সাংঘর্ষিক এক প্রশ্ন যা ঢেউ আছড়ে পড়ার মতই। অথচ দ্বিতীয়র হেলদোল নেই। সে কেবল ঢেউয়ের ওঠানামা দেখে। তারপর ফের এলোমেলো পা ফেলে। প্রথম এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। উত্তর কর, কেন তোমাকে আমার মত দেখতে?

এবার মৃদু হাসে দ্বিতীয়। গুনগুন করে, কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন দিয়ে যাও.. 

-    এটা প্রশ্নের উত্তর নয়!

-    কেন? আপনি আমাকে তুমি করে কেন বলছেন?

-    যদি বলি আমি সে, যার রাগ আর সুর নিয়ে তুমি তৈরি

-    ওহ বুঝেছি, কেন আমায় তুমি বলছেন। আপনি আগে জন্মেছেন। আমি কিছুটা পরে। আমরা একই রকম এরকম মনে হচ্ছে আপনার। কিন্তু কেন?

-    আমার একার প্রশ্ন নয়। কথা যারা গান শোনে তাদেরও।

-    একটা প্রশ্ন।সময় গতি অনাপেক্ষিক; মানে বলতে চাইছি সময় অপরিবর্তনীয়তাহলে আপনি আগে জন্মালেন কী করে!

-    বাহ! কথা ঘোরাচ্ছো! তুমি আমার শরীরকে ভিত বানিয়ে ঘরবাড়ি বানাওনি?

-    যদি বানাইও, অসুবিধে? এমন কত তো হয়েছে! স্বয়ং ..

-    থামো! উদাহরণ দেবে না। আমার কথাগুলোও তো উল্টেপাল্টে তোমারই শরীরে ভীড় করে আছে। কী ব্যাখ্যা তার?

-    যা আমরা নিজের বলে ভাবি সেসব কি সত্যি হয় সবসময়? নাকি সমস্তই আপেক্ষিকতা? সত্তাটুকুই আসল। যা আপনারও আছে। আমারও। তাহলে?

যুক্তি শুনে প্রথমের খুব রাগ হল প্রথমে। পরক্ষণেই ভাবনার দিকবদল হল। বদলে যাওয়া পৃথিবী তো সুরহীন। একাকিত্বের। এই পৃথিবী অচেনাও। অন্তহীন যন্ত্রণার এসময়ে অন্তত একটা গান যদি আমার মত হয়, হোক না.. 

ভাবতে ভাবতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে প্রথম। তারপর বালিতে আঙৃল বুলিয়ে কিছু একটা আঁকতে চেষ্টা করে। সমুদ্র এখন খুব শান্ত। 

অল্প দূরের অন্ধকারে দ্বিতীয়ও বসে। সে একটা ঝিনুক কুড়িয়ে পেয়েছে। আপনমনে তাই দিয়ে ছবি আঁকছে। 

আশ্চর্য এই, হুবুহু তারা একই ছবি আঁকছে। বিষণ্ণ মানুষের মুখ….