সোমবার, ১ মার্চ, ২০২১

সফিউন্নিসা-র অণুগল্প

 

নিছক গল্প নয় 

 

সূর্য পাটে  বসার আগেই পলি চলে এসেছে নির্জন বটগাছটার তলায়। শেকড়ে পা ছড়িয়ে বসতেই দেখতে পেল কচুড়িপানা ঢাকা বিশাল পুকুরের কালো জলের ওপর জেগে উঠেছে প্রকাণ্ড কালো মাথা আর দুটি গভীর চোখ। তার মানে দূর থেকেই ওর পায়ের শব্দ বা গায়ের গন্ধ ঠিক টের পেয়েছে টিক্কা। মুঠো থেকে মুড়িগুলো ছড়িয়ে দিতে গিয়ে পলির দুচোখে জলের ধারা। আজ আর গল্পই করতে পারলো না ওর সঙ্গে।

এগারো বছরের পলির অনেক বন্ধু--ঘোষপুকুরের এই দশসেরি কাতলা টিক্কা, রেবাদের বাড়ির দীঘলচোখের শামলিগাই যে ওকে দেখলেই আদরের ডাক দেয়- হাম্বা, পাড়ার লালু-ভুলু-রাঙা-- রাস্তায় বেরোলেই পায়ে পায়ে-সঙ্গে ঐকতান,কার ডাক কোনটা একমাত্র জানে পলিই ,বাড়িতে একপাল বেড়াল--সবসময় আদরে গলে পড়ে ওকে দেখলেই। 

মাঠপাড়ার ভ্যানরিক্সাচালক হারু মণ্ডলের মেয়ে এমন গোত্রছাড়া  কী করে কে জানে? ছোট্ট থেকেই ওর প্রাণের বন্ধু এরাই। ওদের সঙ্গে রোজ গল্প করা চাই- ওর। তৃতীয় শ্রেণিতে অনেক কষ্টে লেখাপড়া টেনে নিয়ে গিয়ে এত ক্লান্ত যে আর ওকে স্কুলমুখো করানো যায়নি। পরের দুটো ভাই স্কুলে যায়। মিড ডে মিলে চলে যায় তাদের। ভোরে বাবা বেরিয়ে পড়ে ভ্যানরিক্সা নিয়ে। মাও চলে যায় সকাল সকাল ইছামতীর পাশে তপার চরে। সেখানে গলদা চিংড়ি ছাড়নোর কাজ করে বহু মেয়ের সঙ্গে। কেজি দশেকের কাজ করতে পারলে সেদিনের চাল-ডাল-তেল-নুনের উপায়টা হয়ে যায়। সকালে তাই ব্যস্ততার শেষ নেই পলির। বাসন মাজা শেষ করেই কলসি নিয়ে বাবুপাড়ার কাছে টাইমের জল ধরতে ছোটা, ফিরে এসে ঘর লেপা, রান্না করা। মা ভাত নিয়ে চলে যায় আড়তে। মুশকিল হয় লালু-ভুলু-রাঙাদের নিয়ে। ওরা এমন করে ঘিরে ধরে যে কলসি নামিয়ে রেখে আদর করতে হয় ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে। মা এক এক দিন দেরির জন্য চড়-থাপ্পড় কষিয়ে দেয়। মা ভাত, একটা তরকারি করে নিয়ে বেরিয়ে গেলে পলি আগের দিন মায়ের কোল আঁচলে লুকিয়ে আনা চিংড়িকটা নিয়ে বসে। নুন হলুদে জ্বাল দিয়ে রাখা মাছগুলি ঝোল করে। বাবা দুপুরে খাবে, রাতেও হবে। ভাইদুটো স্কুলে বেরিয়ে গেলে। শুরু হয় বেড়ালদের দাবি। মাছের একটুখানি ঝোল মাখিয়ে ভাত দেওয়ামাত্র চেটেপুটে সব শেষ। তারপরে ওদের আদর করতে করতে কেটে যায় অনেকটা সময়। বাবার ভ্যানরিক্সার শব্দ শুনে লাফিয়ে ওঠে পলি। সর্বনাশ ! দুটোর ট্রেন কখন বেরিয়ে গেল শব্দই পায়নি! তাড়াতাড়ি মেঝেতে ঠাঁই করে বাবাকে খেতে দিয়ে চান করতে ছোটে পলি। কাপড় কেচে, চান সেরে  ফিরে এসে  খেয়ে, বাসন মেজে উঠতে চারটে বেজে যায়। বাবা সেই ফাঁকে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে আবার বেরনোর তোড়জোড় করে ততক্ষণে।

পলির সময় বাড়ন্ত। রোজ। বিকেলের আগে আসতে চাইলেও হয়ে ওঠে না। টিক্কা ওর জন্য অপেক্ষা করে। ছুটতে ছুটতে এসে বটের শেকড়ে বসতেই ভেসে ওঠে সে। আহা! ক্ষিদে পায়না বুঝি ওর ! সঙ্গে আনা মুড়িগুলি ছড়িয়ে দেয় ঘাটের কাছের ফাঁকা জায়গাটায়। টিক্কা কেমন ভেসে ভেসে এগিয়ে এসে কপ কপ করে খায় আর পলি গল্প জোড়ে তার সঙ্গে।

 

কালই পলিকে ওর মা পাঠিয়ে দিচ্ছে অনেক দূরে। কলকাতার কোন এক বাবুর বাড়িতে। সেখানে থাকা খাওয়া আর বাচ্চা দেখাশোনার কাজ। মাসান্তে মাইনের দু হাজার টাকা পলির মা গিয়ে নিয়ে আসবে আর মেয়েকে দেখেও আসবে। পলির দুচোখ ভেসে যাচ্ছে। ওর এই টিক্কা, ওর বেড়াল তিনটে আর তাদের ছানারা, ওর লালু-ভুলু-রাঙারা, ওর গল্প করার, আপন মনে কথা বলার জন্য কেউ নেই, কিচ্ছুটি নেই সেখানে।টিক্কা বোধহয় ওর কান্না টের পেয়েছে। সে ধীরে ধীরে আরও এগিয়ে এসেছে একেবারে ঘাটের কাছে। কিছু বোধহয় বলতে চায় ও। পলি আস্তে আস্তে এগিয়ে যায়, একটার পর একটা সিঁড়ি নামতে থাকে। 

সূর্য ডুবে গিয়েছে। অন্ধকার তার ডানা ছড়িয়ে দিয়েছে কখন!

দেবদুলাল পাঁজা-র অণুগল্প

 

পুলিশ

বৃন্দাবন মানে বৃন্দাবন জানার বয়স এখন বাষট্টি পেরিয়ে গেছে। এই বঙ্গোপসাগরের কূল -ঘেঁষা ঘোড়ামারা দ্বীপে সে বহুদিন পুলিশের দায়িত্ব পালন করে আসছে। মেলা হোক, খেলা হোক কিংবা পূজোপার্বণ লাঠি হাতে সে হাজির ঠিক সময়ে।  কেউ তাকে কোনোদিন চাকরিটা যেহেতু দেয় নি, তাই তার রিটায়ারমেন্টও হয় নি আজো নিয়ম মেনে। নিন্দুকেরা বলে... মরলে নাকি তবে ওর চাকরি যাবে। বিশেষ করে প্রতি হাটবারের দিনমানে শনিবার দিন... বৃন্দাবন স্বেচ্ছায় নিজের এই মহান দায়িত্ব পালন করে। গত তিরিশ বছর ধরে।
ঘোড়ামারা দ্বীপের দুটো দিক অবিরাম ভেঙে চলেছে সমুদ্রের ভয়াল টানে। আর বৃন্দাবনের সংসারও ভেঙে ভেঙে সে এখন একান্তই একা একটা নিঃস্ব মানুষ। কমবেশি কুড়ি বছর।
দুপুরের পর সে পুলিশ। কিন্তু, সকালবেলায় বৃন্দাবন একদম অন্য মানুষ। দ্বীপের নদীর বাউন্ডারিতে ঘুরে ঘুরে মদের বোতল আর ককশীটের  ছোটবড় টুকরো সংগ্রহ করা বৃন্দাবনের বহুদিনের অভ্যাস। পরে সেগুলো আড়তে নামমাত্র দামে বিক্রি করে সে। দু-পয়সা এভাবে  আয় না করলে এই বেতনবিহীন চাকরি বজায় রাখা এতোদিন তার পক্ষে কীভাবেইবা সম্ভব হতো!
গ্রামের লোক অবশ্য অন্য কথা বলে। বাপ-মা বৃন্দাবনকে বিয়ে দিয়েছিলো ঠিক সময়েই। কিন্তু সেই যৌবনকাল থেকেই ঈষৎ আড়পাগলা হওয়ার কারণে ওর বউ সুন্দরী ওকে কাছে ঘেঁষতে দিতো না একেবারেই। যত দিন গেছে বৃন্দাবন আড়পাগলা থেকে ফুলপাগলা হয়েছে। সুন্দরী আর বৃন্দাবনের  মধ্যেকার ফাঁকও বাড়তে বাড়তে সমুদ্রের মতো হয়েছে। দশ বিঘা চাষের জমি ছিলো বৃন্দাবনের বাপ নিবারণের। নিবারণ গত হওয়ার পর সে সব এখন সুন্দরীর জিম্মায়। সুন্দরী বিয়ে করে নি নতুন করে। তবে তার একজন ধরা বাবু আছে। তার নাম হরিপদ। সে পঞ্চায়েতের মেম্বার। সুন্দরীর থেকে কম করে পাঁচ-সাত বছরের ছোট। প্রতিদিন পঞ্চায়েতের কাজ সেরে সন্ধেবেলা হরিপদ আর সুন্দরীর যে লীলাখেলা চলে তা গ্রামের কারোরই অজানা নেই। গ্রামের সবাই সব জানে আর ব্যাপারটা যেনো বেশ উপভোগও করে।
বৃন্দাবন রাত নটায় বাজার থেকে ফিরে বাইরের বারান্দার খাটে শুয়ে পড়ে ক্লান্তিতে। আড়ালে সবাই বৃন্দাবনকে নিয়ে হাসাহাসি করে আর বলে... শালা নাম্বার ওয়ান... ঘরের  ডবকা বউকে দিনের পর দিন লোকের সংগে শুতে দেখে দেখে ওর মাথাটাই  গেছে...