রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

রন্তিদেব সরকার-এর ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী "ঢাকার ডায়েরি"


 ঢাকার ডায়েরি

ট্রেন ছাড়ার সময় সমাগত। আমরা ঘন ন ঘড়ি দেখছি। আমাদের গন্তব্যস্থল আবার আমাদের সময় থেকে ‘আধ-ঘন্টা’ এগিয়ে। সেটাও আমাদের কাছে এক অন্যতম আকর্ষণ।পাশাপাশি দেশ অথচ সীমান্তরেখা পেরোলেই সময়-সারণি বদল। তখন আমাদের ঘড়িতে কাঁটা ঘুরিয়ে আধাঘন্টা এগিয়ে নিতে হবে ! আরেকটা বিশেষ আকর্ষণ আমার কাছে ছিলবড়পুত্র ঋকের দেওয়া একটি বিদেশি ব্র্যান্ডেড হাতঘড়ি-‘ফসিলকোম্পানির। এটি নাকি পৃথিবীর যে কোনো দেশে নিজে-নিজেই ‘টাইম’ সেট হয়ে যায়। ঘড়ির মালিককে কিছু করতে হয়না। অনেক ফাংশন আছে। আমি সব জানিনা। শুধু নিজের মোবাইল সেটের সঙ্গে ‘পেয়ারিং’ করতে হয়। সেটা ‘ফসিল’ কোম্পানির শোরুমে করিয়ে নিয়েছি অবশ্য। এখন সেটার পরীক্ষা। খেয়াল রাখতে হবেকখন ‘টাইম’-টা পালটায়আর ঠিক -১০মিঃ হতেই ট্রেন দুলে উঠল মৃদু গুঞ্জনের মধ্যেই।খুশির গুঞ্জন। এসব ভাবতে ভাবতেই ‘দেবদূত’-এর মত একজন আমাদের কেবিনে উঁকি দিয়ে গেলযার কাছে পাওয়া যাবে এক কাপ গরম ‘চা’ ! দাও ভাই, বেশি করেই দাও , বাঁচাও। তাড়াতাড়ি দাও লক্ষ্মণ,কোথা ছিলে এতক্ষণ ? চা-ফেরিয়ার অপাঙ্গে দৃষ্টি হানল আমার চোখের তারায়- ‘আমার নাম তো লক্ষ্মণ নয়’- মুখে একরাশ বিস্ময়।আরে ভাই, এখন এককাপ চায়ের ভীষণ জরুরি। তোমার নাম যাই হোক না কেন, কি এসে যায় তাতে ?’ লোকটি হেসে ফেলে।    চায়ের পিপাসায় ছাতি সাহারা মরুভূমি হয়ে আছে-‘’ মিথিলেশদার আকুতিতে আমাদের চারজনেরযে কতটা প্রতিনিধিত্ব ধ্বনিত হচ্ছেতা আর বলার নয়। সময়মত এক কাপ চা-এর যে কি অসীম উদ্দীপনা বাড়িয়ে দেবার ক্ষমতা রয়েছেআমরা নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। যেন জীবনীশক্তির নবায়ন ঘটল।আমরা চললাম অভীষ্ঠ লক্ষে। ‘দুগগা-দুগগা।



আমাদের কামরায় আমরা একটু সেট হবার পর আর তেমন কোনো  যাত্রী-হাঙ্গামা ফেস করতে হয়নি এখনো। মনে মনে ধরে নিয়েছি আরো দুজন যাত্রীর আমাদের কেবিনে আসার কথা। কিন্তু আর কেই বা আসবে ? ট্রেনতো ছেড়ে দিয়েছে। আর এই ট্রেনের সবথেকে মজার পার্টহলোঢাকা পর্যন্ত এই ট্রেন থেকে কেউ নামতে পারবেনাকেউ উঠতেও পারবেনা।  মাঝে শুধু দুবার থামার কথা। একবার, ‘গেদেস্টেশন এলে সিকিউরিটি স্টাফ বদল হবে।ভারতের সীমান্তরক্ষাবল (BSF) নেমে যাবেনিরাপত্তার ভার নেবে বাংলাদেশ পুলিশ (BDR) এই পালাকীর্তন সাঙ্গ হতে মিনিট ১৫লাগবে। তারপর ট্রেন ঢুকবে বাংলাদেশ সীমান্তের মধ্যে। থামবে গিয়ে সীমান্তবর্তী ‘দর্শনা’ স্টেশনে। এখানে আবার যাত্রীদের জন্য লাঞ্চ-প্যাকেট উঠবে।  এইসব বার্তা চা-ওয়ালা ভাইয়ের কাছে শুনতে শুনতে হঠাৎ খুব চাগিয়ে উঠলো খিদেটা।ব্রেকফাস্ট কোথায় পাব ভাই ?’ হকারটিকে জিজ্ঞেস  করাতে জানাল যে এখন ব্রেকফাস্ট খেলেলাঞ্চখেতে পারবেন না। বরং সঙ্গে যা আছে টুক-টাক খেয়ে নিন, আমি আবার এক প্রস্থ কফি খাইয়ে দেব। কারণ দর্শনা-তে লাঞ্চ-প্যাকেট বেলা ১০টায় উঠবে আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাইকে দিয়ে দেওয়া হবে। এই ধরুন, সাড়ে দশটার মধ্যে।মানে লাঞ্চ খেতে এখন ঢের দেরি। এদিকে খুব খিদে পেয়েছে সবার। এই সন্ধিক্ষণে আমাদের কামরার সেইমিসিংযাত্রীটি এসে বসল আমাদের কেবিনে।সত্যি-সত্যি আপনার সীট আমাদের কেবিনে, কেবিন-সি তো ?’ কমবয়সী যুবকটি সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে জানালো।তা ভাই লক্ষণ, কোথায় ছিলেন এতক্ষণ,  আমাদের ছেড়ে ?’ মিথিলেশদার এমন রসিকতা  শুনে ছেলেটি হেসে ফেলল। এক্কেবারে কাঠ-বাঙ্গাল বলতে যা বোঝায়- ছেলেটি তাই। জানাল ওর কয়েকজন বন্ধু অন্য কেবিনে  থাকায় সে ওদের সঙ্গেই ছিল। বলেই আবার  বেরিয়ে গেল সেই অজানা বন্ধুদের উদ্দেশে। বলতে গেলে আমরা চারমূর্তিই তখন এই সি-কেবিনের একচেটিয়া দখলদার। তখন আমাদের কাজল-দা হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গল!  আর হাঁড়ি থেকে বেরোল একটি চৌখুপি প্লাস্টিকের বাক্স। খিদের পেটে আমাদের তিনজনার লোলুপ দৃষ্টি পড়ল বাক্সর উপর।কি আছে তোমার পেটিকায় ? খোলো খোলো, বৃথা কোর না পরিহাস।’ ‘শ্যামানৃত্যনাট্যে কোটালের গানের লাইনগুলো মনে চলে এল- মিথিলেশদার দরাজ গলায়। সত্যি আমাদের তর সয়না।  কাজল-দা পেটিকা খুলতেই উঁকি দিল হলুদ-বরণ এক নধর কেক !! তাও আবার স্বয়ংবৌদি-মেড’- মানে –-গৃহনির্মিত !! আহা, রসনাকূল মুহূর্তে রোমাঞ্চিত হইয়া লকলক করিতে লাগিল।তাড়াতাড়ি বাবু হয়ে বসে কেক-নিধন পর্ব শুরু হয়ে গেল। আহা খিদের মুখে এহেন গৃহনির্মিত জাম্বো কেক। জাস্ট ভাবা যায়না। সাধু সাধু। পুঞ্জীভূত অমৃতবচন শুরু হলো বৌদির নামে। কাজল-দাকে দিয়ে ফোন- করানো হল বৌদিকে আর বৌদি- উপর  অভিনন্দনের কোরাস বর্ষিত হইতে লাগিল। এমন স্বতঃস্ফূর্ত অভিনন্দন, বৌদি বোধহয় কল্পনাতেও আনিতে সমর্থ হন নাই। বর্ষিত হইতে লাগিল।  আমাদের ক্ষুন্নিবৃত্তি ঘটল ভালোভাবেই। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের কেবিন-সি তা হাজিরশ্রী দেবদূত কফিওয়ালা।খাদ্য-পরিক্রমা আপাতত শেষ। তখন ঘড়িতে আটের কাঁটা ছুঁই-ছুঁই। এরপর সবার বাড়ির কথা মনে পড়ল। পালা করে ফোন শুরু হলো। কারণ এরপর বাংলাদেশ সীমানায় ঢুকলেই তো ফোন-কাট। আর ফোন করা যাবেনা। ঢুকে পড়বে বাংলাদেশ গ্রামীন ফোন-এর আওতায়। আর আমাদের হবে কন্ঠরোধ। কিন্তু একদিনের জন্য আর কোন বিকল্প উপায় খোলা নেই। বুয়া যদিও একটিসিমমিথিলেশ-দার জন্য ম্যানেজ করে দিয়েছে। একটা ফোনেই নাহয় পালা করে আমরা ফোন করে নেব। তবে বুয়া আমাদের জন্য একটা দারুণ কাজের কাজ করে দিয়েছে। আমাদের হোটেল-এর দুদিনের পুরো রুম রেন্টঅনলাইনপেমেন্ট করে দিয়েছে INR দিয়েফলেবাঁচলবিদেশিমুদ্রা।আমাদেরএকেকজনেরহাতেযাবাংলাদেশী ‘টাকা’ রয়েছেতাতেআমাদেরপ্রয়োজনীয়কেনাকাটাকরতেপারবএইহচ্ছেবুয়াআমাদেরএইট্যুর-এরনেপথ্য-দিশারী।সাবাসবুয়া।ওর হাতে যেন রিমোট কন্ট্রোল। আমরা ওর প্রতি কতখানি যে কৃতজ্ঞ তা আর বলার নয়।বুয়া জিন্দাবাদ থ্রি চিয়ার্স ফর মিথিলেশ-দা, হিপ-হিপ-হুরররে

ট্রেন ছুটছে জোর তালেই। যদিও মধ্যম গতিতে। হয়ত এই রেলট্র্যাকে এর  থেকে জোর গতিতে চালানো যায় না। কারণ এটি বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রেন এবং যাত্রী নিরাপত্তার কারণে এই সময়ে এই ট্র্যাকে রেল-ট্রাফিক ফাঁকাই রাখা হয়।গ্রীন  করিডরযাকে বলে আর কি- কি আর করা   তবুআমারধারণাএই মধ্যম গতি মানে সাবধানতা। এই সমগ্র যাত্রাপথের দুরত্ব ৩৭৫ কিলোমিটার আর -১০এ ছেড়ে বিকাল -১০এ পৌঁছানো মানে দাঁড়াচ্ছে ৯ঘন্টা সময়। অর্থাৎ গড়পড়তা ঘন্টায় ৪১ কিলোমিটার গতি ! যাই হোক মনে রাখতে হবে সুকান্তর রানার-কে –‘শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে এই মুহূর্তে গাড়ি টায় পৌঁছুবে, নিয়ে মোটেই আমাদের মাথাব্যাথা নেই। ইতিমধ্যে ট্রেনগেদেস্টেশনে পৌঁছাতেই এক মৃদু চাঞ্চল্য সবার মধ্যে লক্ষ করা গেল। দেশের সীমারেখার শেষতম স্টেশন। ট্রেন থামতেই গাঢ় নীল-রঙা টিউনিক পরিহিত বাংলাদেশী পুলিশ বাহিনীর আধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রে-সজ্জিত আধা-সামরিক বাহিনীর তন্বী তরুণীরা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ট্রেনের ভিতরও বাংলাদেশ পুলিশের ব্যস্ত আনাগোনা চোখে পড়ল। মিনিট পনেরো দাঁড়ানোর পর ট্রেন আবার দুলে উঠল। একটু পরেই নাকি বর্ডারলাইন পেরিয়ে বাংলাদেশ ঢুকে যাবে। একরাশ আগ্রহ নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রয়েছি। আমাদের সঙ্গী সেই  দলছুট একমাত্র বাংলাদিশি সওদাগর- আরিফ মহম্মদ ভাইজান। সেই আমাদের মোটামুটিগাইড’-এর কাজ করছে। কিছুক্ষণ পরেই আমরা বর্ডার ক্রস করলাম। জানালা দিয়ে একটি মেরুনরঙা গুমটি ঘর, কিছু সাইনবোর্ড এবং অয়্যারলেস টাওয়ার চোখে পড়ল। ঘড়িতে চোখ রাখতেই দেখি তা কখন আধ ঘন্টা এগিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের জাদুতে চমৎকৃত হলাম। গতমাসে যখন বড়পুত্র আমাকে ঘড়িটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল এবং বলেছিল এসব কথা, আমার কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। এখন তার প্রমাণ, হাতেনাতে পেলাম। এবার আমার ঘড়ির সময় দেখে বাকিরা সবাই তাদের ঘড়িতে বাংলাদেশের সময় মিলিয়ে নিল। এখন আমরা বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে যাচ্ছে যা আগে কোনদিন অনুভব করার সুযোগ হয়নি। জানালা দিয়ে শুধু হরিৎক্ষেত্র আর জল-থইথই মাঠঘাট। তার পাশেই দুপাশে কৃষিজীবি সাধারণ মানুষদের দেখছি। আমাদের রাজ্যের গ্রামের মানুষদের মতোই চাকচিক্য, জাঁকজমকহীন সহজ-সরল জীবনধারা ট্রেনে বসেই যেন অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিল একবার যদি নেমে চলে যেতে পারতাম সবুজ-ঘেরা গ্রামের মানুষজনের মাঝে। কিন্তু তার কোন উপায় যে নেই।



দেখতে দেখতেই কিছুক্ষণের মধ্যেদর্শনাস্টেশনে ট্রেন ঢুকল। ছোট্ট স্টেশন। প্রায় জনবিরল স্টেশন মনে হচ্ছিল। শুধু দেখা যাচ্ছিল বাংলাদেশ রেলওয়েজ-এর সাদা ইউনিফর্ম পরা কিছু ছেলে ট্রে- পরে থরে থরে সাজানো প্লাস্টিকের বক্স নিয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ট্রেনে উঠবার জন্য। ট্রেন থামতেই তারা দলে দলে উঠে সব কামরা গুলিতে ছড়িয়ে পড়ল। আর কিছুক্ষণ পরেই তারা লাঞ্চ সার্ভ করে দেবে। আরিফ ভাই জানাল ওরা প্রত্যেক কামরাতেই আসবে আমাদের কি লাগবে জিজ্ঞাসা করে আধঘন্টার মধ্যেই তা বিলি করে দেবে। হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি, শ্রী দেবদূত কফিওয়ালা কফি খাওয়ার পর আমাদের অর্ডার জেনে নিয়ে ফোন করে দিয়েছিল। চার রকমের প্যাকেট ওদের কাছে পাওয়া যাবে। নিরামিষ মীল, মাছ-ভাত-ডাল-ভাজা, চিকেন কারি আর ডাল-ভাত এবং চিকেন বিরিয়ানি। আমরা সবাই নিরাপদ মাছ-ভাতে আস্থা রাখলাম। এবং ১৫০ টাকায় খুব নিন্দে করার মত খাবার নয়। অন্ততঃ আমার তো মোটেই খারাপ লাগেনি। আরিফ ভাই অবশ্য চিকেন-বিরিয়ানিতেই ভরসা করল। কিন্তু আমি আর মিথিলেশদা বাদে বাকি দুজন, কাজল-দা আর পলু, এই খাবার পর  যে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিল তেমন বলা যাবে না। ওদের মনোভাব খানিকটা এমন ছিল, যেটা আমাদের গ্রামের লোকেদের কাছে শুনতাম-‘আহাও লয়, ছি ছিও লয়।এদের কাছে মতামত নেবার পর এর থেকে সুপ্রযুক্ত বিশেষণ আর কিছু হতে পারেনা।  আর তাছাড়া আমাদের সামনে আর কোন অপশনও তো ছিল না। যে, সেই আপ্তবাক্যটি আবার এসে পড়ল- ‘পড়েছি যবনের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে 


ক্রমশ...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন