শনিবার, ১ মে, ২০২১

সোনালি বেগম-এর ঝুরোগল্প


 স্কার্ফ

মোমবাতি-আলোয় ঝলমল করে উঠছে জন্মদিনের কেক। শুধুই অপেক্ষা...
‘
হ্যালো, কখন আসবে? সকলে অপেক্ষা করছেন’, উদ্বিগ্ন ঝর্না

‘
অপেক্ষা করো’ নিস্তেজ কণ্ঠস্বরে আবীর ‘কতক্ষণ...’ ঝর্নার ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর উন্মাদগ্রস্ততায় মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছে ঝর্না, গলে পড়ছে গরম মোম কেকের নরম শরীরে ----

বেঁচে থাকার সামগ্রীগুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ---- আলু পেঁয়াজ রসুন খাট পালঙ্ক মোবাইল... চোখের প্রান্ত ঘিরে তছনছ রাজনীতি সমাজনীতি ধর্মনীতি। একসময় নাম-করা নায়ক আবীর হুইস্কির বোতল শেষ করে পড়ে থাকে বিছানায়। ‘শোনো, নিজেকে এভাবে শেষ কোরো না,’ ঝর্নার কণ্ঠে উদ্বেগ ‘আমাকে বার বার বিরক্ত কোরো না, প্লিজ’ ‘তোমার ফ্যান্স তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান’ ‘মারো গুলি, ফ্যান্স, হাঃ হাঃ হাঃ...’ আকাশে মেঘ গর্জন শুরু হয়ে যায়, অঝোর বৃষ্টির জলে ভেসে যায় জানালার কাচ। ঝর্না ছুটে এসে জানালা বন্ধ করে দেয়। অসহ্য গরমে বৃষ্টির দাপট ভালো লাগে। গ্রীষ্ম-বসন্তে পুরুষ কোকিলের কুহু-কুহু ডাকে ভরন্ত বাতাস। কোকিলের অনেক জাত আছে। নিউজিল্যান্ডের সাইনিং কোকিল ফ্লাইক্যাচারের বাসায় ডিম পেড়ে পালিয়ে যায় হাজার হাজার মাইল দূরের দ্বীপে। বাচ্চারা প্রতিপালিত হয় পালক পিতা-মাতার কাছে। তারপর সহজাত প্রবৃত্তির জোরে আবার ফিরে যাওয়া ---- পাখির ডানায় ভর দিয়ে ঝর্না উড়ে যায় দেশ দেশান্তর। জীবনটা যদি নিজের মতো সাজানো যেত! ভুল শত শত ভুল! গাড়ির হর্ণ শোনা যায় বাইরে। ‘চলো, একটু ঘুরে আসি,’ নরম গলায় ঝর্না ‘কোথায়?’ বিরক্তির চরম প্রকাশে আবীর ‘তোমার একটু ট্রিটমেন্ট দরকার’ ‘ছাড়ো তো-----’ চেহারায় একটা স্কার্ফ জড়িয়ে নিল আবীর। বছর আশির আবীর আর পঁচাত্তরের ঝর্নার সংসারে তৃতীয় জন আর কেউ নেই।                                                

মনোবিদ ডক্টর ঘোষ নানান খুঁটিনাটি প্রশ্ন করলেন ঝর্নাকে। এই নিয়ে বেশ অনেকগুলি সিটিং ইতিমধ্যে হয়েছে। ডক্টর ঘোষ আশ্বস্ত করলেন, ‘চিন্তার কিছু নেই। নায়ক আবীর তাঁর বর্তমান বৃদ্ধাবস্থা সহ্য করতে পারছেন না। যৌবনের সৌন্দর্যকে উনি অসম্ভব ভালোবেসেছেন। বয়সকে মেনে নিতে না পারা, ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায়, একে বলা হয় নার্সিসটিক পার্সোনালিটি। তাই উনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইছেন।’

ঝর্না শক্ত করে আবীরের হাত ধরলো। গাড়ির কালো শার্সি উঠিয়ে রাতের অন্ধকারে ছুটে যেতে থাকলো তারা... 


মাসুদার রহমান-এর ঝুরোগল্প

 


স্প্রে

৪ বছর বয়সের বিশপ দেখল, মা কাঁদছে। অল্প আগে একটি ফোন এসেছিল। চাপা কথাবার্তা হল ফোনটির ওপ্রান্তের সঙ্গে। তারপর ফোন রেখে নিজেকে জানালার পর্দার আড়াল করে মায়ের গোপন কান্না। জানালার ওপাশে সন্ধ্যামালতি ফুটে উঠছে তখন। সুবাস ছড়াতে থাকল সন্ধ্যার মলতিরা। বিশপ ভাবল, মায়ের চোখের জলের সুবাস সেটি। 

 

সকালে ঘুম থেকে জেগে বিশপ দেখল, বাবার নাওয়া খাওয়া শেষ। অফিসের পথে বেরুনোর আগে প্রতিদিনের মতো ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছেন। সেন্টের বোতল খুলে স্প্রে করছেন শরীরময়। সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। বিশপের মনে হল, গতসন্ধ্যায় মায়ের কান্না

সুবল দত্ত-এর ঝুরোগল্প

 

রিপোর্ট  


নিজস্বসংবাদদাতা: মুর্গালড়াই সমিতি, কর্ণক্ষেত্র

 
আজ অতিমার হিংস্র বদতমিজ লড়াইয়ের মুর্গাটি নিহত। না, এখন কোনো পরবের সময় নয়। তবে এই মুরগাটি এমন বলশালী, কখনো কোনো লড়াইয়ে হারতো না। ওর উপরে যারাই বাজী রাখতো,জিতে যেত। এটির মালিক অনেকগুলিই। তবে সমিতিতে এবার যিনি অধ্যক্ষ নির্বাচিত তিনি তান্ত্রিক। এখন তিনিই লড়াইয়ের চারণ ক্ষেত্র তৈরি করেন। খবর এই যে, প্রতিপক্ষ হারবেই, তা নিশ্চিত জেনেও এই মুরগাটির পায়ে যে তীক্ষ্ণ ছুরিটি বেঁধে দেওয়া হতো তাতে বিষ মেশানো হতো,যাতে নিহত পক্ষীটির মাংস যারা খেত তারাও অসুস্থ কমজোর হয়ে পড়ত। এমনিতেই হামেশা জোর করে জুয়া খেলতে বাধ্য করায় তারা সর্বসান্ত হয়ে কমজোর প্রতিবাদহীন। এই পরম্পরা দীর্ঘদিনের। কোনো পক্ষের কারো কোনো ওজোর আপত্তি থাকতো না। তবুও চলতো ওই মুর্গাটিকে ব্যবহার নিয়ে পলিটিকস। প্রতিটি লড়াইয়ে বীভত্স জিত হওয়ার জন্য ইদানীং এই লড়াকু মুরগাটির আচরণ বেশি মাত্রায় হিংস্র হয়ে গিয়েছিল। গতকয়েকদিন আগে ছাড়া পেয়ে মুর্গা খোঁয়াড়ের বেশ কিছু পক্ষীর হত্যা করে উড়ে পালিয়েছিল। সেটিকে আজ একটি পাঁচিলের ধারে মৃত পাওয়া গেছে। খবরে প্রকাশ যে পাখিটি উঁচু দেওয়াল উড়ে পার হবার সময় নিজের ছুরিতে চোট লেগে মরে। এটি অধ্যক্ষ মশাইয়ের কথা কিন্তু অন্য ভাগীদার সন্দেহ প্রকাশ করছেন। যাইহোক। মুরগাটি বেশ ভারী ছিল। তার মাংস রান্না করে অধ্যক্ষ বাদে সব পক্ষই আজ পার্টি করবেন। তবে যে খেরো খাতাটিতে সেই পক্ষীটির দ্বারা উপার্জিত জমা রাশি ও তার হিসাব কিতাব,সেটি এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।