আধুনিক মননের বীজায়ন
সর হুয়ানা ডনা ইনেজ দে লা ক্রুজ
এই বিশেষ তৃতীয় অধ্যায়ে কিছুটা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় আধুনিকতার চর্চা বা আলোচনা করার ইচ্ছে হচ্ছে। নিজের বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতা দিয়ে এখানে আধুনিক মননের কথা বলি । শিক্ষকতার সূত্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষাঙ্গনে গেছি, পড়িয়েছি । অনেক স্তরের গবেষক মাস্টার মশাই মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময় করেছি আর বিশেষ করে সাধারণ মানুষের সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যে দিয়ে মানুষের প্রবণতা, আত্মজিজ্ঞাসা ন্যায় ইত্যাদির যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার একটা মূল্যায়ন করতে চেয়েছি নিজের জন্য। কেউ যদি আমায় এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন করেন যে নানা দ্বান্দ্বিক চেতনার পরেও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কিভাবে মানুষের চেতনাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারি - বিশেষ করে যেখানে মানুষ শহুরে সভ্যতায় স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষায় চিন্তাধারায় নিজের পরিচয়কে খুঁজেছে, জানতে চেয়েছে - সেখানে অবশ্যই মনে হয়েছে যে শুধুমাত্র মানবিক কামনা, শরীরের কামনা - সে সমকামী হতে পারে - তা প্রাচীন ধর্মীয় সমাজব্যবস্থায় অতঃপ্রকাশ করতে পারেনি। যেখানে তা পেরেছে সেখানে আধুনিক মুক্ত চিন্তার অবকাশ তৈরী হয়েছে। গ্রহণযোগ্য মনে না হলেও তার প্রকাশের পথে বাঁধা আসেনি।
একবার সুদূর লাতিন আমেরিকায় শিক্ষা করার সুযোগ পাই । মেক্সিকোর একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে আমন্ত্রণ করে ডেকে নিয়ে আসে আমার কিছু বন্ধুমানুষ। তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। আমি যখন আরো তরুণ বয়সে আমেরিকায় গবেষণা করতে গেছিলাম তখন আলাপ হয়েছিল তাদের সঙ্গে। আজ তারাই আমায় লাতিন আমেরিকায় ডেকে নিয়ে এলে। এই সুদূর লাতিন - স্প্যানিশভাষী মানুষদের মধ্যে দেখলাম উপনিবেশ, ইস্পানীয়দের সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রভাব কিভাবে সে দেশের বংশোদ্ভুত অথচ ও উপনিবেশের সময়ে আধুনিক চেতনা একটা বিশেষ মাত্রা বা চরিত্র অর্জন করেছে। মেক্সিকো সিটি, বুয়েনস আইরেস ও লিমার মত শহরের এই সংমিশ্রিত লাতিন খ্রীষ্টিয় নাগরিকের আধুনিক চেতনার মধ্যে কেবলমাত্র যে স্পেনের সাংস্কৃতিক জীবন চর্যার প্রভাব বা নির্ণায়ক দেখা যায় তা নয়। বরঞ্চ তাদের আধুনিকতার মধ্যে প্রাচীনতর বীজ রয়েছে। এই সচেতনতা কার্লোস মারিয়াতেগির লেখায় ল্যাটিন আমেরিকিও সমাজের জাতিচেতনার আত্মবিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে। [১] একটা সম্ভাবনা একবার তৈরি হয়েছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যখন লাতিনা আমেরিকা ভ্রমণ করছেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে দেখা হবার পর তার মারিয়াতেগির সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জাহাজ যেহেতু আর সেই অভিমুখে যায়নি এবং রবীন্দ্রনাথ ও তার পথ পরিবর্তন করতে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন সেই জন্য সেই সাক্ষাৎকার সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হয়তো মারিয়াতেগি এবং রবীন্দ্রনাথের আলোচনা একটা নতুন বিশ্বায়নের জন্য একটা নতুন যুগের খতিয়ান হয়ে থাকতো। অবশ্যই আমরা সেই দুষ্প্রাপ্য সাক্ষাৎকার আর আলোচনার থেকে আজকে বঞ্চিত হয়েছি। কিন্তু আমার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে এই যে মারিয়া থেকে আমেরিকার মানুষের আধুনিক মনন ও বিশ্বমুখীণতার কথা ভেবেছিলেন কমবেশি তার প্রভাব আজও রাতে আমেরিকার মানুষের কাছে নির্ণায়ক হয়ে রয়েছে।
এই যে আধুনিক লাতিন শিল্প সংস্কৃতির পরিসর তার মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য স্পেনীয় ভাষায় রচিত প্রায় ৪০০ বছরের ল্যাটিন আমেরিকিও কবিতা। কিছু সহপাঠীর সাথে আমি এই কবিতার কিছু কবিতার বাংলা তর্জমা করার প্রয়াস পেয়েছি এবং কিছু ক্ষেত্রে সেইসব অনুবাদ শব্দের বা শব্দার্থের খুব কাছাকাছি অনুকরণ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তা (কিছুটা দূরবর্তী সাংস্কৃতিক সামাজিক প্রেক্ষাপট হওয়ার কারণে) তার মূল শব্দ থেকে কিছুটা ব্যতিক্রমে, পরিসরে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবশ্যই আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে অক্তাভিও পাজ-এর কবিতা। কিন্তু আশ্চর্য হয়েছি যখন লাতিন কবিতার শিকড় খুঁজতে গিয়ে, বিশেষ করে তারা আধুনিক বীজগুলো খুঁজতে গিয়ে, দেখলাম যে সেই স্থানীয় ও মিশ্র সংস্কৃতি, মেক্সিকো সিটির বুকে যে অন্তত ৫০০ বছর ধরে বিবর্তিত হতে হতে একটা নতুন যুগের পুষ্পবৃক্ষ সংস্কৃতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়েছে, তার অনেকটাই এক মরমি নারী হৃদয়ব্যঞ্জনায় সনেটের সমহিম লাতিন ঐতিহ্যে আবর্তিত হয়েছিল।
এই ধারাবাহিক অধ্যায়ে কিছু কবিতার কিছু শব্দ নিয়ে বিশ্লেষণ করব। কিছু পংক্তি যা আমাদেরকে বিশ্বকবিতার অভিমুখে নিয়ে এসেছে। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে দিয়ে বিশ্বের কল্পনায় আমরা সমান্তরাল কোনো মানবিক চেতনায় পৌঁছেছি - অতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকার সফেন সাগরতটে যে জাহাজ ভিড়েছে - ইংরেজ, ফরাসি, স্পেনীয় নাবিক জলদস্যুর ইতিহাস পেরিয়ে -- সে মানসের দুর্লঙ্ঘ্য পথ অতিক্রম করে বেঁচে থাকে যে কয়েকটি পংক্তি তা হয়তো এই বিশালতার মহাকাব্যে নয় – বরং কোন সাধারণী অবনমিত কবিতায় বিধৃত হয়ে আছে । মুক্তার আয়তন নয়, তার অল্পতাই তার পরিচয় । তা সর্বসাধারণের এই অর্থে ।
সম্ভবত মেক্সিকান এক নারী কবির লেখা একটি সনেট এইসব আধুনিক মানবিক প্রবৃত্তির উদাহরণ । কবির নাম সর হুয়ানা ডনিয়া ইনেজ দে লা ক্রুজ । সংক্ষেপে ‘সর হুয়ানা’। এই একটি বিশ্ববীক্ষার দিক দেখে আলোচনা করব। সর হুয়ানা বা ইংরেজি উচ্চারণে ‘জোয়ানা’; একজন নারী। স্পেন-এ জন্ম। উপনিবেশে ক্যাথলিক চার্চের সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সেই যুবতীকাল থেকেই তিনি মেক্সিকোর ক্যাথলিক সংগঠনের একজন ভিক্ষু সন্ন্যাসীর শপথ নিয়েছিলেন। জীবনকে ঈশ্বরের ভালোবাসায় নিবেদিত করেছিলেন। অথচ তার এই নিবেদিতা প্রাণ অস্তিত্ব্বের মধ্যে দিয়ে চলেছিল এক নারীর অপর এক নারীর জন্যে ভালোবাসা। এক পরিব্রাজিকা ক্যাথলিক ভিক্ষুর আর এক নারীর প্রতি আসক্তি, প্রেম, উচাটন, আগ্রহ ভালোবাসার অদম্য অস্থিরতা, আত্ম বিশ্লেষণ – হয়তো বা প্লেটোনীয় প্রেম -- দেহলিঙ্গত্বের সজীবতায়, বৈপরীত্যে ঢাকা নারীজীবনের ক্ষণিক সৌন্দর্য পরায়ণতা তাঁর কবিতার বিপ্রলাপ, অভিসার , ঈর্ষার মধ্যে দিয়ে বিধৃত হয়ে রয়েছে। কি নেই সর হুয়ানার এই মরমী কাব্যে। কি নেই তাঁর আত্মবিশ্লেষণে। হুয়ানার এই স্খলিত চৈতন্যের প্রেম অবকাশের বহিঃপ্রকাশই তার দুর্দমনীয় আধুনিকতা। একজন ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনীর এই বিপ্রতীপ ভাব সংকেত আধুনিক বিশ্বের নারীমুক্তির একটা ইস্তাহার কবিতার সৃষ্টি করেছে। যারা আধুনিক ভাবাপন্ন হতে চান - যারা যুগের বা যুগধর্মের আদর্শ পথকে উপেক্ষা করে মুদ্গত প্রবণতাকে ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে ঈস্বরমুখী করে তুলতে পারেন তাদের অগ্রণী এই যুবতি সন্ন্যাসিনী। মেক্সিকোর নিদারুন ঔপনিবেশিক ইতিহাসের মধ্যে হুয়ানার এই নিঃশব্দ বিপ্লব প্রতিটি শিক্ষানবিস কবির কাছে এক নিদর্শন। আজ তার একটি কবিতার অনুবাদ দিয়ে শেষ করছি। একটি ভাবানুবাদ মাত্র। হুয়ানার তর্জমা করা প্রায় অসাধ্য কাজ তবু তার এই প্রতিদানহীন, অব্যক্ত, গোপন প্রেমের একটা ভাবানুবাদের চেষ্টা করলাম। কবিতার সনেটীয় গঠনকে না মেনেই - এবং তার জন্য মার্জনা চেয়ে
কৃতার্থ হতে চেয়ে প্রেম খুঁজি, নিখাদ প্রেম
সখা এই চরাচরে এসো, ভালোবাসি অভিসারে -
অভিমান কোরো না, আশা করি সংগোপনে;
তোমার অমৃত প্রেম যেন থাকে মনিহারে মনে,
যদিও প্রেম সঘন কুহেলির মতো নীড়ে;
প্রীতির ছোঁয়া পেতে হিরে রত্নে সাজি,
দুর্মূল্য জহরের আভা রূপসী করে দেহ
তোমায় বশ করে গড়ি যেন এক সুখজুটি—
বিজিত হয়ে বুঝি জিতেছি যেন এক মোহে,
প্রেম আসে সুখে— পিপাসায় জ্বলি
বারবার ডেকে তবু অভিমান করি
সব পথই যেন যন্ত্রণার কাঁটায় বেঁধা
তবু আমি, ভালোবেসে ডাকি সখা
যাকে কাছে চাই তাকে—মদমত্ত যদি
তবু বীতরাগ হয়ে ডাকি যেন ক্লেশে।
[১] দ্রষ্টব্যঃ মারিয়াতেগির প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থ La escena contemporánea। এ বিষয়ে - তুলনামূলক প্রেক্ষিতে - বিচার্য নোগুচিকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি।
[২] আক্ষরিক অনুবাদ হয়তো কিছুটা এরকম। কিন্তু পাঠ্যে শুধুমাত্র সর হুয়ানার আর্তিটুকু ব্যক্ত করলাম। তার শব্দ খেলার বৈপরীত্যের বিন্দুমাত্রও বিসর্জন না করে পারলাম না। একটা অন্য তর্জমা দিলাম বটে ফুটনোটে :
Determina que prevalezca la razón contra
el gusto
Al que ingrato me deja, busco amante;
al que amante me sigue, dejo ingrata;
constante adoro a quien mi amor maltrata;
maltrato a quien mi amor busca constante.
Al que trato de amor, hallo diamante,
y soy diamante al que de amor me trata;
triunfante quiero ver al que me mata,
y mato al que me quiere ver triunfante.
Si a este pago, padece mi deseo;
si ruego a aquél, mi pundonor enojo:
de entrambos modos infeliz me veo.
Pero yo, por mejor partido, escojo
de quien no quiero, ser violento empleo,
que, de quien no me quiere, vil despojo.
সংকল্প করি যুক্তি যেন অনুভবের উপরে কর্তৃত্ব করে
আমার কৃতঘ্ন প্রেমিকা ছেড়ে গেলে, অন্য প্রেম খুঁজি -
অথচ সে অন্য আমায় ভালোবাসে - আমি তো চাইনা তাকে
এক রমণীকে ভালোবাসি - সে আমায় ভালোবাসে না
যে সত্যি ভালোবাসে তার সাথে কৃতঘ্ন অপ্রেমে জড়াই;
যে আমার প্রেম উপেক্ষা করে তার হীরক হতে চাই
অথচ যে সত্যিকার ভালো বাসে তার হীরক আমি হেলায়;
আমি যার প্রেম পেয়ে জিতি ভাবি সে খুন করে সংগোপনে
যে আমার প্রেম পাবে বলে ভাবে তাকে যেন বুঝি খুন করি
এ ভাবেই ভালোবাসা দিয়ে মনে শুধু ক্লেশ পাই
এ ভাবেই প্রার্থনায় নিজের সম্মান জ্বলে যায়
যেদিকেই যেতে চাই অখুশির দায়ভার নিয়ে ফিরি
শুধু যাকে বেশি করে চাই খুঁজি অবিরত;
হৃদয় চায় না যাকে তার কাছে অনুতাপ বোধি
যার কাছে হৃদয়ের সব খুঁজি - ভাবি লুঠি তাকে নিরবধি।
ক্রমশ...


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন