রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

গোলাম রাশিদ-এর প্রবন্ধ

পরিশীলিত যাপনের ছায়ায় বুনেছেন জীবনের কবিতা 


যেতে পারো, তবু যেতে পারো না, এখন তুমি যে পরিসরে  

অবস্থান করছো সেখানকার সব কাজ সব কর্তব্য

সমাধা না করে তুমি যেতে পারো না, একটা পরিসরের

কাজ শেষ করে, সুষ্ঠুভাবে শেষ করে, তবেই পরবর্তী 

পরিসরে ঢোকা, তা নইলে সব কাজই থেকে যাবে অসমাপ্ত 

আর সকলেই  জানে, অসমাপ্ত  করে রাখা মোটেই

মানুষের  পক্ষে সমীচীন  কাজ নয়, তবু কিছু

অসমাপ্তি থেকেই যায়।


___________কিছু অসমাপ্তি, নাসের হোসেন




অসমাপ্ত রেখেই বিদায় নিতে হয়৷ সৃষ্টিশীল মানুষের কাজ শেষ হয় না অতি সহজে৷ নাসের হোসেন ২০১৮- জানুয়ারিতে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন৷ তাই তিনি অকালপ্রয়াত বলা না গেলেও তাঁরই কবিতার সুর ধরে বলা যায় 'তবু কিছু অসমাপ্তি থেকেই যায়' ফেব্রুয়ারিতে (২০২০) অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কবি নাসের হোসেন৷ পরবর্তীতে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফেরেন৷ তবে শেষ পর্যন্ত যেতে হয়৷ তা- হয়েছে৷ 

গত শতকের পাঁচের দশকে কলকাতায় জন্ম নাসের হোসেনের৷ কলকাতায় জন্মালেও শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে৷ কবি নাসের হোসেনের দাদা ডা. কামাল হোসেন বোন সোনালি বেগম স্বনামধন্য লেখক৷ কামাল হোসেনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর নানা স্মৃতি৷ পরিবারে সাহিত্যের পরিবেশ ছিল, যা তাঁর মনে বুনেছে সাহিত্যের বীজ৷ মুর্শিদাবাদের এই শহরে তাঁর যাতায়াত ছিল নিয়মিত৷ সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে ট্রেনে করে বহরমপুরের চলে আসতেন৷ গ্রাম শহরের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলেছেন তিনি৷ লালগোলা প্যাসেঞ্জারের মতো৷ বছর প্রয়াত কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত 'নাসের হোসেন' শীর্ষক কবিতায় লিখেছিলেন


এবং আমার পাণ্ডুলিপি থেকে

আবর্জিত কবিতা থেকে দুটি

চয়ন করে হেঁটে গেলেন দ্রুত

পরিব্রাজক যেমন আত্মলীন।


আর তারপর লালগোলা এক্সপ্রেস 

সটান পাড়ি--এবার মায়ের দিকে

...সৌম্য পাগল সঞ্চরমাণ সেতু


হ্যাঁ, নাসের হোসেন সেতুর মতোই ছিলেন৷ নবীন প্রবীণ, গ্রাম-মফসসল-শহর, নাগরিকতা এবং উদাসী-মুর্শিদি জীবনের মধ্যে তিনি সংযোগ সাধন করেছিলেন৷ কাউকে কবি হিসেবে বিবেচনা করার সময় তাঁর সৃষ্টির শুরুর দশককে উল্লেখ করা হয়৷ সেই অর্থে নাসের আটের দশকের কবি৷ কিন্তু তিনি তারপরেও আজীবন লিখে গেছেন অক্লান্ত ভাবে৷ কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে যেকোনও সাহিত্য ম্যাগাজিন খুললেই অধিকাংশগুলোতেই নাসের হোসেন নামটি পাওয়া যাবে৷ কবিতা পাক্ষিক, দৈনিক পুবের কলম, অনুষ্টুপ, দেশ, কৃত্তিবাস, নতুন গতি, উদার আকাশ, কালান্তরের মতো বহু জায়গায় তিনি লিখেছেন৷ তিনি উচ্চকিত নন, কিন্তু সন্তর্পণে নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দেন সবাইকে৷ আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি নিজস্ব পরিমণ্ডল তিনি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন৷ 


বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে তিনি পড়াশোনা করেছেন৷ সেই সময় ভাগিরথীর পাড় ধরে হাঁটতেন৷ শহর ঘুরতেন, গোরাবাজার থেকে কাশিমবাজারস্কোয়ার ফিল্ডে ক্রিকেট ফুটবল খেলেছেন একসময়৷ বহরমপুর শহরের সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মিক বন্ধন৷ সেটা কখনও ছিন্ন হয়নি৷ বিষয়ে কবিতা পাক্ষিকের প্রাণপুরুষ প্রভাত চৌধুরী স্মৃতিচারণ করছেন, 'নাসের প্রতি সপ্তাহে বহরমপুর যায়৷ ওর বাবার মৃত্যুর পর ভেবেছিলাম, হয়তোবা দু-এক সপ্তাহান্তে নাসেরের বহরমপুর যাওয়াটা কমবে৷ কিন্তু কমলো না৷ তার বেশ কিছুদিন পর নাসেরের মা মারা গেলেন৷ আমি ভাবলাম, এবার নিশ্চয়ই নাসের-কে বেশি করে পাবো৷ পরে বুঝতে পারলাম আমার চাওয়াটাতে সবটাই ভুল ছিল৷'


নাসের হোসেন যেমন আপাদমস্তক কবি, তেমনই একজন খাঁটি মানুষ৷ তাঁর ভাষায়, 'অন্ধকারের মধ্যে যে আলো/ আমি তার অনুসন্ধানে আছি।' প্রকৃত অর্থে তিনি তা করেছেন৷ কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও ছবিও এঁকেছেন৷ বিভিন্ন প্রদর্শনীতে তিনি নিয়মিত যেতেন৷ ভাবেই একটি শিল্পিত যাপন নাসের হোসেন নিজের জীবনে দেখিয়ে গিয়েছেন৷ তাঁর 'অপারেশন থিয়েটার', 'ডানা', 'কৃষ্ণগহ্বর',  'গ্যাব্রিয়েল, বলো', 'লাফ', 'শো-কেস' ইত্যাদি প্রায় ২৫টির বেশি কাব্যগ্রন্থজুড়ে এই পরিশীলিত যাপন যেন নান্দনিক রূপে ধরা দিয়েছে৷ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতায় সে-জন্য ব্যাঘাত ঘটেনি৷ তাঁর স্পষ্ট মত, ' সমাজ, ধর্ম, ভাষা, রাজনীতি প্রতিটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে সন্দেহ৷...কিন্তু প্রতিটি প্রজন্মই তার পরের প্রজন্মের জন্য তৈরি করতে চায় নতুন জামা, ভাবতে চেষ্টা করে নতুন কোনো ভুবন---যা সুস্থ যা সুন্দর৷



সারা জীবন কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে সমান তালে সাহায্য করে গিয়েছেন৷ পুবের কলমের ঈদসংখ্যা সম্পাদনা কাজের সময় এটা দেখেছি৷ কোনওরকম কার্পণ্য না করেই দীর্ঘ সেরা কবিতাটি পাঠাতেন হাতে লিখে৷ ২০১৯ সালে হযরত মুহাম্মদ সা.-এর জন্মদিনের আগে নবীকে নিয়ে পাঠিয়েছিলেন ১২১ পঙক্তির এক দীর্ঘ কবিতা৷ মুহাম্মদ সা.-কে নিয়ে এত বড় কবিতা কেউ লিখেছেন কি না আমার জানা নেই৷ দৈনিক পুবের কলমের অর্ধেক পৃষ্ঠাজুড়ে সেটি ছাপা হয়েছিল৷ কবিতার নাম 'তিনি বলেছিলেন' এতে নাসের হোসেন লেখেন,


তিনি বলেছিলেন মায়ের চরণতল হচ্ছে স্বর্গস্থান

বা সবচেয়ে পুণ্যস্থান, তিনিই বলেছিলেন মেয়েরা

সম্মাননীয়া, তাদের বিরুদ্ধে কখনো কটূ কথা

বা কুৎসা বলো না, তিনিই বলেছিলেন

 নারী-পুরুষ পরস্পরকে শ্রদ্ধা করবে তা- নয়

প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মানুষকে শ্রদ্ধা করবে, কেন-না

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে অনন্ত সম্ভাবনা



এই কবিতাতেই নবীর জীবন নিয়ে তিনি লিখেছিলেন,



খুব শৈশবেই দুধ-মায়ের সঙ্গে উটের হাওদায় তিনি

দুলতে-দুলতে অনুভব করেছিলেন ক্যারাভানের বিপুল ছন্দ

সেই ছন্দই তাঁর জীবন কবিতায় গদ্যে পাওয়া যাবে

সেই ক্যারাভানের ছন্দই জীবনের আশ্চর্য নৃত্য-গীত নিয়ে বয়ে চলেছে।   




নয়ের দশকে 'কবিতা পাক্ষিক'-এর সূচনার সময় থেকে তিনি এই পত্রিকার সঙ্গে জড়িত৷ প্রভাত চৌধুরীর সহযোগিতা করে এই পত্রিকাটিকে অন্য স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন৷ চার বছর কবিতা পাক্ষিকের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন নাসের হোসেন৷ ১৯৭৫ সালে 'রৌরব' পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি৷ এটি বহরমপুর থেকে প্রকাশিত হত৷ পরবর্তীতে এটি বন্ধ হয়ে যায়৷ 


১৯৭০ সালে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হলেও প্রথম কবিতার বই বেরোয় ১৯৯০ সালে (অপারেশন থিয়েটার) নিজের কবিতায় পরীক্ষানিরীক্ষা করে গেছেন অবিরত৷ আত্মতুষ্ট হয়ে বই ছাপিয়ে নেননি৷ এই প্রচারবিমুখতাও তাঁর আর একটি বড় গুন৷ এর পরে প্রকাশিত হয় ডানা (১৯৯৪) এই কাব্যগ্রন্থের 'ভারতবর্ষ' কবিতাটি নাসেরকে সুখ্যাতি এনে দেয়৷ এটি যে শুধু ধর্মনিরপেক্ষতার মোড়ক দেওয়া কবিতা ছিল তা নয়, নিজেকে চেনার একটা সচেষ্ট প্রয়াস ছিল এই কবিতা৷ এই কবিতা বেশ কয়েকটি জায়গায় পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল৷ স্থান পায় বিভিন্ন সংকলনেও৷ তিনি লিখেছিলেন,


যেখানে বহুবর্ষ আগে একজন মুসলমান ঠিক করেছিল

মন্দির বানাবে আর একজন হিন্দু ভেবেছিল মসজিদ

গিয়ে দেখি সেখানে চমৎকার হ্রদে কতরকমের হাঁস খেলে বেড়াচ্ছে

চারপাশের বাগানে কত যে পাখি

পুরুষ নারী আর বাচ্চাদের হৈ হুল্লোড়ে 

জমে উঠেছে তুমুল পিকনিক


সম্প্রীতিকে নাসের হোসেন একদম আলাদা চশমায় দেখেছেন৷ অজাতশত্রু হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন৷ দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতেন না বলে বন্ধুরা ধর্মের খোঁটা দিলে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন৷ এটা যে অর্জিত শ্লীলতাবোধ থেকেই তিনি করেন না, তা বন্ধুরা পরে বুঝতে পেরেছিল৷ আসলে কবির যে আদর্শ, মানবতা, তাকে তিনি আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন৷ তাই 'অপারেশন থিয়েটার' কাব্যগ্রন্থে তিনি লিখতে পেরেছেন

আমার সমস্ত শরীর নীল হয়ে গেছে, এই শরীরে আমি 

মানুষকে ছোঁব না, যদি তার ক্ষতি হয়, যদি সে মরে যায়--


নাসের হোসেন ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত ছিলেন৷ তবে 'নীরা', 'আয়েশা আক্তার', 'বনলতা সেন'এর মতো তাঁর কবিতাতেও এসেছে 'সুমিতা' নাম্নী এক নারী৷ তাঁর কাছে, 'সব নারীকেই পবিত্র মনে হয়' তাই  তিনি প্রতারণা করেননি৷ সাধারণ পাঠকের কাছে তাঁর দার্শনিক জীবনধারার কবিতা হয়তো একটু দুর্বোধ্য ঠেকতে পারে, কিন্তু সমগ্র নাসের হোসেন সত্তাটি অতি সহজ, সাধারণ৷ কাঁধে ঝোলা, চশমা চোখে একজন কাছের মানুষ৷ যিনি জিব্রাইলের কাছে প্রশ্ন রাখতে পারেন অনায়াসে


গ্যাব্রিয়েল তোমার হাত থেকে উড়ে যাওয়া পাখি আজ কোন

বার্তা দেবে

...ক্লোজ-শট, মিড-শট, লং-শট, কিছুতেই ফ্রেমের মধ্যে

পাখিটিকে দেখতে পাইনি






1 টি মন্তব্য:

  1. কবি নাসের হোসেনের সঠিক মূল্যায়নে লেখক সমালোচক গোলাম রসিদের এই প্রচেষ্টাকে শ্রদ্ধা জানাই। কবি, দার্শনিক ও প্রকাশক, "কবিতা পাক্ষিক" প্রকাশনীর founder-owner প্রভাত চৌধুরী একবার বলেছিলেন যে, নাসের একই সাথে একজন বিখ্যাত পেইন্টার। নাসেরের exhibition দেখতে ও নিজের ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে এসেছিলেন, বিশ্বখ্যাত পেইন্টার মকবুল ফিদা হোসেন।"
    আর আমার অভিজ্ঞতায় কবি ও পেইন্টার হিসেবে নাসের শুধু উচ্চ ছিলেন তাই নয়, উচ্চ মনের ছিলেন। তাঁকে নিয়ে গবেষনা হোলে সাহিত্য ও শিল্পের ক্ষেত্রে সেটা খুব বড় অবস্থান নেবে। এটা পক্ষপাতিত্ব নয়, আরো অনেককে নিয়েই সেটা হোক। আমাদের হতে হবে মুক্ত মনের মানুষ।
    বিনীত,
    ঋদেনদিক মিত্রো
    Ridendick Mitro
    পেশা, বাংলা, ইংরেজি, স্প্যানিস ভাষায় কবি, উপন্যাসিক, গীতিকার, কলামিস্ট, ও বিজ্ঞানী। পপশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

    উত্তরমুছুন