কলিকেতার গীর্জে
ভোলা ময়রা , এক কবিয়াল আসরে এন্টনি ফিরিঙ্গিকে বলেছিল
"ভজগে যা গে যীশুখ্রীষ্ট শ্রীরামপুরের গির্জেতে!"
কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের নানান চার্চকে ঘিরে রয়েছে বিচিত্র সব গল্প। না ঠিক গল্প নয় আসলে তা ইতিহাস। কিংবা ঐতিহাসিক গল্পগাছা । যেমন ধরুন , কলকাতার প্রথম ইটের বাড়ি । তাও কিন্তু একটি চার্চ, আর সেটি যে কোনটি তা আমরা ফেলু ভক্তরা অল্প বিস্তর সবাই জানি । আবার অনেকেই জানিও না বটে। কিন্তু তার পেছনের গল্পটি তা কিন্তু আমরা সত্যি সত্যিই অনেকেই জানিনা। আবার যেমন ধরুন না কেন , ক্রিসমাস কবে পালিত হয়? সবাই এক বাক্যিতে বলে উঠবে , সে কি হে লেখক বাবু তাও জানো না বুঝি ! পঁচিশে ডিসেম্বর । আরে জানি মশাই ! জানি। কিন্তু আপনি কি জানেন এই খাস কলকাতার বুকেই এমন এক চার্চ আছে যেখানে খ্রিস্ট উৎসব ২৫শে ডিসেম্বর নয়, 6ই জানুয়ারি । কি কেমন ? বুঝলেন কি, না বুঝলেন। আজ সেসবেরই হদিস দিতে এসেছি ঝোলা ভর্তি করে ।
সময়টা ১৭৩৭ , কলকাতা পড়ল এক ভয়ানক সাইক্লোন এর খপ্পরে। ভেঙেচুরে তছনছ সব ।তখনও কিন্তু ব্রিটিশ শাসনে আসেনি কলকাতা, সেই বিধ্বংসী ঝড়ের থাবায় যেমন ভাঙা পড়ল নানান ছোট বড় বাড়ি, ঠিক তেমনি ভাঙল আমাদের শহরের প্রথম গির্জাটি । অবশেষে সাহেবি সহায়তায় আবার গড়ে উঠলেও তা । আবার ধ্বংস হলো ১৭৫৭ সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণে । তারপর ঠিক কি হলো জানা যায় না , ইতিহাস দেয় না উত্তর । যদিও এত ঘটনা বহুল ইতিহাসের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই স্থাপত্যটির আজ যদিও কোন অস্তিত্ব নেই । কিন্তু কথা হল ঠিক কোথায় ছিল সেই চার্চটি ? আর কি বা নাম ছিল তার ? তা ছিল হল ঠিক সেই কোনাটায় ,যেখানে এখনকার ডালহৌসী স্ক্যয়ার ও ক্লাইভ স্ট্রীট এসে একই অন্যের হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়েছে। আর তার নাম হলো সেন্ট অ্যাণিস্ (St.Anne) নাম অনুসারে ।
এত গেল প্রথম গির্জার গল্প , এখন আসি অন্য একটি কথায় । সালটা ১৮১৪ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চার্টার নবীনিকরণ হয়েছে , আর এদেশে নিযুক্ত গোরাদের জন্য আর , আরও ব্যাপকভাবে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার প্রসারের উদ্দেশ্যে ওই চার্টারই খাস কলকাতার জন্য তথা ভারতের জন্য বিশপ নিযুক্তির কথা বলে । আর সেই সুবাদেই কলকাতায় এলো এ দেশের সর্বপ্রথম বিশপ্ থমাস ফ্যানস-অ( Thomas Fanshaw) ।আর ২৪ শে নভেম্বর ১৮১৪ তে কলকাতার মাটিতে পা দিয়েই দেখলেন যে কলকাতার একমাত্র চার্চ , সেন্ট জন্স চার্চ আকারে যেমন ছোট, আকৃতিতেও একেবারেই অতীব সাধারণ। যদিও এই সেন্ট জন্স কিন্তু সবথেকে প্রাচীন চার্চ । দেশের থাকা চার্চ গুলির মধ্যে, শুধুমাত্র আর্মেনিয়ান আর মিশন চার্চ এর পরেই। চার্চের গায়ের ফলক থেকে জানা যায় ১৭৮৪ তে, ৬ এপ্রিল ওয়ারেন হেস্টিংস এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মূল স্থপতি হলেন একজন আর্মেনিয়ান জেমস অ্যাগ্ । আজও যদি এর ভেতরে যান দেখতে পাবেন অপূর্ব সব মার্বেল ব্যস্ রিলিফের কাজ ও স্টেন কাঁচের কাজ। যদিও এখানকার আসল আকর্ষণ কিন্তু ওইসব কারুকার্য নয় , আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এপিটাফ্ ও প্লাকিউস্ গুলো । সোজা কথায় খোদাই করা লেখা জোকা মার্বেল বা অন্য পাথরের উপর । এখানেই আছে একদা কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে প্রচারিত জোব্ চার্ণকের সমাধি, সমাধির উপরে ল্যাটিন আর তার ইংরেজি তর্জমায়ের রচিত এপিটাফ্ । আবার চার্নকের মেয়ের সমাধিও ওখানেই । আরো একটি কম আলোচিত সাহেবের প্ল্যাকিউস্ আছে এখানেই, তার গল্পই এখন বলবো। সাহেবের নাম জেমস প্যাটেল, না ভারতীয় নন কোনো ভাবেই এই সাহেব। ছিল, যাকে বলে ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত মিথ্যাবাদী , এরকম একজন আপাদমস্তক মিথ্যাচারীর জন্যে বলা হয় শয়তানও তাকে ভারত ছেড়ে যেতে দেয়নি, এমনকি মৃত্যুর পরও। সাহেবের মৃত্যু হয় ১৮৪৫ নাগাদ আর তারই পূর্বনির্দেশ মত তাকে ব্রিটেনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় জাহাজে । কফিনের মধ্যে রাম (rum)ভরে , তাতেই মৃতদেহটি পুরোপুরি ডুবিয়ে তুলে দেয়া হয় তার স্ত্রীর কেবিনের মধ্যে । তখন তো আর এখনকার মতো ব্যবস্থা ছিল না । গার্ডেনরিচ থেকে তো জাহাজ ছাড়লো সাহেবের মাতৃভূমির উদ্দেশ্যে। তখনো ভারত মহাসাগর পেরোতে পারেনি জাহাজ, মাঝ রাত স্ত্রী বিছানায় বসে জানলা দিয়ে অন্তহীন কালো নোনা জল রাশির দিকে চেয়ে রয়েছে। ঠিক তখনই একটা বীভৎস শব্দ ধেয়ে আসে তার দিকে। আর পিছন ফিরে চাইতেই সে যা দেখে , তাতে তার বুকের ধরফরানি বেড়ে যায় না তার বদলে একেবারেই থেমে যায় চিরদিনের মত । কিন্তু কি দেখে সে ? দেখে কফিন ভেঙে সাহেবের মৃতদেহ সোজা উঠে বসেছে। ভাবুন একবার মাঝ রাতে আপনি যদি ফাঁকা ঘরে ওরম দৃশ্য দেখতেন তবে আপনার অবস্থা কেমনটা ঠিক হতো ! বিপত্তির শেষ এখানেই নয় কিন্তু। ঘটনার ঘনঘটার আরো বাকি ছিল কিছু । জাহাজের খালাসীরা সাহেব আর সাহেবের বউ দুজনের মৃতদেহ ওই একই কফিনের রামের মধ্যে কোনরকমে ভরে দিল। কিন্তু পরদিন রাত আসার আগেই নাবিক আর খালাসীরা লোভ সামলাতে না পেরে , ওই মৃতদেহের চুবানো সমস্তটা রাম খেয়ে ফেলে পুরোপুরি মাতাল হয়ে গেল। বুঝে দেখুন একবার নেশার কি টান ! আর এর ফল যা হওয়ার তাই হলো, নেশাগ্রস্ত নাবিক জাহাজ নিয়ে সোজা ধাক্কা মারল স্যান্ডব্যাকে আর জাহাজ দুটুকরো হয়ে ডুবেই গেল । আর ডুবল সাথে কফিনবন্দী সাহেব ও তার বউও। সমাধিস্থ হল প্যাটেল সাহেব সস্ত্রীক ভারত মহাসাগরের বুকে। তাই বলা হয় চরম মিথ্যেবাদীকে শয়তান এতটাই ভালোবেসে ছিল যে তাকে আর ভারত ছেড়ে যেতেই দেয়নি কোনদিন । এছাড়াও আছে রোহিলা যুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, লেডি ক্যানিংয়ের স্মৃতিসৌধ, এখানে বলে রাখা ভালো এই লেডি ক্যানিংয়ের নামেই কিন্তু আমাদের অতি পরিচিত ও প্রিয় একটি মিষ্টির নাম 'লেডিকেনি'। আর আছে সেই কুখ্যাত মিথ্যে অপবাদের সৌধ ব্ল্যাক হোল মনুমেন্ট যার না আসল নাম 'হলওয়েল মনুমেন্ট' । যদিও বিশপ ফ্যানস-অ প্রথম যখন দেখেন এই সেন্ট জন্স চার্চকে তখন কিন্তু আজকের এই পারিপাট্য অবশ্যই ছিল না। তাই তিনি হেস্টিংস সাহেবকে ধরে একটি নতুন চার্চ বানানোর জন্য সেকালের দেড় লক্ষ টাকার একটি গ্র্যান্ট আদায় করেন ।
আচ্ছা এবার বলুন তো কোথায় ক্রিসমাস আপনার আমার মত পঁচিশে ডিসেম্বর পালন করে না ! বলতে পারবেন ? আচ্ছা , আমিই বরঞ্চ বলি । বড়বাজার তো নিশ্চয়ই গেছেন কখনো না কখনো, আর যদি বড় বাজারের অজস্র দোকান আর ফুটপাতের সাজানো পসরা এবং মুটে মজুরের ঠেলে, ঠেলার রিক্সায় চেপে তা এড়িয়ে যেতে যেতে ২ নম্বর, আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে পৌচ্ছান, তো সেই ফটকটি আপনি আবিষ্কার করতে পারবেন। আর যে রাস্তা ধরে আপনি যাবেন, সেই রাস্তাটির নামও কিন্তু ওই গির্জের নাম থেকেই এসেছে । আর্মেনিয়া স্ট্রিট। অর্থাৎ কিনা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আর্মেনি গির্জা, যার ভালো নাম "আর্মেনিয়ান হোলি চার্চ অফ নাজারথ" । আর্মেনিয়ানরা খাতায়-কলমে 'আর্মেনিয়ান অ্যাপস্টলিক অর্থোডক্স চার্চ ' এর অনুগত হলেও, আদপে তারা ইরানের 'জুলফার চার্চ ' এর অনুশাসন মেনে চলে । আর আর্মেনীয় ক্রিসমাসের মতানুসারে তারা পালন করে 'আর্মেনিয়ান ক্রিসমাস' । অর্থোডক্স মতে এই ২৫ ডিসেম্বর হল পেগান গন্ধ মাতানো এই দিনটায় রোমানরা এক কালে সূর্যের উপাসনা করতো । 'খ্রিস্টানদের ফিস্ট অব্ এপিফ্যেনীর' দিন ৬ই জানুয়ারি , যেদিন কিনা যীশু ঈশ্বর পুত্র হিসেবে মান্যতা পায় । থিওফানি মতে তাই আর্মেনিয়ানরা ওই দিনটাকেই ক্রিসমাস পালনের জন্য ধার্য করে। আর স্থপতি হিসাবে আর্মেনিয়ানরা বেশ নামজাদাই ছিল সেই নিজাম প্যালেস স্টিফান কোর্ট কিংবা গ্রান্ড হোটেল সবই কিন্তু ওই আর্মেনিয়ানদের হাতেই তৈরি । ১৬৮৮ সালে আর্মেনিয়ানরা নিজেদের অর্থে কাঠ দিয়ে ওই চার্চটি প্রথম তৈরি করে। আর ১৭২৪ সালে পুড়ে যাওয়ার পর ওই চার্চটি তৈরি করান আঘা ইয়াকোব নাজার , তারই নামে ওই চার্চের নাম হয় আর্মেনিয়ান চার্চ অব্ হোলি নাজারথ । জমিটি দান করেছিলে কেনানেনটেক ফানুস ,আর স্থপতি ছিল ইরানের লেভন গ্যাভন্ড । এখানেই আছে কলকাতার প্রাচীনতম রেজাবিবেহ শুকিয়াসের সমাধি, আর প্রবেশ পথের বাঁদিকেই আছে 'আজদারার' কাগজের সম্পাদক রেভারেন্ড হারুথিয়ম শমাভোনিয়ান এর মূর্তি। যাকে বলা হয় 'ফাদার অফ আর্মেনিয়াম জার্নালিজম'। শোনা যায়, আর্মেনিয়ানরাই ছিলেন ইউরোপের মধ্যে প্রথম খ্রিস্টধর্ম গ্রহণকারীর জাত।
তা যাবেন নাকি একদিন এই দুটি চার্চ দেখতে ?শীতের নরম রোদ গায়ে মেখে, দেখেই আসুন না জ্যান্ত ইতিহাস । ঢুকলেই দেখবেন বাইরের কেকাফোনি চুপ হয়ে চলে গেছেন এক শান্তির নিরবিচ্ছিন্ন স্রোতে। যাই হোক কথা দিলাম আবার ফিরে আসবো পুরনো কলকাতার ইতিহাসের গপ্পকে সঙ্গী করে। অন্য কোনদিন হয়তো এখানে কিংবা অন্য কোন কালে যেখানে কলকাতা নিজের গল্প নিজেই বলবে ফিসফিসিয়ে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন