বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল, ২০২১

সফিউন্নিসা-র অণুগল্প


 ভ্রান্তি

অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম, সুবিনয়কে একবার দেখতে যাব। শুনেছি অলকা মারা যাওয়ার পর থেকে আর অলকানন্দা-তে থাকে না। কানাডাবাসী মেয়ে বহুবার নিয়ে যেতে চাইলেও ওর সেই এক গোঁ এই উত্তরপাড়া ছেড়ে কোথাও যাবেনা। অলকার বড় সাধের সাজানো বাড়ি থেকে যেদিন অলকা একমাথা সিঁদুর নিয়ে একক যাত্রা করেছিল, সেদিন ওদের আর এক বন্ধু সুধাকর জোর করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল ওকে। মহানির্বাণ মঠে অলকার পারলৌকিক কাজ সেরে  গোপনে ঠিক করে রাখা ভাড়াবাড়িতে উঠে যায় সুবিনয়।

উত্তরপাড়ার এই দোতলা বাড়িটার একতলার দুটো ঘরে এখন সংসার সুবিনয়ের। গত পাঁচ বছরে দুবার এসেছে ওর মেয়ে সায়নী। মেয়ে তো বটেই ওর স্বামী শোভনও বারবার অনুরোধ করেছে শ্বশুরমশাইকে ওদের সঙ্গে কানাড়ায় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবার জন্য। টলানো যায়নি সুবিনয়কে।

এই পাড়ায় সুবিনয়কে নিয়ে একটা গুঞ্জন আছে। প্রতি রবিবার সকাল হতে না হতেই একটা সাইড ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কোথায় যায় সে ? স্টেশনে দেখেছে কেউ, কেউ দেখেছে টিকিট কাটতে, ট্রেনে উঠতেও দেখেছে দুচারজন। সুধাকরের সঙ্গে একদিন গড়িয়াহাটে দেখা হলে - বলেছে আমায় এসব কথা। আমি ওর খোঁজখবর নেবার অছিলায় ফোনও করেছি বার কয়েক। হ্যাঁ আর না-তে উত্তর সেরেছে। তারপর যা হয় ওদিক থেকে আগ্রহের অভাব আমাকেও ওর ব্যাপারে নিস্পৃহ করে তোলে।

গত পরশু সুধাকর ফোন করে জানাল, রাস্তায় পড়ে গিয়ে পা ভেঙে বিপদ ঘটিয়েছে সুবিনয়। পাড়া-প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। এখন প্লাস্টার নিয়ে বাড়িতে পড়ে আছে। সামনের রোববার ওকে দেখতে যাব ঠিক করেই ফেললাম।

 

সুবিনয়ের জন্য আমার গিন্নি টিফিন ক্যারিয়ার ভরতি করে পোলাও, চিকেন, চাটনি, পায়েস করে দিয়েছে। এই বয়সে আর ট্রেন ধরার ঝক্কি পোয়াতে ইচ্ছে না। একটা উবের ধরে বেরিয়ে পড়লাম।

বাড়িটা খুঁজে পেতে অসুবিধা না। ঢুকে গেলাম সহজেই ; কেননা  দরজাটা ছিল হাট করে খোলা। ওপরে থাকেন বাড়িওয়ালাবৃদ্ধ দম্পতি, খুব দরকার ছাড়া নামেন না। পরদাটা সরিয়ে ঢুকে থমকে গেলাম। অল্পবয়সি এক আধুনিকা সুবিনয়ের মাথাটা কোলের ওপর নিয়ে মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পরিচ্ছন্ন জামাকাপড়, ঘরটাও বেশ টিপটপ করে সাজানো-গোছানো। মনটা ঘৃণা আর বিরক্তিতে ভরে গেল। সুবিনয় ডাক দিলআয় আয় অণুতোষ। মেয়েটি তাড়তাড়ি উঠে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলবসুন। আপনারা কথা বলুন, আমি চা আনছি।

সে বেরিয়ে যেতেই বললাম, চা কেন তোর ঘরে জল খেতেও রুচি হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তোর এত অবনতি ! সুবিনয়ের মুখে লজ্জা বা অনুতাপের চিহ্নও নেই। সে হেসে বলল, নারে যা ভাবছিস তা নয়। আমারই সন্তান রেবেকা। তোর মনে আছে শ্যালির কথা? ওকে জীবনে পাইনি। আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে ওর বাবা ট্রান্সফার নিয়ে চলে যান। সামান্য অসতর্কতায় রেবেকা তখন এসে গিয়েছে ওর শরীরে। শ্যালি আর বিয়ে করেনি। এই কন্যার কথা শ্যালি জানিয়েছিলনিরন্তর যোগাযোগ রেখেছিল। অলকাকে আমি ফাঁকি দিইনি। সব দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করেছি। গাড়ি-বাড়ি-সন্তান সব দিয়েছি। শ্যালি ক্যান্সারে মারা গিয়েছে পাঁচবছর আগে। রেবেকা সব জানে। সম্মানসহ ওকে জীবনে স্থিতু করে দিয়ে আমার ছুটি।

নিন কাকু। সামনে ট্রে ভরতি লুচি তরকারি আর মিষ্টি হাতে রেবেকা। আমার অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলদাও মা।

 

পুষ্পিত মুখোপাধ্যায়-এর অণুগল্প

 


স্বপ্নে রঙ্গীন পাখি ওড়ে 

আমি স্বপ্নকে ভয় পেয়েছি, স্বপ্নে কুৎসিত সরীসৃপ ঘুরে বেড়াতে, আমি কুঁকড়ে থেকেছি। কালো মেঘ সব ভিড় করে আসত আমার ঘুমে। সেই চ্যাটচ্যাটে ঘুমে কোনো সুগন্ধি মাখামাখি হয়ে থাকত না। আমি একটার পর একটা বসন্ত পার করে এসেছি, মেদহীন, রঙ হীন..সেসব বসন্ত! আমার ভেতরে একটা পুরুষ, সুগন্ধ সন্ধানী এক পুরুষ, রঙ্গীন পাখির সন্ধানে থাকা একটা মানুষ সুগন্ধিত এক সমুদ্রের খোঁজে চোখ জ্বেলে বসে থেকেছে দিনের পর দিন। হঠাৎই কেন যে সেই সর্ব শক্তিমান জাদুকর সুগন্ধিত চামর দুলিয়ে ঝাঁকড়ে দেয় আমাকে, জানিনা। আমার অতৃপ্তির সাগরে একমুঠো রঙ্গীন গুলাল ছড়িয়ে দিলো, আহা,শেষ ঘন্টা শোনার আগে! এতেই আমি আবার দুলে উঠি। মনোরম এক উদ্যানে এসে পড়লাম। জানো, সেই বাগীচার একটা নাম আছে... বৃষ্টি। 

 অলক্ষ্যে কারো জাদুকাঠির ছোঁয়ায় আমার খরা বিজন প্রদেশে বৃষ্টি নেমে আসায় আমার আবার ঘুরে দাঁড়াতে ইচ্ছা করলো। আমার মাথার ওপর ঝুলে থাকা সেসব কালো মেঘ, দুহাতে সরিয়ে দিয়েছে বৃষ্টি।  আপাদমস্তক ভিজেছি প্রেমে, ভালবাসায়। সেই মহার্ঘ বস্তুর স্পর্শে নিজেকে বড় ধন্য মনেহয় প্রিয়ে, তুমি সেই অপার্থিব প্রেম দান করলে, আমি কৃতার্থ হলাম। সুগন্ধিত বৃষ্টির আঁচল জড়িয়ে নিজেকে বেশ তরতাজা যুবক ভাবতে ভালো লাগলো। এটাই তো বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র। তোমাকে আতরের মতো মেখে নিতেই ঘুমিয়ে থাকা রঙ্গীন সে পাখি আবার উড়ানে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সারাজীবন শুধু কাঁকর, পাথর জড়ো করে আসছিলাম, তুমি বসরা গোলাপ হয়ে সুগন্ধি কুড়োতে দিলে। আপ্লুত হলাম আমি। 

  তুমি খাঁচায় বন্দী রঙ্গীন পাখি, তুমি বলেছ। আমি মানিনি, ভাবতেও পারিনি। কেউ কি পারে, কেউ কি মজা পেতে পারে সে রঙ্গীন পাখিকে বেঁধে রেখে!

  আগল খুলে আমার স্বপ্নে যে ওড়ো তুমি, আমার সারাশরীরে শিহরণ বয়ে যায়, খেলে যায় বিদ্যুৎ।  আহা! সেই শীতের নির্জন দুপুরের ওম! তিরতির করে বয়ে যায় আমার প্রতিটি শিরা উপশিরায়। শিরিষ ফুলের মতো তোমার গোছা চুলে মুখ গুঁজে, তোমার টোল পড়া দুগালে ঠোঁট ঠেকিয়ে তৃপ্তি সাগরে ভেসে গেছিলাম। 

  সেই যে শুরু, এর সমাপ্তি রেখা যেন কখনো চোখে না পড়ে সখি। একটু আদর, একটু সোহাগ, কিছু কিছু খুনসুটিতে স্বপ্নের রঙ্গীন পাখি কি যে মিষ্টি সুরে গেয়ে ওঠে...দাও ,আরো দাও প্রাণ ...প্রাণ ভরিয়ে ... তুমি শীতল বাতাস, এক ঝলক আমার মুখে মাখিয়ে কি সরে যেতে চাও? কিন্তু আমি পারিনা, ধৈর্যের বাঁধ বেঁধে রাখতে। আমি শুধু জানি.. শুধু গানের দিন ... তুমি আমার স্বপ্নে রঙ্গীন পাখির গান হয়ে এলে! মুগ্ধতার সীমা ছাড়িয়ে আমি প্রতিনিয়ত প্রতীক্ষমান।  আমি বুঝি, উপলব্ধি করি তুমি আমার ঘুমের দেশে, স্বপ্ন জগতেই বিচরণ করে ,আমাকে কষ্ট দিতে ভালবাসো।  নাহলে কেন এই গানভরা দিনগুলো শুকিয়ে যেতে দিচ্ছোপৃথিবীর সব সুগন্ধ হয়তো একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু তোমার মন, শরীরের সুগন্ধ কোনদিনই নিঃশেষিত হওয়ার নয়।  আমি আমোদিত হয়ে আছি প্রিয়, কাছে থেকেও কতো দুর..কতদুরে তুমি।  তোমার গোলাপ বাগান ভ্রমণে আর কি কোনো অধিকারের জায়গা ছেড়ে রেখেছো!